ক্লান্তি নাকি ব্রেন টিউমার? পার্থক্য চেনার উপায়
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আজকের দ্রুতগতির ব্যস্ত জীবনে মানসিক ক্লান্তি বা চরম অবসাদ যেন এক নিত্যদিনের সঙ্গী। মিটিং মিস করা, পরিচিত নাম ভুলে যাওয়া, কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া, কিংবা দীর্ঘক্ষণ ল্যাপটপে কাজ করার পর তীব্র মাথাব্যথা—এইসব সমস্যাকে আমরা সাধারণত কাজের চাপ, ঘুমহীনতা বা বয়স বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ বলেই ধরে নিই।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ধারণা সঠিক হলেও চিকিৎসকরা বলছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই সাধারণ সমস্যাগুলোই হতে পারে মস্তিষ্কের অত্যন্ত মারাত্মক এক রোগ ‘গ্লিওব্লাস্টোমা’-র প্রাথমিক সতর্কবার্তা।
গ্লিওব্লাস্টোমা কী?
গ্লিওব্লাস্টোমা হলো মস্তিষ্কের এক ধরণের অত্যন্ত জটিল ক্যানসার বা টিউমার, যা ‘অ্যাস্ট্রোসাইট’ নামক কোষ থেকে তৈরি হয়। অন্যান্য ক্যানসারের মতো এটি মস্তিষ্কে কোনো সুনির্দিষ্ট মাংসপিণ্ড বা চাকা তৈরি করে না; বরং মাটির নিচে গাছের শিকড়ের মতো সুস্থ ব্রেন টিস্যুর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে প্রাথমিক অবস্থায় কোনো মারাত্মক লক্ষণ দেখা যায় না, বরং অত্যন্ত ধীর ও সূক্ষ্মভাবে এর উপসর্গগুলো প্রকাশ পায়।
অধিকাংশ মানুষের ধারণা, ব্রেন টিউমার মানেই হবে অসহ্য মাথাব্যথা বা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো নাটকীয় কোনো ঘটনা। কিন্তু বাস্তবে গ্লিওব্লাস্টোমা আক্রান্ত রোগীরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ভাবেন যে তারা স্রেফ কাজের চাপে ক্লান্ত। আর এইখানেই লুকিয়ে আছে আসল বিপদ।
সাধারণ ক্লান্তি বনাম গ্লিওব্লাস্টোমা: মূল পার্থক্য কোথায়?
চিকিৎসকদের মতে, লক্ষণ কী—তার চেয়ে বড় বিষয় হলো লক্ষণটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেমন আচরণ করছে।
বার্নআউট বা কাজের ক্লান্তি: এটি মানুষের সামগ্রিক শক্তি ও মনোযোগ কমিয়ে দেয়, তবে স্নায়ুতন্ত্রের কোনো স্থায়ী ক্ষতি করে না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ভালো ঘুম বা কাজ থেকে কিছুদিন ছুটি নিলে এই ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
গ্লিওব্লাস্টোমা: এটি বিশ্রাম বা ছুটি নিলে কমে না। যেহেতু টিউমারটি মস্তিষ্কের স্মৃতি, ভাষা, নড়াচড়া বা দৃষ্টিশক্তির নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ককে ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত করতে থাকে, তাই এর উপসর্গগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে কেবলই খারাপের দিকে যেতে থাকে।
সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যকার তুলনামূলক পার্থক্য
ভুলে যাওয়া: সাধারণ স্ট্রেসের কারণে মানুষ সাময়িকভাবে চাবি কোথায় রেখেছে ভুলে যেতে পারে। কিন্তু গ্লিওব্লাস্টোমার ক্ষেত্রে একজন অত্যন্ত গোছানো মানুষও বারবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভুলে যান, চেনা রান্নার রেসিপি মেলাতে পারেন না বা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার পরও হিসাব-নিকাশ মেলাতে হিমশিম খান।
সাধারণত রোগী নিজে বোঝার আগেই পরিবারের সদস্যরা এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেন।
মাথাব্যথা: স্ক্রিন টাইম বা টেনশনের মাথাব্যথা পানি পান করলে, বিশ্রাম নিলে বা সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধেই সেরে যায়।
কিন্তু টিউমারের কারণে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ চাপ বেড়ে গেলে যে মাথাব্যথা হয়, তা রাতে তীব্র আকার ধারণ করে। এছাড়া কাশি, হাঁচি বা নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ার সময় এই ব্যথা বাড়ে এবং এর সঙ্গে বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন: টিউমারটি মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবকে (যা আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে) আক্রান্ত করলে একজন শান্ত স্বভাবের মানুষও হঠাৎ খিটখিটে, আবেগহীন, খামখেয়ালি বা সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
অনেকেই একে বিষণ্ণতা বা পারিবারিক সমস্যা ভেবে ভুল করেন।
কথা বলার সমস্যা: ক্লান্তির কারণে মানুষ মাঝেমধ্যে কথা বলার খেই হারিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু ব্রেন টিউমারের রোগীরা স্পষ্ট জানা সত্ত্বেও বারবার ভুল শব্দ ব্যবহার করেন, কথা বলার সময় অস্বাভাবিক দীর্ঘ বিরতি নেন কিংবা বাক্য শেষ করতে পারেন না।
দৃষ্টিশক্তি ও ভারসাম্যের সমস্যা: অনেকেই চোখের ঝাপসা দেখাকে চশমার পাওয়ার বদলানো বা স্ক্রিনের ক্লান্তি মনে করেন। তবে ক্রমাগত সবকিছু জোড়া দেখা, হাঁটার সময় একপাশের জিনিসে বারবার ধাক্কা খাওয়া বা হাত থেকে হঠাৎ জিনিসপত্র পড়ে যাওয়া মোটেই অবহেলার বিষয় নয়।
সবচেয়ে বড় বিপজ্জনক লক্ষণ
১. প্রাপ্তবয়স্কদের প্রথমবার খিঁচুনি:
কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনে যদি হঠাৎ প্রথমবারের মতো খিঁচুনি বা ‘সিজার’ দেখা দেয়, তবে কালবিলম্ব না করে নিউরোলজিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে। এটি ব্রেন টিউমারের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হতে পারে। এমনকি হঠাৎ সাময়িক স্তব্ধ হয়ে যাওয়া, আকস্মিক বিভ্রান্তি বা শরীরের কোনো এক হাত-পায়ে ঝাঁকুনি হওয়াও টিউমারের লক্ষণ হতে পারে।
২. একাধিক লক্ষণের যৌথ উপস্থিতি:
গ্লিওব্লাস্টোমা সাধারণত একটি মাত্র লক্ষণ দেখে শনাক্ত করা যায় না। চিকিৎসকদের উদ্বেগ তখন বাড়ে যখন একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দেয়—যেমন মাথাব্যথার সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মাথাব্যথার সঙ্গে এক হাত দুর্বল হয়ে পড়া, কিংবা ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে কথা বলতে সমস্যা হওয়া।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত
বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করে বলেছেন, কর্মক্ষেত্রের ক্লান্তি বা সাধারণ মাথাব্যথা থাকা মানেই ব্রেন টিউমার নয়। তবে কোনো লক্ষণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং দিন দিন তা খারাপের দিকে যেতে থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে অবিলম্বে মস্তিষ্কেরে এমআরআই করানো উচিত।
যদিও চিকিৎসায় গ্লিওব্লাস্টোমার মূল প্রকৃতিকে রাতারাতি বদলে দেওয়া যায় না, তবে দ্রুত রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হলে নিউরোসার্জন, অনকোলজিস্ট এবং রেডিওলজিস্টদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল টিম রোগীকে আরও উন্নত চিকিৎসা দিতে পারেন, যা লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে দীর্ঘদিন সচল রাখতে সাহায্য করে।
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন

-6a5a9d1f1a1e7.jpg)