সবুজ, হলুদ ও লাল ক্যাপসিকামের পার্থক্য কী? রঙের সঙ্গে বদলায় পুষ্টিগুণও
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কাঁচা, গ্রিল করা, রোস্ট কিংবা পুর দিয়ে রান্না—ক্যাপসিকাম খাওয়ার রয়েছে নানা উপায়। বেল পেপার, সুইট পেপার বা পাপরিকা নামেও পরিচিত এই সবজি রঙের ভিন্নতার কারণে দেখতে যেমন আলাদা, তেমনি এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণেও রয়েছে পার্থক্য।
ক্যাপসিকামের উৎপত্তি মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায়। এটি টমেটো ও বেগুনের মতো সোলানেসি গোত্রের উদ্ভিদ। সাধারণত চিনি তুলনামূলক কম এবং ঝাল নয় বলে ক্যাপসিকামকে সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। তবে উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ফল, আরও নির্দিষ্ট করে বললে এক ধরনের বেরি। কারণ, এটি ফুল থেকে জন্মায় এবং এর ভেতরে বীজ থাকে।
জালাপেনো ও বার্ডস আইয়ের মতো ঝাল মরিচও ক্যাপসিকামের একই গোত্রের। এসব মরিচে ক্যাপসাইসিন নামের একটি রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা জিহ্বার তাপ ও ব্যথা অনুভবকারী গ্রাহককে সক্রিয় করে ঝাল অনুভূতি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, মিষ্টি ক্যাপসিকামে ক্যাপসাইসিন থাকে না বললেই চলে।
অনেকে মনে করেন, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল ক্যাপসিকাম আলাদা জাতের। বাস্তবে এগুলো একই ফলের বিভিন্ন পর্যায়ের রং। সব ক্যাপসিকাম প্রথমে সবুজ থাকে। পরিপক্ব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রং বদলে হলুদ, কমলা এবং শেষে লাল হয়। তবে রঙের এই পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক নয়; এর সঙ্গে স্বাদ ও পুষ্টিগুণেরও সম্পর্ক রয়েছে।
রঙের সঙ্গে বদলায় স্বাদ
ক্যাপসিকামের নিচে তিনটি খাঁজ থাকলে সেটি পুরুষ আর চারটি খাঁজ থাকলে স্ত্রী—এবং স্ত্রী ক্যাপসিকাম বেশি মিষ্টি—এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এটি সম্পূর্ণ ভুল। ফলের ক্ষেত্রে ফুলের মতো পুরুষ ও স্ত্রী অংশ থাকে না। ক্যাপসিকামের নিচে সাধারণত দুই থেকে পাঁচটি খাঁজ থাকতে পারে। এর আকৃতি মূলত উদ্ভিদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে, স্বাদের ওপর নয়।
ক্যাপসিকামের রং ও স্বাদের পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো ফলটি কতটা পরিপক্ব হওয়ার পর গাছ থেকে তোলা হচ্ছে।
সবুজ ক্যাপসিকামে ক্লোরোফিল নামের রঞ্জক পদার্থ বেশি থাকে। এই উপাদান উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণে সাহায্য করে, যার মাধ্যমে উদ্ভিদ বেড়ে ওঠার জন্য শক্তি তৈরি করে। ফল পরিপক্ব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লোরোফিল ভেঙে যায় এবং ক্যারোটিনয়েড নামের হলুদ, কমলা ও লাল রঞ্জক পদার্থের উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সবুজ ক্যাপসিকাম: সাধারণত চারা রোপণের প্রায় আট সপ্তাহ পর এটি সংগ্রহ করা যায়। পুরোপুরি পরিপক্ব না হওয়ায় এর স্বাদ কিছুটা তেতো এবং গঠন শক্ত ও মচমচে থাকে। ভাজি, ফাহিতা, ক্যাসেরোল ও সালাদে এটি ভালো মানায়।
হলুদ ও কমলা ক্যাপসিকাম: সবুজ ক্যাপসিকামের তুলনায় যথাক্রমে প্রায় দুই ও তিন সপ্তাহ পরে এগুলো সংগ্রহ করা হয়। স্বাদ মৃদু ও মিষ্টি। কাঁচা অবস্থায় বেশ মচমচে থাকে বলে সালাদ ও টিফিনে ব্যবহার করা যায়। রান্না করলে নরম হয় এবং বারবিকিউতেও ভালো লাগে।
লাল ক্যাপসিকাম: এটি সবচেয়ে পরিপক্ব। সবুজ অবস্থার তুলনায় গাছে প্রায় চার সপ্তাহ বেশি থাকে। ফলে এর স্বাদ সবচেয়ে মিষ্টি ও সমৃদ্ধ হয়। রান্না করলে তুলনামূলক নরম হয়। রোস্ট, স্যুপ ও ডিপ তৈরিতে এটি বিশেষ উপযোগী।
পুষ্টিগুণেও রয়েছে পার্থক্য
সব রঙের ক্যাপসিকামেই রয়েছে ভিটামিন সি, ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনলজাতীয় উপাদান ও ক্যারোটিনয়েডের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। পাশাপাশি এতে খাদ্যআঁশ রয়েছে, যা হজমের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে রঙের পাশাপাশি কাঁচা বা রান্না করে খাওয়ার ওপরও পুষ্টি পাওয়ার পরিমাণ নির্ভর করে।
ক্যাপসিকামের রং নির্ধারণে ক্যাপস্যানথিন, বিটা-ক্যারোটিন, লুটিন, ভায়োলাক্সানথিন ও জিয়াজ্যানথিনের মতো ক্যারোটিনয়েড ভূমিকা রাখে। ক্লোরোফিল ও ক্যারোটিনয়েড—দুটিই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, তবে শরীরে এদের উপকারিতা এক নয়।
সবুজ, হলুদ ও কমলা ক্যাপসিকাম: এগুলোতে লুটিন, ভায়োলাক্সানথিন ও জিয়াজ্যানথিন থাকে। এসব উপাদান চোখের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে এবং বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন ও ছানি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কমলা ও লাল ক্যাপসিকাম: এসব রঙের ক্যাপসিকামে ভিটামিন সি ও বিটা-ক্যারোটিনের পরিমাণ বেশি থাকে। শরীর বিটা-ক্যারোটিনকে ভিটামিন এ-তে রূপান্তর করে। কোষের সুস্থতা, দৃষ্টিশক্তি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমের জন্য ভিটামিন এ গুরুত্বপূর্ণ।
লাল ক্যাপসিকাম: এতে ক্যাপস্যানথিনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে শরীরের কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে।
কাঁচা নাকি রান্না করে খাবেন?
ক্যাপসিকাম রান্না করলে ক্যারোটিনয়েড ও পলিফেনলের মতো কিছু উপকারী উপাদান শরীরের জন্য সহজলভ্য হতে পারে। তবে রান্নার তাপে ভিটামিন সি কমে যেতে পারে।
তাই পুষ্টিগুণের সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে বিভিন্ন রঙের ক্যাপসিকাম কখনো কাঁচা, আবার কখনো রান্না করে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীর নানা ধরনের উপকারী পুষ্টি ও উদ্ভিজ্জ যৌগ পেতে পারে।
ক্যাপসিকামের রঙের সঙ্গে দামেরও সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণত সবুজ ক্যাপসিকাম তুলনামূলক সস্তা, কারণ এটি আগে সংগ্রহ করা যায় এবং উৎপাদন খরচ কম হয়। লাল ক্যাপসিকাম গাছে বেশি সময় থাকায় এর উৎপাদন খরচ বাড়ে। অন্যদিকে, হলুদ ক্যাপসিকাম চাষ করা তুলনামূলক কঠিন এবং সংগ্রহের সময়সীমা কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে এর দাম সবচেয়ে বেশি হয়।
দাম কমাতে চাইলে দেখতে কিছুটা অসমান বা দুই রঙের ক্যাপসিকামও কেনা যেতে পারে। যেমন, আংশিক সবুজ ও আংশিক কমলা রঙের ক্যাপসিকামে বিভিন্ন ধরনের ক্যারোটিনয়েডের মিশ্রণ থাকতে পারে। আকৃতি বেঁকে যাওয়া বা রং অসমান হওয়া মানেই এর স্বাদ বা পুষ্টিগুণ কম—এমন নয়।
সব মিলিয়ে, সবুজ, হলুদ, কমলা কিংবা লাল—প্রতিটি রঙের ক্যাপসিকামই পুষ্টিকর। তাই একটি নির্দিষ্ট রঙের ওপর নির্ভর না করে খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন রঙের ক্যাপসিকাম রাখা এবং কাঁচা ও রান্না—দুইভাবেই খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
সূত্র: দ্য কনভারসেশন
