মেরুদণ্ডে আঘাত কি পুরুষের প্রজননক্ষমতা নষ্ট করে, যা বলছে গবেষণা
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম
ছবি- সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মেরুদণ্ডে আঘাতের পর পুরুষের প্রজননক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়—চিকিৎসকেরা কয়েক দশক ধরেই বিষয়টি জানেন। তবে এর সুনির্দিষ্ট কারণ এত দিন অজানা ছিল। এবার সেই রহস্যের সমাধান খুঁজতে গবেষণা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. জেনিফার ডুলিন। তার লক্ষ্য, মেরুদণ্ডে আঘাতের পর শরীরে কী ধরনের জৈবিক পরিবর্তন ঘটে, তা শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনের পথ তৈরি করা।
ডুলিন বলেন, মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত অধিকাংশ পুরুষই প্রজননক্ষম বয়সের। এ ধরনের আঘাত তাদের জীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। তারা চলাফেরার সক্ষমতা ও স্বাধীনতা হারাতে পারেন। এর পাশাপাশি অনেকেই পরিবার গড়তে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান। কিন্তু একপর্যায়ে জানতে পারেন, তাঁদের সন্তান জন্মদানের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ক্রেইগ এইচ. নিলসেন ফাউন্ডেশনের দুই বছর মেয়াদি অনুদানে পরিচালিত এ গবেষণায় মেরুদণ্ডে আঘাতের পর কেন পুরুষের প্রজননক্ষমতা এতটা কমে যায়, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর আনুমানিক ১৮ হাজার মানুষ মেরুদণ্ডে আঘাত পান। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই পুরুষ। এ ধরনের আঘাতের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিণতি পক্ষাঘাত হলেও প্রজননক্ষমতা হারানোও এর অন্যতম সাধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। তবে এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত ধারণা নেই।
ডুলিনের ভাষায়, ‘এটি শুধু পক্ষাঘাতের বিষয় নয়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম মেরুদণ্ডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।’
মস্তিষ্ক ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো মেরুদণ্ড। ডুলিনের ধারণা, মেরুদণ্ডে আঘাতের পর স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় শরীরের অন্যান্য কার্যক্রমের মতো প্রজননপ্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার মতে, তথ্য আদান-প্রদানের এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে শরীরের অঙ্গগুলোর স্বাভাবিক ভারসাম্যও নষ্ট হতে শুরু করে।
তবে সমস্যাটির সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়েছে একটি কারণে। মেরুদণ্ডে আঘাতের পর পুরুষের প্রজননক্ষমতা কমে গেলেও শুক্রাণু উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। এ ধরনের আঘাতের পরও পুরুষের শরীরে শুক্রাণু তৈরি হতে থাকে। চিকিৎসকেরা বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে শুক্রাণু সংগ্রহও করতে পারেন। আগের গবেষণায় আঘাতের পর শুক্রাণুর গুণগত মান কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলেও ঠিক কী কারণে এমন পরিবর্তন ঘটে, তা স্পষ্ট নয়।
ডুলিন বলেন, পুরুষের বীর্য ও শুক্রাণুর গুণগত মান নিয়ে প্রচুর চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য থেকে শুক্রাণুর মান খারাপ হওয়ার বিষয়টি জানা গেলেও এর পেছনের জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে এখনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়নি। তার গবেষক দল মূলত সেই প্রক্রিয়াগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করছে, যেগুলো শুক্রাণুর গুণগত মান কমে যাওয়ার সূচনা করে।
গবেষণায় সম্ভাব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে উঠে এসেছে ‘ব্লাড-টেস্টিস ব্যারিয়ার’ বা রক্ত ও অণ্ডকোষের মধ্যকার সুরক্ষাব্যবস্থা। রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধকের মতো এই ব্যবস্থাও বিকাশমান শুক্রাণুকে শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থার আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়। ডুলিনের ধারণা, মেরুদণ্ডে আঘাতের পর স্নায়ুতন্ত্রে সৃষ্ট পরিবর্তনের কারণে এই সুরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
তার আগের গবেষণায় মেরুদণ্ডে আঘাতের পর এই প্রতিবন্ধক দুর্বল হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে বিকাশমান শুক্রাণু শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থার সংস্পর্শে চলে আসতে পারে।
ডুলিনের অনুমান, রোগপ্রতিরোধক কোষগুলো তখন শুক্রাণুকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে পারে। পাশাপাশি এসব কোষ থেকে নিঃসৃত প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদান অণ্ডকোষের ভেতরে শুক্রাণুর জন্য ক্ষতিকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ফলে নিষেক প্রক্রিয়ায় শুক্রাণুর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে আশার দিকও দেখছেন গবেষকেরা। ডুলিন জানান, পুরুষের শরীরে নিয়মিত শুক্রাণু উৎপাদিত হয়। তাই স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং রক্ত ও অণ্ডকোষের মধ্যকার সুরক্ষাব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলে তাত্ত্বিকভাবে প্রজননক্ষমতাও ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। তবে এটি এখনো গবেষণাধীন একটি ধারণা, প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাপদ্ধতি নয়।
গবেষণাটিতে ডুলিনের সঙ্গে কাজ করছেন চিকিৎসক ও তার গবেষণাগারের পিএইচডি গবেষক ড. আকরাম এসফানদানি। তিনি জানান, মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া অনেক পুরুষের সঙ্গে কথা বলে তিনি দেখেছেন, বিয়ে, বাবা হওয়া এবং ভবিষ্যতে সন্তান নিতে পারবেন কি না—এসব বিষয় নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন থাকেন। প্রজননক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা তাদের আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতেও প্রভাব ফেলে।
এসফানদানির মতে, মেরুদণ্ডে আঘাত নিয়ে গবেষণায় সাধারণত পক্ষাঘাত, চলাফেরার সক্ষমতা ও স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। অথচ প্রজননক্ষমতার সমস্যা রোগীদের জীবনমানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
মেরুদণ্ডে আঘাতের পর মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ডুলিনের বৃহত্তর গবেষণা কার্যক্রমের অংশ এই প্রকল্প। চলতি বছরের শুরুর দিকে ডুলিন ও তার সহযোগীরা বিশেষ একদল বিরল স্নায়ুকোষ শনাক্ত করেন, যা পায়ের পেশির কার্যক্রম সক্রিয় করতে সাহায্য করতে পারে। এ আবিষ্কার মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের চলাফেরার সক্ষমতা ও স্বাধীনতা বাড়ানোর চিকিৎসা উদ্ভাবনের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়েছে।
নতুন গবেষণার মাধ্যমে প্রজননক্ষমতা হ্রাসের কারণও স্পষ্ট হবে বলে আশা করছেন ডুলিন। তার মতে, মেরুদণ্ডে আঘাত নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের জীবনমানের জন্য প্রজননক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ সমস্যার কার্যকর সমাধান উদ্ভাবনের আগে এর পেছনের জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করা প্রয়োজন।

-6ad3660e7f7c8.jpg)