সম্পত্তি দান ও হেবা: রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম ও বাতিলের আইনি বিধান
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিজের নামে থাকা জমি বা অন্য সম্পত্তি সন্তান, স্বামী-স্ত্রী কিংবা নিকটাত্মীয়ের নামে হস্তান্তর করতে চান অনেকে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত একটি পদ্ধতি হলো দান বা হেবা। তবে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে আইনগত নিয়ম, দলিল নিবন্ধন এবং দখল হস্তান্তরের বিষয়গুলো ঠিকভাবে অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে সম্পত্তি দানের সাধারণ বিধান রয়েছে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ও ১২৩ ধারায়। অন্যদিকে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে হেবা একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। স্থাবর সম্পত্তির দান ও হেবা নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক।
সম্প্রতি সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ২০২৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করে দানের নতুন বিধানও যুক্ত হয়েছে। ফলে দান বা হেবা করার আগে সংশ্লিষ্ট আইনি শর্তগুলো জানা জরুরি।
দান কী এবং কীভাবে করতে হয়?
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় এবং বিনিময়মূল্য ছাড়াই নিজের বিদ্যমান স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অন্য কাউকে হস্তান্তর করলে এবং গ্রহীতা বা তাঁর পক্ষে কেউ তা গ্রহণ করলে তাকে দান বলা হয়। যিনি সম্পত্তি দেন, তিনি দাতা; আর যিনি গ্রহণ করেন, তিনি দানগ্রহীতা।
দান কার্যকর হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, দানটি হতে হবে স্বেচ্ছায় এবং কোনো প্রতিদান ছাড়া। দ্বিতীয়ত, দাতা সম্পত্তির বৈধ মালিক হতে হবে এবং দান করার আইনগত সক্ষমতা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, দানগ্রহীতা বা তার পক্ষে কেউ দান গ্রহণ করবেন। এই গ্রহণ দাতার জীবদ্দশায় এবং তিনি দান করার সক্ষমতা থাকা অবস্থায় সম্পন্ন হতে হবে।
স্থাবর সম্পত্তি, যেমন জমি বা বাড়ি দান করতে হলে নিবন্ধিত দলিল করতে হবে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৩ ধারা অনুযায়ী, দাতার স্বাক্ষরযুক্ত দলিল অন্তত দুইজন সাক্ষীর মাধ্যমে সত্যায়িত হতে হবে। অন্যদিকে অস্থাবর সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল অথবা আইন অনুযায়ী সম্পত্তির দখল হস্তান্তরের মাধ্যমে দান সম্পন্ন করা যেতে পারে।
হেবা কী, দানের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?
হেবা হলো মুসলিম ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী সম্পত্তি দানের একটি পদ্ধতি। সাধারণ দানের মতো হেবার ক্ষেত্রেও বিনিময়মূল্য ছাড়াই সম্পত্তি হস্তান্তর করা হয়। তবে হেবার বৈধতার জন্য তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
১. ঘোষণা: দাতাকে স্পষ্টভাবে সম্পত্তি হেবা করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে হবে।
২. গ্রহণ: যাকে হেবা করা হচ্ছে, তাঁকে বা তাঁর পক্ষে বৈধ প্রতিনিধিকে তা গ্রহণ করতে হবে।
৩. দখল হস্তান্তর: সম্পত্তির বাস্তব বা আইনস্বীকৃত গঠন অনুযায়ী দখল গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
বাংলাদেশে স্থাবর সম্পত্তির হেবা ঘোষণাও নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৩ ধারায় মুসলিম আইনের হেবাকে স্থাবর সম্পত্তির দান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ১৭ ধারায় হেবা ঘোষণার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তবে শুধু দলিল নিবন্ধন করলেই হেবা সম্পূর্ণ হয়েছে— এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। হেবা ঘোষণার পাশাপাশি গ্রহণ এবং দখল হস্তান্তরের বিষয়টিও প্রমাণযোগ্য হতে হবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর দেওয়া এক রায়ে হেবা বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে ঘোষণা, গ্রহণ এবং দখল হস্তান্তরের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আদালত বলেছেন, নিবন্ধিত হেবা দলিল থাকলেও তা নিজে থেকেই দখল হস্তান্তরের প্রমাণ হয়ে যায় না।
দান ও হেবায় কি পুরো সম্পত্তি দেওয়া যায়?
জীবদ্দশায় নিজের বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তি দান বা হেবা করার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে নির্দিষ্ট কোনো এক-তৃতীয়াংশের সীমা নেই। তবে দাতা যতটুকু সম্পত্তির বৈধ মালিক, ততটুকুই হস্তান্তর করতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার ও ওসিয়তের নিয়মের সঙ্গে দান বা হেবাকে এক করে দেখা যাবে না। ওসিয়তের ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে এক-তৃতীয়াংশসংক্রান্ত বিধান রয়েছে; কিন্তু জীবদ্দশায় সম্পন্ন বৈধ দান বা হেবার নিয়ম আলাদা।
তবে উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রতারণামূলক, জালিয়াতিপূর্ণ বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে দলিল করা হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তাই সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে মালিকানা ও দলিলের বৈধতা নিশ্চিত করা জরুরি।
হেবা রেজিস্ট্রেশন ফি কত?
নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৭৮ক ধারায় নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়দের মধ্যে হেবা ঘোষণার নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্পত্তির মূল্য যতই হোক, এই নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে হেবার ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি একই।
যেসব সম্পর্কের মধ্যে ১০০ টাকা নিবন্ধন ফি প্রযোজ্য—
স্বামী ও স্ত্রী।
বাবা-মা ও সন্তান।
দাদা-দাদি বা নানা-নানি এবং নাতি-নাতনি।
আপন ভাই ও আপন বোন।
এই তালিকার বাইরে অন্য কাউকে হেবা করলে ১০০ টাকার নির্দিষ্ট ফি প্রযোজ্য নয়। সে ক্ষেত্রে প্রচলিত সরকারি ফি ও প্রযোজ্য খরচ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জেনে নিতে হবে।
উল্লেখ্য, সাধারণ দানপত্র এবং মুসলিম আইনের হেবা ঘোষণার নিবন্ধন ফি এক বিষয় নয়। তাই দলিলের ধরন ও পক্ষগুলোর সম্পর্ক অনুযায়ী ফি নির্ধারণ করা জরুরি।
২০২৬ সালের নতুন আইন
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সংশোধিত আইনে ১২২ক ও ১২২খ ধারা সংযোজন করা হয়েছে।
নতুন ১২২ক ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে সম্পত্তি দানের পরও দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, দাতা সম্পত্তি অন্যের নামে দান করলেও নিজের জীবদ্দশায় তা ভোগ করার অধিকার রাখতে পারবেন।
তবে এই সুবিধা সবার জন্য নয়। আইন অনুযায়ী—
বাবা-মা সন্তানকে বা সন্তান বাবা-মাকে।
দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে কিংবা নাতি-নাতনি তাঁদের দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে।
স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরকে।
এ ধরনের দানের ক্ষেত্রে স্থাবর সম্পত্তির জন্য নিবন্ধিত দলিল করতে হবে এবং দলিলে দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ থাকতে হবে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, দাতার জীবদ্দশায় দানগ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। তবে দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার বহাল থাকবে।
নতুন বিধানে এ ধরনের দান কি বাতিল করা যাবে?
২০২৬ সালের সংশোধিত আইনের ১২২খ ধারায় বলা হয়েছে, ১২২ক ধারার অধীনে নিবন্ধিত দান সাধারণভাবে বাতিল করা যাবে না। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সম্মতিতে প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান পরিবর্তন বা বাতিল করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন থাকতে হবে।
আবার কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম বা অন্য কোনো কারণে সম্মতি দিতে না পারলে অপর পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ ও প্রয়োজনীয় তদন্তের পর জেলা জজ এ বিষয়ে আদেশ দিতে পারেন।
অর্থাৎ, নতুন আইনে দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করে করা দানের ক্ষেত্রে বাতিলের জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
সাধারণ দান বা হেবা কি বাতিল করা যায়?
সম্পত্তি দান বা হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর দাতা একতরফাভাবে ইচ্ছা করলেই তা বাতিল করতে পারবেন— এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৬ ধারায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা ঘটলে দান স্থগিত বা বাতিল হবে— এমন শর্ত দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে থাকতে পারে। তবে সেই ঘটনা দাতার নিজের ইচ্ছাধীন হতে পারবে না। শুধু দাতার ইচ্ছায় যেকোনো সময় দান বাতিল করা যাবে— এমন শর্ত আইনসম্মত নয়।
এ ছাড়া চুক্তি বাতিলযোগ্য হওয়ার যেসব আইনি কারণ রয়েছে, যেমন প্রতারণা, জবরদস্তি বা অযাচিত প্রভাবের মতো বিষয় প্রমাণিত হলে দান বাতিলের প্রশ্ন আসতে পারে। তবে এ ধরনের ক্ষেত্রে আদালতের শরণাপন্ন হতে হতে পারে।
মুসলিম আইনে হেবা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রেও আলাদা বিধান ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে হেবা, দখল হস্তান্তর এবং গ্রহীতার মৃত্যুর মতো বিষয় প্রত্যাহারের সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সব হেবা একই নিয়মে বাতিল করা যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়।
সম্পত্তি দান বা হেবা করার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন
সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি—
দাতা সম্পত্তির প্রকৃত ও বৈধ মালিক কি না, তা যাচাই করুন।
জমির দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর ও পরিমাণ পরীক্ষা করুন।
সম্পত্তি যৌথ মালিকানাধীন হলে দাতার প্রকৃত অংশ কতটুকু, তা নিশ্চিত করুন।
দানগ্রহীতা সম্পত্তি গ্রহণ করছেন কি না, তা নিশ্চিত করুন।
হেবার ক্ষেত্রে দখল হস্তান্তরের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
স্থাবর সম্পত্তির দান বা হেবা দলিল যথাযথভাবে নিবন্ধন করুন।
দলিলে কোনো বিশেষ শর্ত থাকলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।

