Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

মসজিদের চেয়েও পবিত্র মানুষের প্রাণ

Advertisement

Icon

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১১ পিএম

মসজিদের চেয়েও পবিত্র মানুষের প্রাণ

Advertisement

সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আমাদের সামনে ধর্মীয় পবিত্রতা, ন্যায়বিচার এবং মানুষের জীবনের মূল্য নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন হাজির করেছে। 

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধে একটি মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল। কিন্তু অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, প্রমাণের প্রকৃতি, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে কখন ও কীভাবে অবহিত করা হয়েছিল, সে বিষয়েও পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা জরুরি।

কোনো দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার আগে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, অভিযোগ ও রায় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এই ঘটনা একটি মৌলিক নৈতিক ও শরিয়তগত প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে: মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার নামে মানুষের প্রাণদণ্ড দেওয়ার যৌক্তিকতা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

ইসলামে মসজিদের মর্যাদা অপরিসীম। কিন্তু মানুষের প্রাণও আল্লাহর দেওয়া এক অমূল্য আমানত। কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী আইনশাস্ত্রের আলোকে বিষয়টি বিচার করতে হলে আবেগের পরিবর্তে প্রমাণ, শাস্তির নীতিমালা এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্তগুলো সামনে রাখতে হবে।

কাবার মর্যাদা ও মানুষের প্রাণের পবিত্রতা

ইসলামে কাবা শরিফের মর্যাদা অনন্য। এটি মুসলমানদের কিবলা, হজের কেন্দ্র এবং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার স্থান। কিন্তু কাবার মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়েই রাসুলুল্লাহ সা. মানুষের জীবনের পবিত্রতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।

ইবনে মাজাহর একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সা. কাবার দিকে তাকিয়ে তার মর্যাদা ও পবিত্রতার কথা উল্লেখ করেন। এরপর তিনি বলেন, একজন মুমিনের মর্যাদা, তার জান ও মাল আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। বর্ণনাটির বিভিন্ন সূত্র ও শব্দে পার্থক্য রয়েছে।

 এর মূল শিক্ষা হলো, পবিত্র স্থানকে সম্মান করার পাশাপাশি মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ সা. ঘোষণা করেন: ‘নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য পবিত্র, যেমন পবিত্র তোমাদের এই দিন, তোমাদের এই মাস এবং তোমাদের এই নগরী।’

এ বক্তব্য সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, মানুষের রক্তের পবিত্রতা বোঝাতে রাসুলুল্লাহ সা. পবিত্র দিন, পবিত্র মাস এবং পবিত্র নগরীর উপমা দিয়েছেন। অর্থাৎ, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন কোনো সাধারণ বিষয় নয়, যা সামান্য অপরাধ বা আবেগের বশে বিসর্জন দেওয়া যায়।

কুরআনেও অন্যায়ভাবে প্রাণ নেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রাণের বিনিময় বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একজনের প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করল।’ (সুরা আল-মায়িদা, ৫:৩২)

এই আয়াতের মূল বক্তব্য সুস্পষ্ট। মানুষের প্রাণ রক্ষা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও আইনগত উদ্দেশ্য। অবশ্য আয়াতটির আলোচ্য বিধান ও প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হয়। তবু নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষার যে ব্যাপক নৈতিক শিক্ষা এতে রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তাহলে প্রশ্ন হলো, কোনো মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেই কি মানুষের প্রাণদণ্ড দেওয়া ন্যায়সংগত হয়ে যায়? শুধু অভিযোগের গুরুত্ব কিংবা ঘটনাস্থলের পবিত্রতা উল্লেখ করলেই কি মৃত্যুদণ্ডের শরিয়তগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়? এর উত্তর খুঁজতে হবে ইসলামের বিচারিক নীতিমালা ও শাস্তিব্যবস্থার আলোকে।

মসজিদে নববীর ঘটনা: পবিত্রতা রক্ষায় নববী প্রজ্ঞা

মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার প্রশ্নে রাসুলুল্লাহ সা.-এর আচরণ আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, এক বেদুইন মসজিদে নববীর ভেতরে প্রস্রাব করে ফেলেছিল। সাহাবিরা তাকে বাধা দিতে উদ্যত হলে রাসুলুল্লাহ সা. তাদের থামিয়ে দেন। তিনি নির্দেশ দেন, লোকটিকে ছেড়ে দিতে এবং যেখানে প্রস্রাব করেছে, সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দিতে। এরপর তিনি লোকটিকে বুঝিয়ে দেন যে মসজিদ নামাজ, আল্লাহর স্মরণ এবং কুরআন তিলাওয়াতের স্থান।

এই ঘটনা থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই পবিত্রতা রক্ষার পদ্ধতিও হতে হবে প্রজ্ঞাপূর্ণ, পরিস্থিতির উপযোগী এবং সংশোধনের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে।

বেদুইনের কাজটি ছিল মসজিদের পবিত্রতার পরিপন্থী। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. তাৎক্ষণিক ক্রোধ বা প্রতিশোধকে প্রাধান্য দেননি। তিনি সমস্যার সমাধান করেছেন, স্থানটি পবিত্র করেছেন এবং ব্যক্তিটিকে শিক্ষা দিয়েছেন।

অবশ্য এই ঘটনাকে সব ধরনের অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের সরাসরি বিধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু এটি অন্তত দেখায়, মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘিত হলেই সর্বোচ্চ কঠোরতা প্রয়োগ করতে হবে, এমন কোনো সাধারণ নীতি ইসলামের নববী শিক্ষায় নেই।

এক বালতি পানি দিয়ে মসজিদের অপবিত্র স্থান পরিষ্কার করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু একবার কোনো প্রাণ চলে গেলে তা ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা কারও নেই। তাই শাস্তি নির্ধারণের সময় অপরাধের প্রকৃতি, প্রমাণ, উদ্দেশ্য, পরিস্থিতি এবং শাস্তির শরিয়তগত ভিত্তি বিবেচনা করা অপরিহার্য।

হদ ও তা’যির: শাস্তির সীমা কোথায়?

ইসলামী ফৌজদারি আইনশাস্ত্রে শাস্তির শ্রেণিবিভাগ বুঝতে পারলে আলোচ্য প্রশ্নটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। সাধারণভাবে ইসলামী আইনশাস্ত্রে হদ, কিসাস ও তা’যিরের মতো পৃথক শ্রেণি রয়েছে। প্রতিটির নিজস্ব বিধান, শর্ত এবং প্রয়োগের ক্ষেত্র আছে।

হদ হলো এমন কিছু অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি, যেগুলোর ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহয় বিশেষ বিধান এসেছে। কিসাসের বিষয়টি মূলত নির্দিষ্ট শর্তে হত্যাকাণ্ড বা শারীরিক আঘাতের প্রতিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। 

অন্যদিকে, তা’যির হলো এমন অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারক বা বৈধ কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন শাস্তি, যেগুলোর নির্দিষ্ট শাস্তি শরিয়তে হদের মতো নির্ধারিত নয়।

মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগটি ঠিক কোন আইনগত শ্রেণিতে বিবেচিত হয়েছে, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট রায় ও বিচারিক নথি জানা প্রয়োজন। শুধু প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত বিবৃতির ভিত্তিতে মামলাটিকে নিশ্চিতভাবে তা’যিরের মামলা বলে ঘোষণা করা কিংবা আদালত কোন আইনি বিধান প্রয়োগ করেছে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

তবে যদি অভিযোগটি তা’যিরের আওতাভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে, এমন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য কোন শরিয়তগত ও আইনগত ভিত্তি দেখানো হয়েছে।

তা'যিরের মূল উদ্দেশ্য অপরাধ প্রতিরোধ, সংশোধন এবং সমাজকে সুরক্ষা দেওয়া। এর আওতায় সতর্কীকরণ, উপদেশ, তিরস্কার, জরিমানা, কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন শাস্তির কথা ইসলামী আইনশাস্ত্রে আলোচিত হয়েছে। কোন শাস্তি প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করে অপরাধের প্রকৃতি, প্রমাণ, পরিস্থিতি, বিচারকের ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট মাজহাব ও আইনগত কাঠামোর ওপর।

তা’যিরের সর্বোচ্চ সীমা এবং এর আওতায় মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বহু ফকিহ তা’যিরের শাস্তিকে হদের নির্ধারিত শাস্তির সমতুল্য বা তার চেয়েও কঠোর করার ব্যাপারে আপত্তি করেছেন। 

কিছু ফকিহ আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে, গুরুতর ও পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে, কঠোরতর শাস্তির সীমিত সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এসব মতকে এক করে দেখা কিংবা কোনো একটি মতকে সমগ্র ইসলামী আইনশাস্ত্রের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

তবে মতভেদ থাকা মানেই যেকোনো শাস্তি বৈধ হয়ে যায় না। মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে তার স্পষ্ট আইনগত ভিত্তি, অপরাধের গুরুতরতা, প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা এবং ন্যায়বিচারের শর্তগুলো অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা দরকার।

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন: ‘আল্লাহর নির্ধারিত হদ ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে দশ বেত্রাঘাতের বেশি দেওয়া যাবে না।’

এ মর্মে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণনা রয়েছে। ফকিহরা এ হাদিসের প্রয়োগ ও তা'যিরের সীমা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাই একে সব মাজহাবের কাছে সব ধরনের তা'যিরের জন্য অভিন্ন ও চূড়ান্ত সীমা বলে সরলীকরণ করা উচিত নয়। তবে এটি যে শাস্তির মাত্রা ও সীমা নিয়ে শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা, তা স্পষ্ট।

সুতরাং মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের মতো অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্ন উঠলে শুধু অপরাধের নিন্দনীয়তা তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়। কেন অপেক্ষাকৃত কম কঠোর শাস্তি যথেষ্ট ছিল না, মৃত্যুদণ্ডের আইনগত ভিত্তি কী এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় সব শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তারও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা দরকার।

প্রাণরক্ষা ও ন্যায়বিচার: শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য

ইসলামী শরিয়তের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবন রক্ষা। মাকাসিদুশ শরিয়ার আলোচনায় প্রাণ সংরক্ষণকে অপরিহার্য উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়। 

জীবন রক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে ফিকহে এমন বিধানের কথাও এসেছে, যেখানে জীবননাশের আশঙ্কায় নির্দিষ্ট শর্তে নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়।

এ থেকে বোঝা যায়, শরিয়ত মানুষের জীবনকে অগ্রাহ্য করে না। বরং জীবন রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ প্রতিরোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে চায়।

ইসলামী আইনশাস্ত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, সন্দেহের কারণে হদ শাস্তি প্রতিহত করার চেষ্টা করা। এর অর্থ এই নয় যে সন্দেহের অজুহাতে সব অপরাধ উপেক্ষা করতে হবে। বরং নির্ধারিত কঠোর শাস্তি দেওয়ার আগে প্রমাণ ও শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

খলিফা উমর রা.-এর শাসনামলে দুর্ভিক্ষের সময় চুরির হদ প্রয়োগ না করার যে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত ফিকহের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়, তা থেকেও পরিস্থিতি, প্রয়োজন এবং বিচারিক বিবেচনার গুরুত্ব বোঝা যায়। তবে এই ঘটনাকে সব পরিস্থিতিতে একই বিধান প্রয়োগের সরল সূত্র হিসেবে দেখা যাবে না।

মূল শিক্ষা হলো, ইসলামী বিচারব্যবস্থায় শাস্তি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া নয়। অপরাধের ধরন, ব্যক্তির অবস্থা, প্রমাণের মান, সামাজিক পরিস্থিতি এবং শরিয়তের উদ্দেশ্য বিবেচনা করেই শাস্তি নির্ধারণ করতে হয়।

মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও গুরুতর। কারণ কারাদণ্ড বা জরিমানার মতো শাস্তির ভুল সংশোধনের কিছু সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু প্রাণদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে ভুল সংশোধনের আর কোনো সুযোগ থাকে না। তাই এ ধরনের শাস্তির ক্ষেত্রে বিচারিক স্বচ্ছতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের গুরুত্ব অপরিসীম।

শেষ কথা: পবিত্রতা রক্ষার নামে ন্যায়বিচার যেন বিসর্জিত না হয়

মসজিদ আল্লাহর ঘর। তার পবিত্রতা রক্ষা করা মুসলমানদের ধর্মীয় দায়িত্ব। কিন্তু মসজিদের সম্মান রক্ষার অর্থ মানুষের জীবনের মূল্য কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং আল্লাহর বিধান অনুসারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, অপরাধের যথাযথ বিচার করা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করাও ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ।

মসজিদ মানুষের ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত। তাই মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার নামে কোনো মানুষের প্রাণদণ্ড দেওয়ার প্রশ্ন উঠলে তার পেছনে যথাযথ আইনগত ও শরিয়তগত ভিত্তি থাকা অপরিহার্য। শুধু স্থানটির পবিত্রতা বা অপরাধের প্রতি জনরোষের কথা উল্লেখ করে এমন শাস্তির ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

এই ঘটনায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, কী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল, কোন আইনের অধীনে তাদের দণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল, তা জানা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত পূর্ণাঙ্গ বিচারিক তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া।

বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত কূটনৈতিক ও আইনগত চ্যানেলে সংশ্লিষ্ট নথি চাওয়া, ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করা এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। প্রবাসীরা জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যান। তারা যেন বিদেশের মাটিতে ন্যায়বিচার, আইনি সহায়তা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব।

আমাদের বক্তব্য কোনো অপরাধকে সমর্থন করা নয়, কোনো দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রায় দেওয়াও নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করতে গিয়ে আমরা কি মানুষের প্রাণের পবিত্রতা, ন্যায়বিচার এবং শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছি?

ইসলামের শিক্ষা আমাদের পবিত্র স্থানকে সম্মান করতে বলে, একই সঙ্গে মানুষের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করতেও নির্দেশ দেয়। এই দুই দায়িত্বকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী করে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রকৃত ন্যায়বিচার হলো, পবিত্রতা রক্ষা করা হবে ন্যায়ের মাধ্যমে, অপরাধের বিচার হবে যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে এবং শাস্তি নির্ধারিত হবে শরিয়ত ও আইনের স্বীকৃত সীমার মধ্যে।

দূর প্রবাসে নিভে যাওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য আমাদের প্রার্থনা, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করুন, তাদের পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য দান করুন এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তাওফিক দিন।

লেখক: সিনিয়র মুহাদ্দিস, ইমাম ও খতিব, আনসান জামে মসজিদ, দক্ষিণ কোরিয়া

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

হাদিসে বর্ণিত বিভ্রান্ত গোষ্ঠী খারেজি কারা

হাদিসে বর্ণিত বিভ্রান্ত গোষ্ঠী খারেজি কারা

অন্য ধর্মের উৎসবে মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানানো কি জায়েজ?

অন্য ধর্মের উৎসবে মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানানো কি জায়েজ?

এআইয়ের মাধ্যমে তালাক শরিয়তসম্মত কিনা

এআইয়ের মাধ্যমে তালাক শরিয়তসম্মত কিনা

রোবট দিয়ে কুরবানি কি জায়েজ?

রোবট দিয়ে কুরবানি কি জায়েজ?

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে কমিশন গ্রহণের বিধান

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে কমিশন গ্রহণের বিধান

গান শোনায় ইসলামি শরিয়তের বিধান

গান শোনায় ইসলামি শরিয়তের বিধান

আরও পড়ুন

মসজিদের চেয়েও পবিত্র মানুষের প্রাণ

মসজিদের চেয়েও পবিত্র মানুষের প্রাণ

হারাম ভিডিওতে লাইক-কমেন্ট, গান-মুভিকে ‘প্রিয়’ বলা কি গুনাহ?

হারাম ভিডিওতে লাইক-কমেন্ট, গান-মুভিকে ‘প্রিয়’ বলা কি গুনাহ?

এআই দিয়ে তালাকনামা তৈরি করে স্বাক্ষর, তালাক কি কার্যকর?

এআই দিয়ে তালাকনামা তৈরি করে স্বাক্ষর, তালাক কি কার্যকর?

চাঁদা দিতে দেরি হলে জরিমানা, ইসলামে কী বিধান?

চাঁদা দিতে দেরি হলে জরিমানা, ইসলামে কী বিধান?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম