একই জমির মালিক দুজন? প্রকৃত মালিক চেনার ৮ উপায়
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একই জমির মালিকানা দাবি করছেন দুই ব্যক্তি। একজনের কাছে দলিল, অন্যজনের কাছেও রয়েছে মালিকানার কাগজপত্র। এমন পরিস্থিতিতে কে প্রকৃত মালিক, তা নির্ধারণ করা সহজ নয়। শুধু দলিল, খতিয়ান কিংবা নামজারি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। জমির প্রকৃত মালিকানা যাচাই করতে হলে আগের মালিক থেকে বর্তমান দাবিদার পর্যন্ত হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা, সরকারি ভূমি রেকর্ড এবং জমির বাস্তব অবস্থান মিলিয়ে দেখতে হবে।
বাংলাদেশে একই জমি একাধিকবার বিক্রি, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির হিসাব নিয়ে বিরোধ, জাল বা ত্রুটিপূর্ণ দলিল এবং ভূমি রেকর্ডের অসংগতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই জমি কেনা কিংবা মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করা জরুরি।
একই জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ হলে যেভাবে যাচাই করবেন
১. দুই পক্ষের দলিল পরীক্ষা করুন
প্রথমেই উভয় পক্ষের দলিল সংগ্রহ করে তুলনা করতে হবে। দলিল নম্বর, নিবন্ধনের তারিখ, সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বিক্রেতা-ক্রেতার পরিচয়, জমির পরিমাণ, মৌজা, দাগ নম্বর ও সীমানা মিলিয়ে দেখুন।
পাশাপাশি যাচাই করুন, জমি বিক্রির সময় বিক্রেতার ওই সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনগত অধিকার ছিল কি না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংরক্ষিত নথির সঙ্গে দলিলের তথ্য মিলিয়ে নিন।
২. খতিয়ান ও দাগ নম্বর মিলিয়ে দেখুন
জমির মালিকানা যাচাইয়ে খতিয়ান ও দাগ নম্বর গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিভিন্ন জরিপে একই জমির খতিয়ান ও দাগ নম্বর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু একটি রেকর্ডের ওপর নির্ভর না করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা সর্বশেষ প্রাসঙ্গিক জরিপের রেকর্ড পরীক্ষা করুন।
দুই পক্ষের দলিলে একই মৌজা ও দাগ নম্বর উল্লেখ রয়েছে কি না, জমির পরিমাণ ও সীমানা মেলে কি না এবং আগের রেকর্ড থেকে মালিকানা পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
৩. নামজারির কাগজপত্র যাচাই করুন
নামজারি বা মিউটেশন জমির মালিকানা পরিবর্তন, উত্তরাধিকার কিংবা অন্য প্রাসঙ্গিক কারণে ভূমি রাজস্বের রেকর্ড হালনাগাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু শুধু নামজারি খতিয়ান দেখে জমির চূড়ান্ত মালিকানা নির্ধারণ করা যায় না।
দুই পক্ষের নামজারি করা থাকলে কোন দলিল বা উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে তা হয়েছে, জমির পরিমাণ ও হিস্যা ঠিকভাবে উল্লেখ রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে অসংগতি আছে কি না, তা পরীক্ষা করুন।
৪. আগের মালিক থেকে বর্তমান মালিক পর্যন্ত দলিলের ধারাবাহিকতা দেখুন
জমির মালিকানা যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বায়া দলিল পরীক্ষা। অর্থাৎ বর্তমান বিক্রেতা কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন এবং তার আগে জমিটি কার কার হাত ঘুরে এসেছে, তা অনুসন্ধান করতে হবে।
একই জমি দুই ব্যক্তির কাছে বিক্রি হয়ে থাকলে শুধু কার দলিল আগে বা পরে হয়েছে, তা দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। উভয় বিক্রেতার বৈধ মালিকানা ছিল কি না, প্রথম বিক্রির পর বিক্রেতার কাছে কোনো স্বত্ব অবশিষ্ট ছিল কি না এবং জমির কোন অংশ হস্তান্তর করা হয়েছিল, তা বিশ্লেষণ করতে হবে।
৫. ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ পরীক্ষা করুন
দুই পক্ষের কাছেই জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রসিদ থাকলে কোন রেকর্ডের ভিত্তিতে কর দেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করুন। রসিদে উল্লেখ করা জমির পরিমাণ ও পরিচিতি সংশ্লিষ্ট খতিয়ান এবং নামজারির সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। তবে ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ একা জমির মালিকানা প্রমাণ করে না। এটি অন্যান্য নথির সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করার একটি সহায়ক দলিল।
৬. জমির বাস্তব অবস্থান ও সীমানা যাচাই করুন
কাগজপত্রে জমির বিবরণ সঠিক মনে হলেও বাস্তবে জমির অবস্থান বা পরিমাণে অসংগতি থাকতে পারে। তাই দলিলে উল্লেখ করা মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, চৌহদ্দি ও নকশার সঙ্গে বাস্তব জমি মিলিয়ে দেখুন।
প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ারের সহায়তায় জমি পরিমাপ করানো যেতে পারে। তবে জমি মাপলেই মালিকানা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয় না; এর জন্য দলিল ও অন্যান্য আইনগত নথিও পরীক্ষা করতে হবে।
৭. উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি হলে হিস্যা যাচাই করুন
জমিটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হলে মূল মালিকের পরিচয়, ওয়ারিশদের তালিকা, প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা এবং জমি বণ্টন বা হস্তান্তরের কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি।
কোনো ওয়ারিশ নিজের অংশের চেয়ে বেশি জমি বিক্রি করেছেন কি না কিংবা একই অংশ একাধিক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করতে হবে। ওয়ারিশ সনদ উত্তরাধিকারীদের পরিচয় যাচাইয়ে সহায়ক হলেও এটি একাই জমির চূড়ান্ত স্বত্ব নির্ধারণ করে না।
৮. বিরোধের সমাধান না হলে কোথায় যাবেন
দলিল ও ভূমি রেকর্ড যাচাই করেও বিরোধের নিষ্পত্তি না হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর বা আদালতের সহায়তা নিতে হবে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়: নামজারি ও ভূমি রাজস্বের রেকর্ড-সংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগ করা যায়।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিস: দলিলের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য ও সংরক্ষিত নথি যাচাই করা যায়।
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর: প্রাসঙ্গিক খতিয়ান ও জরিপের নকশা সংগ্রহ বা যাচাই করা যায়।
দেওয়ানি আদালত: প্রকৃত মালিকানা বা স্বত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলে আইনজীবীর পরামর্শে উপযুক্ত আইনি প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে।
কোন কর্তৃপক্ষ কী ধরনের প্রতিকার দিতে পারবেন, তা বিরোধের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য আইনের ওপর নির্ভর করে। নামজারি বা রাজস্ব রেকর্ডের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সব ধরনের মালিকানা বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় না।
জমি কেনার আগে সতর্ক থাকুন
জমি কেনার আগে বিক্রেতার মূল দলিল, আগের মালিকানার ধারাবাহিকতা, প্রাসঙ্গিক খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং জমির প্রকৃত সীমানা যাচাই করুন। জমির ওপর মামলা, নিষেধাজ্ঞা বা অন্য কোনো আইনি জটিলতা রয়েছে কি না, সেটিও খোঁজ নিন।

-6ae2dca358b1c.jpg)