ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া নেগেটিভ, তবু জ্বর-শরীরব্যথা; কী বলছেন চিকিৎসকেরা?
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
দেশজুড়ে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও দুর্বলতায় ভুগছেন অনেক মানুষ।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশজুড়ে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও দুর্বলতায় ভুগছেন অনেক মানুষ। শুরুতে জ্বর দেখা দিলেও পরে তীব্র শরীরব্যথা, মাথাব্যথা এবং শরীরে শুষ্কতার অনুভূতিসহ নানা উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। তবে এসব লক্ষণ নিয়ে পরীক্ষা করানোর পর অনেকের ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হচ্ছে না। এতে নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন পর্যন্ত দেশে নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং পরিচিত বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম নিজেও সম্প্রতি এমন জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার কর্মস্থলের অনেক সহকর্মী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় নিজের জ্বর নিয়েও প্রথমে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে ওষুধ সেবন ও বিশ্রাম নিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
জাহিদুল ইসলামের মতো জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও দুর্বলতার উপসর্গ নিয়ে বর্তমানে অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। কিন্তু পরীক্ষায় ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়া শনাক্ত না হওয়ায় এসব অসুস্থতার কারণ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।
নতুন কোনো ভাইরাস ছড়াচ্ছে কি?
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)।
প্রতিষ্ঠানটির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু ও হামসহ কয়েকটি পরিচিত রোগের সংক্রমণ রয়েছে। পাশাপাশি ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণও হতে পারে।
তিনি বলেন, নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়নি। ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্তের জন্য আইইডিসিআরের নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে আসা নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তবে সারা দেশের সব রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।
তার মতে, ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও অন্য কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা, রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) ও অ্যাডিনোভাইরাসের সংক্রমণেও জ্বরসহ বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে এসব ভাইরাস শনাক্তের জন্য সব রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা করা হয় না। অনেক সময় রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অধ্যাপক নওশের আলম বলেন, কোনো রোগী ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষা করানোর পর নেগেটিভ ফল পেলেন। এরপর চিকিৎসক আর কোনো পরীক্ষা না দিয়ে চিকিৎসা দিলেন এবং রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেন। এ ক্ষেত্রে তার জ্বরের প্রকৃত কারণ আর শনাক্ত করা হয় না।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু, হাম ও ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে আরএসভি ও অ্যাডিনোভাইরাসের সংক্রমণও দেখা যেতে পারে। সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ বেশি থাকে। এরপর তা কমে এলেও বছরের অন্যান্য সময়েও কিছু রোগী পাওয়া যায়।
পরীক্ষায় রোগ শনাক্ত হচ্ছে না কেন?
চিকিৎসকদের ভাষ্য, গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসজনিত জ্বরে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তবে সব ক্ষেত্রে জ্বরের নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. নেলসন তাপস মণ্ডল বলেন, বর্তমানে মূলত ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষা করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ কিংবা অন্যান্য ভাইরাসের পরীক্ষা তুলনামূলক কম হচ্ছে।
তিনি জানান, ডেঙ্গুর মতো উপসর্গ নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে এলেও পরীক্ষায় সবার ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে না। কারও রক্ত পরীক্ষায় রক্তকণিকার সংখ্যায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আবার অনেকের পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু রোগীর সুস্থ হতেও তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে।
এসব জ্বর নতুন কোনো ভাইরাসের কারণে হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানান তিনি। তার মতে, নতুন কোনো ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু সব রোগীর পক্ষে এ ধরনের পরীক্ষার খরচ বহন করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি সব ধরনের ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষার সুযোগও সব হাসপাতালে নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ মনে করেন, জ্বরের কারণ হিসেবে নতুন কোনো ভাইরাসের আশঙ্কা করার আগে পরিচিত রোগগুলোর সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বছরের এই সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সাধারণ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা যায়। এ ছাড়া টাইফয়েড, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন কারণেও জ্বর হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে জ্বরের পেছনে একাধিক ধরনের সংক্রমণ থাকতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিড-১৯-এর উপসর্গের মধ্যে বেশ মিল রয়েছে। তাই শুধু জ্বর, মাথাব্যথা কিংবা শরীরব্যথা দেখে নির্দিষ্ট কোনো রোগ শনাক্ত করা কঠিন।
এ ছাড়া ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেই যে ডেঙ্গু হয়নি, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারণ, কোন ধরনের পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং জ্বর শুরুর কত দিন পর পরীক্ষা করানো হচ্ছে, তার ওপরও ফলাফল নির্ভর করে।
এবার কি জ্বরের প্রকোপ বেশি?
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। তবে রোগীর সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে বাড়ছে, নাকি কমছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।
অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ঋতু পরিবর্তন, আবহাওয়ার ওঠানামা এবং ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন সংক্রমণের কারণে এ সময় জ্বরের প্রকোপ বাড়তে পারে। প্রায় প্রতিবছরই অক্টোবরের দিকে এমন প্রবণতা দেখা যায়।
তার মতে, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জার উপসর্গে অনেক মিল থাকায় শুধু শারীরিক লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় করা কঠিন। তাই জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
জ্বর হলে কী করবেন, কোন লক্ষণগুলো বিপজ্জনক?
চিকিৎসকদের পরামর্শ, জ্বর হলে ডেঙ্গুর সম্ভাবনা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হবে। কারণ, ডেঙ্গুতে সব সময় প্রচলিত লক্ষণ দেখা নাও যেতে পারে। বিশেষ করে কিছু উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তক্ষরণ, রক্তচাপ কমে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে পড়া ডেঙ্গুর বিপজ্জনক লক্ষণ হতে পারে। শিশু, বয়স্ক ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়ার পরও জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর নেমে গেলেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
জ্বরে আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং পানি ও অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ডেঙ্গুর আশঙ্কা থাকলে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

-6ae7074ddb08c.jpg)