ডেঙ্গু পরীক্ষায় নেগেটিভ, তবু জ্বর-শরীর ব্যথা! দায়ী হতে পারে যেসব সংক্রমণ
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম
ছবি: এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও অতিরিক্ত দুর্বলতা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। অনেকের শরীরে ডেঙ্গুর মতো উপসর্গ থাকলেও পরীক্ষায় মিলছে না ডেঙ্গুর প্রমাণ। আবার প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা করানোর পরও অনেক ক্ষেত্রে জ্বরের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যাচ্ছে না। ফলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, দেশে কি নতুন কোনো ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, নাকি পরিচিত ভাইরাসের সংক্রমণই এর জন্য দায়ী?
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য পরিচিত ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেই এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
পরীক্ষায় রোগ ধরা পড়ছে না কেন?
সম্প্রতি জ্বরে আক্রান্ত হওয়া এক তরুণ চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা এ পরিস্থিতির একটি উদাহরণ। টানা তিন থেকে চার দিন জ্বরে ভুগেছেন তিনি। শরীরের তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠেছিল। পাশাপাশি ছিল মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা এবং ক্লান্তি।
জ্বরের শুরুতেই ডেঙ্গু পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা করান তিনি। কিন্তু রিপোর্টে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি। বুকের এক্স-রেতেও অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি। শুধু সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন বা সিআরপির মাত্রা কিছুটা বেশি ছিল।
পরীক্ষায় নির্দিষ্ট কোনো রোগের প্রমাণ না মেলায় চিকিৎসকেরা এটিকে ভাইরাসজনিত জ্বর বলে ধারণা করেন। চিকিৎসা ও বিশ্রামের মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যে জ্বর কমে গেলেও পরবর্তী প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত দুর্বলতা ও অবসাদ অনুভব করেন ওই চিকিৎসক।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা এখন অনেকেরই হচ্ছে। ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষা নেগেটিভ আসার পরও জ্বরের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না রোগী ও চিকিৎসকেরা।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল এলেই যে রোগীর শরীরে কোনো সংক্রমণ নেই, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। অন্য কোনো ভাইরাসের কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গু ছাড়াও যেসব রোগে হতে পারে একই উপসর্গ
চিকিৎসকদের মতে, কয়েকটি সংক্রামক রোগের লক্ষণের মধ্যে যথেষ্ট মিল রয়েছে। এ কারণে শুধু জ্বর, মাথাব্যথা কিংবা শরীর ব্যথা দেখে নির্দিষ্ট রোগ চিহ্নিত করা কঠিন।
ডেঙ্গুতে সাধারণত হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ব্যথা, বমিভাব ও ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে চিকুনগুনিয়ায় জ্বরের পাশাপাশি অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা হতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জায় জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, কাশি, সর্দি ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা যায়।
এ ছাড়া কোভিড-১৯ এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেও কাছাকাছি ধরনের উপসর্গ হতে পারে।
এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. নেলসন তাপস মণ্ডল জানান, বর্তমানে জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু কোভিডসহ অন্যান্য ভাইরাসের পরীক্ষা নিয়মিতভাবে করা হচ্ছে না।
মৌসুমি পরিবর্তনেও বাড়তে পারে জ্বরের সংক্রমণ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ মনে করেন, জ্বরের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে শুরুতেই নতুন ভাইরাসের আশঙ্কা করা ঠিক হবে না।
তার মতে, আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন পরিচিত ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে পারে। এ ছাড়া টাইফয়েড, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণও জ্বরের কারণ হতে পারে।
জ্বরের কারণ নিশ্চিত না হলেও চিকিৎসকেরা ডেঙ্গুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন। কারণ, ডেঙ্গু আক্রান্ত সবার শরীরে প্রচলিত লক্ষণগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। অনেক সময় সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরবর্তী সময়ে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে।
বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও ডেঙ্গুর জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে গেলেই বিপদ কেটে গেছে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
চিকিৎসকদের মতে, কয়েকটি লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। যেমন—
• তীব্র পেটব্যথা বা পেটে অস্বস্তি।
• বারবার বমি হওয়া।
• নাক, মাড়ি বা শরীরের অন্য কোথাও রক্তক্ষরণ।
• হঠাৎ অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা নিস্তেজ হয়ে পড়া।
• অস্বাভাবিক অস্থিরতা বা আচরণের পরিবর্তন।
• রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং নাড়ির স্পন্দন দুর্বল হওয়া।
• প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়া।
চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, জ্বর হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং শরীরে পানিশূন্যতা যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পানি, খাবার স্যালাইন ও অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ করা যেতে পারে।
জ্বর ও শরীর ব্যথা কমানোর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়। তবে ডেঙ্গুর সম্ভাবনা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের দোকান থেকে ব্যথানাশক বা অ্যান্টিবায়োটিক কিনে সেবন করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
জ্বর দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানো জরুরি। ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও উপসর্গ অব্যাহত থাকলে কিংবা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পুনরায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।



-6ae4b9e05e4e9.jpg)