রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদেরকে স্বদেশে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। তাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় এবং সংশ্লিষ্ট সকল দেশের সহযোগিতায় সরকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
রোববার বিকেলে রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ‘রোহিঙ্গা সংকট: টেকসই প্রত্যাবাসন ও আঞ্চলিক স্থায়ী সমাধানের উপায়’ শীর্ষক এক সেমিনার শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডিএস) এ সেমিনারের আয়োজন করে। সভাপতিত্ব করেন এফএসডিএস-এর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজল এলাহী আকবর।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কেবল বাংলাদেশের একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; বরং চীন, আসিয়ান, জাতিসংঘ, জাপানসহ সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে একটি কৌশলগত আঞ্চলিক জোট ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমরা নতুনভাবে জাপান সরকারকে অনুরোধ করেছি, চাইনিজ সরকারকেও আমরা অনুরোধ করেছি তারা আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছেন এ বিষয়ে তারা সহযোগিতা করবেন।’
এর আগে সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের সবারই মিয়ানমারের পরিস্থিতি জানা আছে, কেবল দুটি জায়গায় আইনের ডি জুরি সরকার রয়েছে এবং বাকি সমস্ত জমি এএ (আরাকান আর্মি) এর দখলে। আমাদের তাদের সাথে অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করতে হবে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, ডি জুরি ও ডি ফ্যাক্টো (বাস্তবভিত্তিক)—উভয় পক্ষের বৈদেশিক নীতিই তাদের (রোহিঙ্গা) ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছুক নয়। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এমনকি তা সত্ত্বেও, জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আমরা সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করছি।’
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রীর পদমর্যাদা) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। তিনি জানান, রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক সমস্যা বা দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়; এটি জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার ও সুরক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ নিজ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াতে কেবল ক্যাম্পগুলোর ওপরই চাপ নয়, এর পাশাপাশি অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও চাপ রয়েছে।’
সেমিনারে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করা হয়, যেখানে টেকসই প্রত্যাবাসনকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা, উন্নয়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং সম্প্রদায়গত পুনর্মিলনের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক জরুরি পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি মানব নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থায়িত্ব, উন্নয়ন ও ভূ-রাজনীতি সম্পর্কিত একটি জটিল আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।’
বক্তারা এই সংকটের তিনটি পারস্পরিক সম্পর্কিত দিক পর্যালোচনা করেন- মিয়ানমার ও রাখাইনের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতা; রাখাইনের উন্নয়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মধ্যকার সম্পর্ক এবং টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক কূটনীতির ভূমিকা।
অধ্যাপক এ.এস.এম. আলী আশরাফ মিয়ানমার ও রাখাইনের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতার ওপর একটি উপস্থাপনা প্রদান করেন। অধ্যাপক শাহাব এনাম খান রাখাইনের উন্নয়ন, যোগাযোগ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ে বক্তব্য রাখেন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাফাআত আহমেদ আঞ্চলিক কূটনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত বিকল্পসমূহ নিয়ে আলোচনা করেন।
সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, টেকসই প্রত্যাবাসন কেবল বাস্তুচ্যুত মানুষের শারীরিক প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন সব শর্তের ওপর নির্ভর করে যা নিরাপত্তা, অধিকার ও নাগরিকত্ব, আবাসন, জীবিকা, মৌলিক পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ এবং যেসব সম্প্রদায়ের মধ্যে তারা ফিরে বাস করবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে।
সেমিনারে দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
