অভিভাবক ছাড়া বিদেশযাত্রা: প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে বিমানবন্দরে আটকানোর আইন আছে কি?
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম
ছবি: এআই জেনারেটেড
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী একা বিদেশ ভ্রমণ করতে চাইলে তার স্বামী বা পরিবারের অনুমতি নেওয়া কি বাধ্যতামূলক? সঙ্গে কোনো অভিভাবক না থাকলে বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমান টিকিট থাকার পরও কি বিমানবন্দর থেকে তাকে আটকে দেওয়া যায়? সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে নতুন করে সামনে এসেছে এসব প্রশ্ন।
গত ৮ আগস্ট নেপালে একটি সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। তাদের সবার কাছেই ছিল বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমান টিকিট। তবে ঢাকার বিমানবন্দরে তাদের বিদেশযাত্রা আটকে দেন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা।
অভিযোগ রয়েছে, এ সময় ওই নারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয় তারা অবিবাহিত কিনা, তাদের বিদেশযাত্রার বিষয়টি পরিবারের সদস্যরা জানেন কিনা এবং কোনো অভিভাবক ছাড়া তারা কেন বিদেশে যাচ্ছেন।
পরে আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন ওই তিন নারী। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেছেন। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও তাদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ কিংবা লিঙ্গের ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বিদেশযাত্রায় বাধা না দেওয়ার নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, সেটিও জানতে চেয়েছেন আদালত।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতার পাশাপাশি দেশ ত্যাগ ও দেশে ফিরে আসার অধিকার স্বীকৃত। তবে জনস্বার্থে আইনের মাধ্যমে এই অধিকারে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। এ ছাড়া সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
পাসপোর্টের ক্ষেত্রে মূল আইন বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩। সেখানে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী অবিবাহিত—এটি বিদেশযাত্রা বন্ধের কারণ হিসেবে উল্লেখ নেই। স্বামী বা অভিভাবকের সঙ্গে ভ্রমণ করাও বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে বলা হয়নি। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিদেশযাত্রা বন্ধ করা যেতে পারে। যেমন—আদালতের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, গুরুতর অপরাধসংক্রান্ত আইনগত বাধা কিংবা দেশের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের বিষয় থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে শুধু তিনি অবিবাহিত, একা বা অভিভাবক ছাড়া বিদেশ যাচ্ছেন—এই কারণে তার বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কোনো সাধারণ আইনগত সুযোগ নেই। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে বাংলাদেশ ত্যাগ ও পুনরায় প্রবেশের মৌলিক অধিকার দিয়েছে এবং এ অধিকারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে হলে তা অবশ্যই আইন দ্বারা আরোপিত ও জনস্বার্থে যুক্তিসঙ্গত হতে হবে; কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ধারণা বা প্রশাসনিক বিবেচনা দিয়ে নতুন শর্ত তৈরি করা যায় না। বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ভিসা/অনুমতি ও টিকিট থাকা অবস্থায় কেবল নারী হওয়া, অবিবাহিত হওয়া বা সঙ্গে অভিভাবক না থাকার কারণে যাত্রা বন্ধ করা তাই সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার গুরুতর প্রশ্ন তোলে। এর আগে আরেকটি মামলাতেও বিদেশযাত্রার অধিকারে আইনগত ভিত্তি ছাড়া নির্বাহী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নেপালগামী তিন নারীর ঘটনায় হাইকোর্ট ইতোমধ্যে তাদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন।’
কোনো সুনির্দিষ্ট আইনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে শুধু অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণের কারণে আটকানো বা তার যাত্রা প্রতিহত করা যাবে—এমন আইনগত ভিত্তি নেই। এ ধরনের বাধা সংবিধানস্বীকৃত চলাচলের স্বাধীনতার ওপর বেআইনি হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অর্থাৎ শুধু অবিবাহিত হওয়া কিংবা সঙ্গে অভিভাবক না থাকার কারণে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিদেশযাত্রা বন্ধ করা যায় কিনা—সাম্প্রতিক রিটের পর এই প্রশ্নের চূড়ান্ত ব্যাখ্যার জন্য এখন আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।

