তীব্র গরমে শরীরের যে তিন অঙ্গ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১০:২৫ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে তা মানুষের হার্ট, কিডনি ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপর মারাত্মক এবং দীর্ঘমেয়াদি ‘নীরব ক্ষতি’ সৃষ্টি করে। এই চরম আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় থাকলে কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ ছাড়াই শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো বিকল হতে শুরু করে। তীব্র গরমে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অঙ্গ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা নীরব ঘাতকের রূপ ধারণ করে।
আগে গ্রীষ্ম অবকাশ বলে টানা এক মাস ছুটি থাকত স্কুল। গরমের দাপট বাড়লে সেই ছুটির মেয়াদ আরও সপ্তাহখানেক চলত। কিন্তু এখন নিয়ম পাল্টে গেছে। গত কয়েক দশক ধরে গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহ নির্দিষ্ট কোনো মাসে আবদ্ধ নেই। দিনের পর দিন গরম যেভাবে তার রেকর্ড গড়ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে মারাত্মক জীবনঝুঁকিতে ফেলবে ফলে হিটস্ট্রোক দেখা দেবে।
এ বিষয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, দিনের পর দিন যে পরিমাণ গরম সহ্য করতে করতে মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। শরীর সেই ধকল কাটিয়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত সময়ও পাচ্ছে না। একটানা এ পরিমাণ গরমের সংস্পর্শে থাকলে মানুষের হৃদযন্ত্র, কিডনি, মস্তিষ্ক এবং পরিপাকতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে বয়সভেদে ঝুঁকির ধরন আলাদা। মানবদেহের নিজস্ব কিছু মেকানিজম রয়েছে। গরম বাড়লে সে নিজেকে ঠান্ডা করার জন্য অতিরিক্ত ঘাম উৎপন্ন করে এবং রক্ত সঞ্চালনের গতি বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীরে তরল ও ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং চরম অবসাদ তৈরি হয়।
সে জন্য প্রবল গরমের মধ্যে শুধু পানি খেলে শরীর পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকে না। কারণ ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে প্রচুর লবণ ও প্রয়োজনীয় খনিজ বেরিয়ে যায়। তাই ওআরএস, ডাবের পানি, লবণ-চিনির পানি, ঘোল কিংবা বাটারমিল্ক এবং পুদিনাপাতা বা লেবু ইনফিউজড ওয়াটার নিয়মিত খেতে হবে।
ঘরের তাপমাত্রা খুব বেশি হলে শুধু ফ্যান চালিয়ে লাভ হয় না। সে ক্ষেত্রে ঘরের ভেন্টিলেশন কিংবা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হয়। শরীর অতিরিক্ত গরম মনে হলে ঘাড়, হাত-পা এবং বুকে ঠান্ডা পানি দিয়ে স্পঞ্জ করা যেতে পারে।
আর একটানা রোদে ঘোরাঘুরি বা অতিরিক্ত গরমে কাজ করার ফলে শরীরে বারবার ডিহাইড্রেশন কিংবা পানির ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে রক্তে টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থের ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং কিডনি তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে।
চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে পেশি নষ্ট হয়ে যায়, লিভারের ওপর চাপ পড়ে এবং রক্তে বিপজ্জনক ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্সও দেখা দেয়। তীব্র গরমের মধ্যে থাকা শ্রমিক ও চাকরিজীবীদের মধ্যে এখন কিডনিতে পাথর এবং ক্রনিক কিডনি ডিজিজ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
নিজেকে ঠান্ডা রাখতে শরীর রক্তপ্রবাহকে ত্বকের দিকে পাঠাতে চেষ্টা করে। তখন হার্টকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পাম্প করতে হয়। সে কারণে হৃদস্পন্দনের গতি বা হার্ট রেট স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বেড়ে যায়। মাসের পর মাস এ অবস্থা চলতে থাকলে কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম বা সংবহনতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে, যা পরবর্তীকালে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
আবার তীব্র গরমের মধ্যেও যদি কোনো ব্যক্তির ঘাম না হয়, তবে বুঝতে হবে— শরীরের নিজস্ব কুলিং সিস্টেম পুরোপুরি বিকল হয়ে গেছে এবং ওই ব্যক্তি হিটস্ট্রোকের শিকার হতে পারেন।
মানুষের শরীর রাতের ঘুমের সময় স্বাভাবিক নিয়মেই নিজেকে ঠান্ডা করে এবং ব্রেন ও হরমোন নেটওয়ার্ককে পুনরুজ্জীবিত করে। কিন্তু রাতের তাপমাত্রা বেশি থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, যা মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এর ফলে মনোযোগের অভাব, ভুলে যাওয়া, উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ এবং মানসিক অবসাদ দেখা দেয়।
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। শিশুদের শরীর বড়দের তুলনায় দ্রুত গরম হয় এবং তারা প্রচণ্ড ঘামে। ফলে দ্রুত ডিহাইড্রেশনের শিকার হয়। অতিরিক্ত ক্লান্তি, খিটখিটে ভাব, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, খাওয়ার অনিচ্ছা ও অলসতা। নবজাতকদের ক্ষেত্রে চোখ বসে যাওয়া, কান্নার সময় চোখ দিয়ে পানি না পড়া বা শরীর অতিরিক্ত গরম কিন্তু ত্বক শুকনো থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ।
আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়। তাই ৪৫ ডিগ্রি গরমে প্রবীণদের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং অ্যারিদমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে সবচেয়ে বেশি। ডিমেনশিয়া বা স্নায়ুরোগে আক্রান্ত প্রবীণরা অনেক সময় তৃষ্ণা অনুভব করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। হঠাৎ বিভ্রান্তি, অসংলগ্ন কথাবার্তা, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বা হ্যালুসিনেশনও হতে পারে।
