ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে নির্মাণযজ্ঞ, স্যাটেলাইট চিত্রে নতুন তৎপরতা
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানের অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির আশপাশে বড় ধরনের নির্মাণকাজ চলছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কয়েক মাসের বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক ঘাঁটিগুলোও মেরামত করছে তেহরান। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পেয়েছে বিবিসি ভেরিফাই।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মাইয়ারের বিশ্লেষকরা বিবিসি ভেরিফাইকে জানিয়েছেন, নভেম্বরে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে তেহরানের কাছে কারাজের গার্মদারেহ সামরিক ঘাঁটি এবং উত্তরাঞ্চলের শাহরুদ ঘাঁটিতে মাটি খনন ও নতুন ভবন নির্মাণের চিহ্ন দেখা গেছে।
এ ছাড়া ইরানের আরও অন্তত ১২টি সামরিক স্থাপনায় মেরামতের আলামত পাওয়া গেছে। এসব স্থাপনার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র কমপ্লেক্স ও বিমানঘাঁটিও রয়েছে।
পশ্চিম ইরানে ইরাক সীমান্তের কাছে কেরমানশাহ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ধ্বংস হওয়া ভবনগুলোতে নতুন ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানী তেহরানের পূর্বে পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একাধিকবার বিমান হামলার শিকার হওয়ার পরও স্থাপনাটিতে ধারাবাহিকভাবে মেরামতকাজ চালানো হচ্ছে।
সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক জিম ল্যামসনের মতে, শাহরুদ ঘাঁটির কাছে খননকাজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাছের বিমানঘাঁটিটি একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। এ কারণে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) উৎপাদনকেন্দ্রগুলো ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাইয়ারের এক বিশ্লেষক বলেন, ‘আরও হামলা থেকে অবকাঠামো রক্ষায় সেগুলো ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার একটি প্রবণতা ইরানের মধ্যে দেখা যায়।’
আয়ারল্যান্ডের সাবেক সামরিক প্রধান ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মার্ক মেলেট বলেন, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা নির্মাণের আরেকটি সুবিধা হলো, এর ফলে বাইরের পর্যবেক্ষকদের পক্ষে স্থাপনাগুলোর পরিধি ও কার্যক্রমের অবস্থা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও হামলা চালাতে পারে ওয়াশিংটন—এমন জল্পনা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বেড়েছে। তবে বুধবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধের অজনপ্রিয়তা এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের খারাপ ফলের অন্যতম কারণ হতে পারে। এমনকি এর কারণে আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশটির বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি বাহিনী মূলত বিমান হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো ছোট পরিসরে মেরামতের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের তালেঘান-২ স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ একটি বাংকারে হামলার পর সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করে সেটি কংক্রিট দিয়ে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
কারাজ ও শাহরুদ ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্রেও ব্যাপক খননকাজের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কারাজে একাধিক নির্মাণযান দেখা গেছে। একই সঙ্গে কাছের বিমানঘাঁটিতেও উন্নয়নকাজ চালানোর চিহ্ন রয়েছে।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এফপিআরআই) গবেষণা বিশ্লেষক স্যাম লেয়ার বলেন, কারাজের ছবিতে একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনার নতুন প্রবেশপথ তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে।
তবে গোয়েন্দা সংস্থা জেনসের বিশ্লেষক শন ও’কনরের মতে, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এসব নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে, এমন সম্ভাবনা কম। তার ভাষায়, এ ধরনের প্রকল্প ব্যয়বহুল হতে পারে এবং এতে তেমন সুফল নাও মিলতে পারে।
এর আগে হোয়াইট হাউস বারবার দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সামরিক অবস্থাকে ‘সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
পেন্টাগনের এক মুখপাত্র এর আগে দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌযান তৈরির শিল্পভিত্তির ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস করেছে। একই সঙ্গে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে ইরানের দাবি, তাদের হাতে এখনো বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। চলতি সপ্তাহে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দক্ষিণ ইরানের একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনার প্রবেশপথে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়।
এর আগে গত আগস্টে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর আব্বাস শহরের কাছে একটি সুড়ঙ্গ থেকে খোরদাদ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র বেরিয়ে আসতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছিল।
এদিকে পবিত্র শহর কোমের বাইরে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের কাছে নতুন নির্মাণকাজ ও খননের চিহ্ন শনাক্ত করেছেন মাইয়ারের এক বিশ্লেষক। ওই এলাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের একাধিকবার বোমা হামলার শিকার হওয়া ফোরদো ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার কাছাকাছি।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সামরিক বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, সামরিক স্থাপনাগুলোতে এ ধরনের তৎপরতা থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য নতুন হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান।
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে হামলা থেকে নিজেদের আরও ভালোভাবে রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দেয়, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেয়ে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে ইরান।’ সূত্র: বিবিসি


