Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য

সমাজ, সংসার ও মানুষের প্রতি

Advertisement

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

সমাজ, সংসার ও মানুষের প্রতি

Advertisement

আমি আজ চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছি।

এই চার দিন আমার জীবনের অনেক হিসাব বদলে দিয়েছে।

সময় এখানে ধীরে চলে, কিন্তু ভাবনা দ্রুত।

নীরবতার ভেতর অনেক সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

হাসপাতালের এই সাদা দেয়াল আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।

শরীরের ব্যথা এক রকম, কিন্তু মনের ব্যথা অন্যরকম।

এই কয়েকদিনে বুঝলাম—মানুষ আসলে কতটা একা।

চারপাশে মানুষ আছে, তবুও ভেতরে একটা শূন্যতা থাকে।

আমি এখানে শুয়ে আছি, আর বাইরে পৃথিবী তার মতো চলছে।

রাস্তা ভরা যানবাহন, অফিসের ব্যস্ততা, মানুষের দৌড়ঝাঁপ—সব আগের মতোই।

কেউ থেমে নেই, কিছু থেমে নেই।

আমার এই থেমে থাকা যেন কারও কাছে কোনো খবরই নয়।

সংসারও থেমে নেই।

যে সংসারের জন্য এত দৌড়েছি, এত হিসাব কষেছি,

সেই সংসার আজ নিজ গতিতেই চলছে।

খাওয়া হচ্ছে, কাজ হচ্ছে, হাসি-আড্ডাও হচ্ছে।

আমি না থাকলেও হয়তো এই ধারাবাহিকতা থামবে না।

আমার অনুপস্থিতি হয়তো কিছুক্ষণ অনুভূত হবে,

তারপর ধীরে ধীরে সেটাও অভ্যাসে পরিণত হবে।

মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়—এটাই বাস্তবতা।

সমাজও একইভাবে নির্লিপ্ত।

কারো অসুখ, কারো কষ্ট—সবই কিছু সময়ের জন্য আলোচনার বিষয়।

তারপর নতুন কোনো ঘটনা এসে পুরোনো সব ঢেকে দেয়।

এটাই সমাজের নিয়ম, এটাই মানুষের স্বভাব।

আমি এখানে শুয়ে শুয়ে ভাবি—

আমার এত দৌড়ঝাঁপ, এত চিন্তা, এত লড়াই—কিসের জন্য ছিল?

যাদের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি,

তারা কি সত্যিই আমাকে অনুভব করে?

হয়তো করে, কিন্তু সেই অনুভবও ক্ষণস্থায়ী।

জীবন কাউকে থামতে দেয় না।

প্রতিটি মানুষ নিজের লড়াই নিয়ে ব্যস্ত।

অন্যের কষ্ট দেখার সময় কারও নেই।

এই চার দিনে আমি বুঝেছি—

আমি নিজেই নিজেকে সবচেয়ে কম সময় দিয়েছি।

নিজের শরীরের কথা শুনিনি,

নিজের ক্লান্তিকে গুরুত্ব দিইনি।

আজ শরীর থেমে গেছে, তাই মন কথা বলছে।

এই থেমে যাওয়া আমাকে শিখিয়েছে—

মানুষ যত বড়ই হোক, যত গুরুত্বপূর্ণই ভাবুক নিজেকে,

পৃথিবীর কাছে সে খুবই ছোট।

আমি যদি আজ মারা যাই,

কিছু সময়ের জন্য হয়তো একটা শূন্যতা তৈরি হবে।

কিছু চোখে জল আসবে, কিছু স্মৃতি জেগে উঠবে।

কিন্তু তারপর সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে।

এটা শুনতে কষ্টকর, কিন্তু খুব স্বাভাবিক।

জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না।

এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

এটাই সময়ের নির্মম সত্য।

আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না।

কারো কাছে কোনো অভিযোগ নেই।

কারণ আমিও হয়তো অন্য কারো কষ্টের সময় একইভাবে ব্যস্ত ছিলাম।

আমি-ই বা কতটা থেমেছিলাম অন্যের জন্য?

এই প্রশ্নগুলো আজ আমাকে কাঁদায়।

কিন্তু এই কান্না অভিযোগের নয়।

এটা উপলব্ধির কান্না।

নিজেকে নতুন করে দেখার কান্না।

সংসার, তুমি তোমার মতো চল।

সমাজ, তুমি তোমার নিয়মে থাকো।

মানুষ, তুমি তোমার ব্যস্ততায় ডুবে থাকো।

আমি এখন নিজের ভেতরে একটু থামতে চাই।

আমি চাই, এই থেমে যাওয়া থেকে কিছু শিখতে।

নিজেকে একটু বেশি ভালোবাসতে।

নিজের শরীর ও মনের প্রতি একটু বেশি যত্নবান হতে।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ একাই।

আমি জানি, আমি সুস্থ হয়ে ফিরলে

আবার এই দৌড়ঝাঁপের জীবনে ফিরে যাব।

আবার ব্যস্ততা আমাকে গ্রাস করবে।

আবার আমি ভুলে যাব এই হাসপাতালের দিনগুলো।

তবুও এই চার দিন আমার ভেতরে একটা দাগ রেখে যাবে।

একটা নীরব শিক্ষা হয়ে থাকবে।

যা মাঝে মাঝে আমাকে থামতে বলবে।

নিজের দিকে তাকাতে বলবে।

আমি চাই, তোমরাও একটু থামো।

নিজের মানুষগুলোর দিকে তাকাও।

তাদের সাথে সময় কাটাও।

কারণ সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

যে মানুষটা আজ পাশে আছে,

সে হয়তো কাল থাকবে না।

যে কথা আজ বলা যায়,

তা হয়তো কাল আর বলা যাবে না।

আমি এখানে শুয়ে এই কথাগুলো ভাবছি।

এগুলো খুব সাধারণ কথা।

কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা এগুলো ভুলে যাই।

আমরা ভাবি—সময় আছে, সুযোগ আছে।

কিন্তু সত্যি হলো—

সময় কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করে না।

সুযোগও চিরকাল থাকে না।

সবকিছুই একসময় শেষ হয়ে যায়।

এই চার দিনে আমি জীবনের এই সাধারণ সত্যগুলো নতুন করে বুঝেছি।

এগুলো কোনো বইয়ের কথা নয়।

এগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা।

ব্যথার ভেতর থেকে উঠে আসা উপলব্ধি।

আমি জানি, আমার এই কথাগুলো হয়তো

কারো জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না।

কিন্তু যদি একজন মানুষও একটু থামে,

একটু ভাবতে শেখে—তবেই আমার এই লেখা সার্থক।

আমি বাঁচতে চাই।

আমি আবার সুস্থ হয়ে ফিরতে চাই।

কিন্তু সেই ফেরা যেন আগের মতো না হয়।

সেই ফেরা যেন নতুন এক উপলব্ধির সাথে হয়।

যেখানে আমি মানুষকে আরও বুঝব।

নিজেকে আরও মূল্য দেব।

এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে

আরও গভীরভাবে অনুভব করব।

শেষে শুধু এটুকুই বলি—

আমি চার দিন ধরে হাসপাতালে আছি।

কিছুই থেমে নেই, সব চলছে।

এটাই স্বাভাবিক, এটাই বাস্তব।

এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই

আমি আবার নতুন করে বাঁচতে চাই।

লেখক: অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

১০ কবি-লেখক পাচ্ছেন এসবিএসপি সাহিত্য পুরস্কার

১০ কবি-লেখক পাচ্ছেন এসবিএসপি সাহিত্য পুরস্কার

কবি ফররুখ আহমদ সবার আদর্শিক বাতিঘর

কবি ফররুখ আহমদ সবার আদর্শিক বাতিঘর

অবশেষে সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন মোহন রায়হান

অবশেষে সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন মোহন রায়হান

এবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছেন যারা

এবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছেন যারা

‘খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরষ্কার’ পেলেন আব্দুল হাই শিকদার

‘খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরষ্কার’ পেলেন আব্দুল হাই শিকদার

শিশুসাহিত্যে ‘পাপড়ি-করামত আলী সাহিত্য পুরস্কার’ পাচ্ছেন জুলফিকার শাহাদাৎ

শিশুসাহিত্যে ‘পাপড়ি-করামত আলী সাহিত্য পুরস্কার’ পাচ্ছেন জুলফিকার শাহাদাৎ

আরও পড়ুন

সৃজন পাঠচক্রে ‘সাড়া দাও প্রাচীন পাথর’ ও ‘বৈষম্যের ধারণা’

সৃজন পাঠচক্রে ‘সাড়া দাও প্রাচীন পাথর’ ও ‘বৈষম্যের ধারণা’

সহস্র বছরের দূরত্ব

সহস্র বছরের দূরত্ব

ছন্দে ছন্দে গণহত্যার ইতিহাস

ছন্দে ছন্দে গণহত্যার ইতিহাস

ঐতিহ্য প্রকাশ করবে কবি ও সম্পাদক ‘আবদুল হাই শিকদার-রচনাবলী’

ঐতিহ্য প্রকাশ করবে কবি ও সম্পাদক ‘আবদুল হাই শিকদার-রচনাবলী’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম