জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবহার কমায় দেশজুড়ে প্রচারাভিযানে নামছে সরকার
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম জোরদার করতে আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে বছরব্যাপী জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। কর্মসূচির স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়।’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।
একসময় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ খাতে অগ্রগতি থমকে গেছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে ২ দশমিক ৩-এ স্থির থাকা দেশের মোট প্রজনন হার বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। একই সময়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হারও কমেছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানান, আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এ প্রচারাভিযান চলবে ২০২৭ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। জারি গান, সারি গান, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই পরিবার পরিকল্পনার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোতে অবনতি হয়েছে।
দেশে একজন নারীর জীবদ্দশায় সন্তান জন্মদানের গড় সংখ্যা ১৯৭৫ সালে ছিল ৬ দশমিক ৩। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের প্রসারের ফলে ২০১২ সালে তা কমে ২ দশমিক ৩-এ নেমে আসে। তবে দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকার পর প্রজনন হার বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। অন্যদিকে, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম বলেন, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের ধীরগতির প্রভাব ইতোমধ্যে প্রজনন হার বৃদ্ধি, গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার হ্রাস এবং অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে।
তার মতে, শুধু প্রচার-প্রচারণা চালালেই হবে না; পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) অনুমোদন না পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে সেক্টর কর্মসূচি থেকে সরে আসার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে মাঠপর্যায়ে সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মীরা কনডম, খাবার বড়ি, আইইউডি, ইনজেকশন ও ইমপ্ল্যান্টসহ বিভিন্ন ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নতুন সামগ্রী কেনা বন্ধ থাকায় অনেক উপজেলায় পর্যাপ্ত মজুত নেই।
অধিদপ্তরের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালের (এসসিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ১৯৮টি উপজেলায় কনডম, ৩৫৪টি উপজেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং ৪২৮টি উপজেলায় আইইউডির মজুত শেষ হয়ে গেছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিনাত রেহানা বলেন, অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত দুই বছর মাঠপর্যায়ে গর্ভনিরোধক সামগ্রী সরবরাহ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার কার্যক্রমও দুর্বল হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অসমাপ্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। ডিসেম্বর নাগাদ এসব সামগ্রী সংগ্রহ করে মাঠপর্যায়ে বিতরণ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় কর্মীর ঘাটতিও সেবা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। বর্তমানে প্রায় ৩৭ শতাংশ জনবল ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার কর্মী কম থাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিয়মিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া করোনাকালে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়াকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ কমানো এবং সন্তান জন্মদানের মধ্যে যথাযথ বিরতি রাখার বিষয়ে পরিবারগুলোকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অধ্যাপক মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম বলেন, সাধারণ প্রচারাভিযানের পাশাপাশি যেসব জনগোষ্ঠীর পরিবার পরিকল্পনা সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। বিশেষ করে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঝুঁকিতে থাকা নারী, সেবা গ্রহণে সমস্যার মুখে পড়া ব্যক্তি এবং জনবলসংকট রয়েছে—এমন এলাকার বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শহরাঞ্চলে দ্রুত বাড়তে থাকা অভিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিবার পরিকল্পনা সেবার চাহিদাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। দেশে পরিবার পরিকল্পনা সেবার অপূর্ণ চাহিদা বেড়েছে, অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে তা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।


