আরব-ইসরাইলি কারা, কেন গুরুত্বপূর্ণ তারা?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন এক আরব-ইসরাইলি নারী। ছবি: গেটি ইমেজেস
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলের ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে আরব রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলার পর দেশটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে দেখা গেছে, ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে ফিলিস্তিনপন্থি দলগুলো সর্বোচ্চ ১৯টি আসন পেতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট কিংবা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট—কোনোটিই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবে বলে বুথফেরত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ফলে নতুন সরকার গঠনের আলোচনায় আরব দলগুলোর সংসদ সদস্যদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে ইসরাইলের আরব দলগুলো কোনো একক রাজনৈতিক শক্তি নয়। বৈষম্য, অপরাধ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ নিয়ে তাদের মধ্যে অভিন্ন উদ্বেগ থাকলেও আদর্শ ও ইহুদিপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে তাদের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে।
ইসরাইলের আরব দলগুলো কারা?
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তারা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে এবং নেসেটে প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেন। তবে আবাসন, সরকারি পরিষেবা ও স্থানীয় সরকারে অর্থ বরাদ্দের মতো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে আরবদের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি দুটি হলো মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম এবং হাদাশ, তা’আল ও বালাদকে নিয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে দল দুটি ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করছে।
রা’আম: মানসুর আব্বাসের বাস্তববাদী কৌশল
রা‘আমের পূর্ণ নাম ইউনাইটেড আরব লিস্ট। মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন দলটি ইসলামপন্থি ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি আরব জনগোষ্ঠীর উন্নত সরকারি পরিষেবা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সামষ্টিক অধিকারের স্বীকৃতির পক্ষে।
দলটির অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে সংগঠিত অপরাধ দমন, আবাসন ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো এবং আরব অধ্যুষিত স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য বেশি অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দলটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, দখলদারত্বের অবসান এবং ইসরায়েলি বসতি ভেঙে দেওয়ার পক্ষে।
মানসুর আব্বাসের রাজনৈতিক কৌশল হলো, সরকার থেকে বাইরে না থেকে আলোচনার মাধ্যমে আরব জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তব সুবিধা আদায় করা। ২০২১ সালে রা’আম ইসরাইলের প্রথম স্বতন্ত্র আরব দল হিসেবে সরকার গঠনের জোটে যোগ দেয়। সে সময় দলটি নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন করেছিল।
এবারের নির্বাচনেও দলটি নিজেকে সম্ভাব্য আলোচনাসঙ্গী হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের প্রার্থী তালিকায় ইসরাইলের সাবেক উপ-জননিরাপত্তামন্ত্রী ইয়োয়াভ সেগালোভিৎসও রয়েছেন। তিনি একজন ইহুদি রাজনীতিক এবং আগে মধ্যপন্থি ইয়েশ আতিদ দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জয়েন্ট লিস্ট: হাদাশ, তা’আল ও বালাদ
জয়েন্ট লিস্ট তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ঐতিহ্যের দলকে একত্র করেছে।
হাদাশ: ইহুদি-আরব বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত দলটি সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিকদের অধিকার এবং ইহুদি ও আরব নাগরিকদের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেয়। ওফের কাসিফ দলটির উল্লেখযোগ্য নেতা।
তা’আল: আহমদ তিবির প্রতিষ্ঠিত দলটি ফিলিস্তিনি জাতীয় অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি ইসরাইলের সংসদীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে। আহমদ তিবি দেশটির পরিচিত আরব সংসদ সদস্যদের একজন।
বালাদ: সামি আবু শাহাদেহর নেতৃত্বাধীন দলটি আরব জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক আদর্শ ধারণ করে। দলটি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে ইসরায়েল কেবল ইহুদি জাতীয় পরিচয়কে প্রাধান্য না দিয়ে সব নাগরিকের রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হবে। অক্টোবরে আবু শাহাদেহ জয়েন্ট লিস্টের প্রার্থী তালিকা থেকে সরে দাঁড়ালেও বালাদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইউসুফ জাবারিন ও আহমদ তিবি জয়েন্ট লিস্টের নির্বাচনী তালিকার নেতৃত্বে রয়েছেন। জোটটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, দখলদারত্বের বিরোধিতা, নাগরিক সমতা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের সুরক্ষা জোরদারের পক্ষে।
নির্বাচনে কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে আরব দলগুলো?
আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট কয়েকটি অভিন্ন বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে।
অপরাধ ও বৈষম্য: আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সহিংস অপরাধ ও সংগঠিত অপরাধচক্রের প্রভাব একটি বড় উদ্বেগ। অপরাধ দমনে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সরকারি পরিষেবার উন্নয়ন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য বেশি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে দলগুলো। আবাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব: জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরব নাগরিকদের প্রভাব বাড়াতে চায় উভয় পক্ষ। বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত নীতিরও বিরোধিতা করে তারা। তবে মানসুর আব্বাস যেখানে সরকারি অর্থ বরাদ্দ ও নীতিগত ছাড় আদায়ে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেন, সেখানে জয়েন্ট লিস্ট নাগরিক সমতা ও ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকারের ওপর বেশি জোর দেয়।
ফিলিস্তিন প্রশ্ন: উভয় রাজনৈতিক শক্তিই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং দখলদারত্বের বিরোধী। তবে তাদের আদর্শগত অবস্থান ও ইসরাইলের সরকার গঠনের জোটে অংশগ্রহণের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। গাজা যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ ইসরাইলের মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে আরব ভোটারদের দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে।
ইসরাইলে কে সরকার গঠন করবে, আরব দলগুলো কি নির্ধারণ করব?
নির্বাচনের বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে বিরোধী জোটের সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব সংসদ সদস্যদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের মতো আসন পাওয়া আর সরকারে যোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। নেতানিয়াহু আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। বিরোধী শিবিরেরও কয়েকজন নেতা তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনে আপত্তি জানিয়েছেন।
ফলে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট সরকার গঠন করতে চাইলে আরব প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে কি না, কিংবা তাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত না করেই সমর্থন চাইবে কি না—সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
রা’আমের আগের সরকারে অংশগ্রহণ একটি সম্ভাব্য পথ দেখিয়েছে। দলটি সরকারি অর্থ বরাদ্দ ও জনসেবার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে জোটকে সমর্থন দিতে পারে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও দখলদারত্বের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থানের সঙ্গে আপসের আশঙ্কায় জয়েন্ট লিস্টের দলগুলো ঐতিহাসিকভাবে সরকারে সরাসরি যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক।
এখন পর্যন্ত বুথফেরত জরিপে আরব দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ার সম্ভাবনা দেখা গেলেও সরকার গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি। চূড়ান্ত আসনসংখ্যা, ছোট দলগুলোর অবস্থান এবং ইহুদিপ্রধান বিরোধী দলগুলো আরব নেতাদের সঙ্গে সমঝোতায় কতটা আগ্রহী—এসবের ওপর নির্ভর করবে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পার্লামেন্টে আরব প্রতিনিধিদের সংখ্যা বাড়লে তা আরব নাগরিকদের জীবনযাত্রা ও অধিকারসংক্রান্ত নীতিতে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে কি না এবং ইসরাইলের পরবর্তী সরকার গঠনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে। সূত্র: দ্য প্রিন্ট


