সাজানো গল্পের মোহময় ফাঁদ
ভালোবাসার সম্পর্কে অশান্তি বাড়াচ্ছে ৩০ সেকেন্ডের রিলস, করণীয় কী?
Advertisement
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
প্রতীকী ছবি: এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে ইনস্টাগ্রাম স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎই সামনে এল ৩০ সেকেন্ডের একটি রিলস। ভিডিওতে গম্ভীর মুখে এক ইনফ্লুয়েন্সার বলছেন, ‘ইফ দে ওয়ান্টেড টু, দে উড হ্যাভ’ কিংবা ‘হাউ আ হাই-ভ্যালু পার্টনার শুড ট্রিট ইউ’। ব্যস, চোখের পলকে মনের অবচেতন কোণে সেই কথার সঙ্গে মিলে যেতে শুরু করে নিজের সঙ্গী বা স্ত্রীর আচরণ। আর তারপর থেকেই শুরু হয় নিজের সম্পর্কে চুলচেরা বিশ্লেষণ! কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি, সোশ্যাল মিডিয়ার এই ৩০ সেকেন্ডের রিলস বা জাঁকজমকপূর্ণ সারপ্রাইজের ভিডিওগুলো কি সত্যিই আপনার বাস্তব সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি, নাকি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সম্পর্কে ডেকে আনছে অশান্তি?
ভারতের একটি জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এ বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। শহর ও মফস্বলের ২২ থেকে ৩৮ বছর বয়সি প্রায় ১০ হাজার তরুণ-তরুণীর ওপর চালানো এই সমীক্ষায় খতিয়ে দেখা হয়েছে রিলস ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন সম্পর্কের টিপস কীভাবে তাদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, এ বিষয়ে মনোবিদ ও তরুণ প্রজন্মের অভিজ্ঞতা কী বলছে—
১. অবাস্তব তুলনা ও অন্ধ অনুকরণ
৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে যেভাবে কোনো একটি সম্পর্কের সমীকরণ ফুটিয়ে তোলা হয়, বাস্তব জীবন সবসময় তেমনটি নাও হতে পারে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৫ বছরের বেশি বয়সি ৪ হাজার ৬৯৪ জন উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার রিলসের প্রতিটি নিয়ম সব জুটির ওপর অন্ধভাবে চাপিয়ে দিলেই সম্পর্কে জটিলতা বাড়ে। মনোবিদদের মতে, বেশিরভাগ মানুষই এই সরল সত্যটি ভুলে যান যে প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব একটি প্রেক্ষাপট বা জার্নি থাকে। সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও দেখে পার্টনারের সামান্য একটা মিসড কলকে হঠাৎ ‘ইমোশনাল নেগ্লিজেয়েন্স’ বা মানসিক অবহেলা ধরে বসলে ভুল করা হবে। বাস্তব জীবনের জটিলতা এবং সঙ্গীর পরিস্থিতি অনুধাবন করা এখানে সবচেয়ে বেশি জরুরি।
ক্লান্তিকর অফিস সামলে ঘরে ফিরে অনেকেই কিছুটা সময় নিজেদের মতো বা একা কাটাতে পছন্দ করেন। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ পুরুষ অভিযোগ করেছেন, কাজের পর একটু ব্যক্তিগত সময় বা ‘স্পেস’ চাইলে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন ট্রেন্ডের কারণে তাদের সরাসরি ‘ইমোশনালি আনঅ্যাভেলেবল’ বা অনুভূতিহীন বলে দেগে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ৩৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, দাম্পত্যে বা সম্পর্কে বড় কোনো সারপ্রাইজ কিংবা জমকালো ডেট প্ল্যান না করতে পারার অর্থ এই নয় যে পার্টনার সম্পর্কে কোনো যত্ন বা আন্তরিকতা রাখছেন না।
৩. সাজানো গল্পের মোহময় ফাঁদ
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩ হাজার ৩৪৭ জন স্পষ্ট জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্পর্কের কন্টেন্টগুলো মূলত ভিউ ও ফলোয়ার বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই একাধিক রিটেক নিয়ে সাজিয়ে-গুছিয়ে তৈরি করা হয়। সম্পর্কের লড়াই, টানাপোড়েন বা স্বাভাবিক গ্লানিগুলো সেখানে কখনোই ঠাঁই পায় না। এত কিছু জেনেশুনেও সাধারণ মানুষ সেই নিখুঁত সাজানো অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের সাদামাটা জীবনের তুলনা করতে শুরু করেন। এর ফলে শান্ত, সাবলীল এবং গভীর ভালোবাসার প্রকাশগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম চাকচিক্যের কাছে ফিকে হয়ে যায়। আধুনিক প্রেমের সংজ্ঞাকে ওভাবেই ওলটপালট করে দিচ্ছে এই রিলসের দুনিয়া।
অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ার সবকিছুই যে খারাপ, এমনটা মনে করেন না উত্তরদাতারা। এর কিছু ইতিবাচক দিকও খুঁজে পেয়েছেন তারা। প্রায় ৪৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানান, রিলসের কল্যাণে অনেক সময় সুস্থ সম্পর্কের গণ্ডি বা সীমানা (বাউন্ডারি) নির্ধারণ করা সহজ হয়েছে। বিশেষ করে ত্রিশের কোঠায় থাকা ২৭ শতাংশ নারী স্বীকার করেছেন যে, ভালো এবং গঠনমূলক রিলস মাঝে মাঝে সম্পর্কে নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়।
আপনার করণীয় কী?
পরের বার সঙ্গীকে কোনো ইঙ্গিতপূর্ণ রিলস ফরোয়ার্ড করার আগে একটু থেমে ভাবুন—সমস্যাটি কি সত্যিই আপনার সঙ্গীর আচরণে, নাকি আপনার সোশ্যাল মিডিয়া ফিডে? ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও দেখে পার্টনারকে মনে মনে বিচার বা ‘জাজ’ না করে সরাসরি খোলামেলা কথা বলুন। মনোযোগ, স্পষ্ট যোগাযোগ নাকি পারস্পরিক আশ্বাস—আপনার সম্পর্কের এই মুহূর্তে ঠিক কোনটির প্রয়োজন, তা খুঁজে বের করুন নিজেই।


