মাদক নিয়ে ধরা পড়ছেন চুনোপুঁটিরা, গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম
ছবি- এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চোখেমুখে আতঙ্ক আর পকেটে ইয়াবার পুঁটলি নিয়ে ধরা পড়া খুচরা বাহকরা জেলহাজতে ধুঁকছেন। অথচ নেপথ্যের ‘মহারাজারা’ বহাল তবিয়তে সুদৃশ্য ড্রয়িংরুমে বসে নিয়ন্ত্রণ করছেন বিশাল মাদক সাম্রাজ্য। মাদকের করাল গ্রাসে সমাজ বিপর্যস্ত হলেও মূল হোতা বা গডফাদাররা অতীতে যেমন ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে, এখনো তেমনই আছেন।
ভবিষ্যতেও পরিবর্তনের খুব একটা লক্ষণ নেই। তাই প্রশ্ন উঠেছে-গডফাদাররা কেন আইনের আওতায় আসছেন না? অপরদিকে মাদক নির্মূলের মূল দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের মাদক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্র জানায়, ১ অক্টোবর চোরাচালান নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে প্রভাবশালী দুই পক্ষের (আজাহার মেম্বার ও পটল গ্রুপ) মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে দেশীয় অস্ত্র (সড়কি) পেটে বিদ্ধ হয়ে টেঙ্গুর আলী নামের এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ২৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর রাজপাড়ায় মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় আব্দুল বারী (২৫) নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার একদিন পর ২৯ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এক যুবককে কুপিয়ে ও পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার স্কুলছাত্র ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম বাসা থেকে নিখোঁজ হয়। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। বহুল আলোচিত অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্তে মূল কারণ হিসাবে স্থানীয় একটি ক্ষুব্ধ মাদক সিন্ডিকেটের ইন্ধনের বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে।
ভিকটিমের পরিবারের দাবি, নিহতের মা (একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সাবেক প্রক্টর) এর আগে এলাকায় মাদকবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় ক্ষোভ থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এছাড়া ২১ আগস্ট রংপুরে একই পরিবারের চারজনরকে হত্যার নেপথ্যেও উঠে এসেছে মাদক সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, ‘সারা দেশে মাদকের গডফাদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবতার কারণেই ওই তালিকা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। আবার শিগ্গিরই তারা ধরা পড়বেন বলেও মনে হচ্ছে না। কারণ, গডফাদাররা খুবই চতুর এবং প্রভাবশালী। তাদের নামে মামলা নেই। তারা মাদক বহনও করেন না। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মাদকের গডফাদারদের আমরা ধরতে পারছি না। তবে তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয় করেছি। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলেই তাদের গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন কাজ। এ কারণে নেপথ্যের মহারাজার সুসজ্জিত অভ্যর্থনা কক্ষে বসে সুদূরপ্রসারী মাদকসাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করার দৃশ্য আজ দেশের নির্মম বাস্তবতা।’
তবে ৩০ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সংক্রান্ত এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা আমাদের হাতে আছে। তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। এই অভিযান আরও তীব্র করা হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, খুন, অপহরণ, ধর্ষণসহ সব অপরাধের মূলে মাদক। তাই মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদকবিরোধী নিয়মিত অভিযানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাদকসহ খুচরা বিক্রেতা গ্রেফতার হলেও আন্তর্জাতিক বা পাইকারি আমদানিকারক, অর্থদাতা এবং মূল কারবারিদের টিকিও স্পর্শ করা যাচ্ছে না। কারণ, গডফাদাররা কখনো সরাসরি মাদক বহন বা সংরক্ষণ করেন না। তারা নেপথ্যে থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখেন। ফলে মাঠপর্যায়ে যত বড় অভিযানই হোক না কেন, চক্রের মাথাগুলো অক্ষতই থাকে। তাই মাদক ব্যবসা শুধু খোলস পালটায়, বন্ধ হয় না।
জানা যায়, ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের মাদক ধ্বংসের দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল মো. রেজাউল করিমকে (৪৫) এক হাজার ৭৯০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। রাজধানীর সূত্রাপুর থানা এলাকায় মাদক বিক্রির সময় তাকে আটক করা হয়। আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা মাদক ধ্বংসের দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্য নিজেই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। রেজাউল করিমকে গ্রেফতারের আগে মাদক কারবারে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ২৪ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পল্লবী থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. শফিকুল ইসলামসহ দুইজনকে ৫ হাজার ৩১০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনা পুরো পুলিশ বিভাগে বড় ধরনের নাড়া দেয়। এছাড়া মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে প্রায়ই হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। এতেই বোঝা যায় মাদকের নেটওয়ার্কটি কতটা গভীরে বিস্তৃত।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স। এ বিষয়ে আমাদের বিশেষ অভিযান চলছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিনিয়ত চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হচ্ছে। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয় আছে। সিন্ডিকেট যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন, মাদকসংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
