Logo
Logo
×

Advertisement

জাতীয়

ঢাকার কাছাকাছি একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল, কী বার্তা দিচ্ছে?

Advertisement

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৩:১০ পিএম

ঢাকার কাছাকাছি একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল, কী বার্তা দিচ্ছে?

Advertisement

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানীর খুব কাছাকাছি, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সর্বশেষ ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় সোমবার (২২ জুন) রাত আটটা ২৮ মিনিটে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল চার দশমিক চার এবং উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে।

এর আগে চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিন দশমিক দুই মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। গত ২২ জুনের পর এটিই হলো এ বছর ঢাকার সবচেয়ে নিকটবর্তী উৎপত্তিস্থলের ভূমিকম্প হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি হয়েছিল গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে, নরসিংদীতে।

পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার ওই ভূমিকম্পকে গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া অন্যতম শক্তিশালী কম্পন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নরসিংদী এলাকায় আরও তিনটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল।

যদিও এসব ভূমিকম্পের বেশিরভাগই মাঝারি বা অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার, তবুও বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে আরেকটি বিষয়, আর তা হলো উৎপত্তিস্থলগুলোর অবস্থান।

এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, ঢাকার কাছাকাছি একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল আসলে কী বার্তা দিচ্ছে? এগুলো কি কেবল স্বাভাবিক টেকটোনিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দিচ্ছে?

উৎপত্তিস্থল ঘুরেফিরে ঢাকার আশপাশেই

গত ২২ জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়েছে, সেটির মাত্রা ছিল চার দশমিক চার মাত্রার এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। আর ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে ছিল এর উৎপত্তিস্থল। এমন তথ্যই দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা ইউএসজিএস।

এ নিয়ে ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলোজিতে বলা হয়েছে, চার মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৬ কিলোমিটার গভীরে ছিল এর উৎপত্তিস্থল।

কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল চার এবং উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পূর্বে।

উৎপত্তিস্থল সংক্রান্ত এই পার্থক্য নিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর বলেন, নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গেলে সেটা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকার মাঝেই পড়ে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও এর সীমান্তবর্তী এলাকায় যতগুলো ভূমিকম্প হয়েছে, এর মাঝে বেশ কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছাকাছি। এর মধ্যে চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিন দশমিক দুই মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ৪২ কিলোমিটার। এর আগে, ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর রিখটার স্কেলে পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে হওয়া ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ-পশ্চিমে মাধবদী এলাকায়, ভূ-পৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।

ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল মাত্র ১৩ কিলোমিটার, যা গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি।

ওই ভূমিকম্পে ঢাকায় চারজন, নরসিংদীতে পাঁচ জন এবং নারায়ণগঞ্জে একজন নিহত হন বলে জানিয়েছিলো তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এতে সাড়ে চার শতাধিক মানুষ আহত হন, যার মধ্যে শুধু গাজীপুরেই আহত হন ২৫২ জন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরও তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। মোট চারটি ভূমিকম্পের মধ্যে তিনটিরই উৎপত্তিস্থলই ছিল নরসিংদী জেলার দু’টি উপজেলা এবং একটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকারই বাড্ডা এলাকায়। মাধবদীর ভূমিকম্পের পরদিন, ২২ নভেম্বর নরসিংদীর পলাশে তিন দশমিক তিন মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, ঢাকা থেকে সেই কেন্দ্রের দূরত্ব ছিল ২৯ কিলোমিটার।

একই দিনে ঢাকার বাড্ডায় তিন দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্প উৎপত্তি হয় এবং পরে নরসিংদীতে চার দশমিক তিন মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়।

শেষেরটির কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে। এর কয়েকদিন পর, ২৭ নভেম্বর নরসিংদীর ঘোড়াশালে তিন দশমিক ছয় মাত্রার একটি ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়, যার কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে।

এরপর এক সপ্তাহের মাথায় ৪ ঠা ডিসেম্বর নরসিংদীর শিবপুরে চার দশমিক এক মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, ঢাকা থেকে যার কেন্দ্র ছিল ৩৮ কিলোমিটার দূরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, সাম্প্রতিক এসব ভূমিকম্প টেকটোনিক কার্যকলাপের কারণে হতে পারে, আবার কোনো সক্রিয় ফল্টের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। তার ভাষায়, ‘অনেক সময় নতুন ফল্ট সৃষ্টি হয়, আবার দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো পুরোনো ফল্টও পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।’

বাংলাদেশের অবস্থান ইউরেশিয়ান ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগ স্থলের মাঝামাঝি। অন্যদিকে আছে বার্মিজ প্লেট। এই তিন প্লেটের সংযোগের কারণে এখানে বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে, বলছিলেন ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর।

এগুলো কি ঢাকায় বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, সম্প্রতি ঢাকার কাছাকাছি যেসব ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে, সেগুলো থেকে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই। তবে এসব ভূমিকম্প মানুষকে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ঐতিহাসিকভাবে সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম ফল্টগুলো।

তার মতে, ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ঢাকার কাছাকাছি শ্রীমঙ্গল ও বগুড়ার শেরপুর এলাকায়। কারণ ইতিহাসে এসব অঞ্চলে সাতের বেশি মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে।

১৯১৮ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সাত দশমিক ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল এবং বগুড়ার শেরপুর এলাকায় সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিলো ১৮৮৫ সালে। তিনি বলেন, এগুলো ঢাকা থেকে দেড়শো থেকে দু’শো কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মাঝে আছে। বাকি বড় ভূমিকম্পগুলো ঢাকা থেকে আরও দূরে দূরে হয়েছিলো।

তবে ঢাকার জন্য কোনো উদ্বেগের বিষয় আছে কিনা, সে সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রত্যেকটি ভূমিকম্পের রিটার্ন পিরিয়ড (পুনরাবৃত্তির সময় বা চক্র) আছে।

‘ঢাকা থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বড় ভূমিকম্প হয়েছিলো। কিন্তু ওটার রিটার্ন পিরিয়ড বড় হবে। ওটা আমাদের হিসাবে প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর। সেটা হয়তো ২২৫০ সালের আশেপাশে হবে। সাত মাত্রারগুলয় দেড়শো-দুইশো বছরের মাঝে হবে।’

‘সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়তো আরও কখনও হয়েছে, কিন্তু আমাদের কাছে তথ্য নাই। সেজন্যই আমরা বলি যে সাত মাত্রার একটি ভূ্মিকম্প ঢাকায় শিগগিরই আসার সম্ভাবনা। এখন এটা কবে আসবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ২০ বছরও লেগে যেতে পারে’

আরও পড়ুন
ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশ

সাম্প্রতিক সময়ে নরসিংদীতে যেভাবে একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে, হতে পারে এটি বড় কোনো ভূমিকম্পের ইঙ্গিত। কিন্তু যেসব তথ্য-উপাত্ত আছে, তাতে ঐতিহাসিকভাবে নরসিংদীতে বড় কোনো ভূমিকম্প কখনও হয়নি, জানান অধ্যাপক আনসারী।

‘তাই, নরসিংদী বা ঢাকার আশেপাশের ভূমিকম্পের হিসেবে ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ না, কিন্তু ওই অতীতের ওই বড় ভূমিকম্পগুলোর বিচারে ঢাকা খুবই ঝুঁকিতে আছে। বড় কোনো ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশের কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।’

ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীরও বলেন, ঢাকাকেন্দ্রিক বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস নেই। কিন্তু সীমান্তে বড় ভূমিকম্প আছে। আর আমার অভিজ্ঞতা বলছে, গত বছর দুয়েক ধরে আমাদের এই অঞ্চলে ভূমিকম্পপ্রবণতা একটু বেশি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

পানামায় ফের শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত

পানামায় ফের শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত

ধ্বংসস্তূপ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার, মোদির উত্থানের নেপথ্যে যে ভূমিকম্প

ধ্বংসস্তূপ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার, মোদির উত্থানের নেপথ্যে যে ভূমিকম্প

ভূমিকম্পে কাঁপল ভারত

ভূমিকম্পে কাঁপল ভারত

৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল পানামা, ভয়াবহ ক্ষতির শঙ্কা

৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল পানামা, ভয়াবহ ক্ষতির শঙ্কা

ভারতে ভূমিকম্পের পর ‘হাসি-তামাশায়’ মেতে উঠলেন নেটিজেনরা!

ভারতে ভূমিকম্পের পর ‘হাসি-তামাশায়’ মেতে উঠলেন নেটিজেনরা!

ভারতের উত্তরাখণ্ডে ভূমিকম্প, কেঁপে উঠল দিল্লিও

ভারতের উত্তরাখণ্ডে ভূমিকম্প, কেঁপে উঠল দিল্লিও

আরও পড়ুন

আজ ঢাকার আবহাওয়া কেমন থাকবে

আজ ঢাকার আবহাওয়া কেমন থাকবে

চকবাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে

চকবাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে

নতুন লঘুচাপের আভাস, ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস

নতুন লঘুচাপের আভাস, ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস

ঢাকার বাতাস আজ ‘অস্বাস্থ্যকর’

ঢাকার বাতাস আজ ‘অস্বাস্থ্যকর’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম