জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে রেজিস্ট্রির আইনি প্রক্রিয়া
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সামান্য অসাবধানতা বা আইনি প্রক্রিয়ার অজ্ঞতার কারণে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি মামলার জালে জড়িয়ে পড়েন। তাই নিজের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা এবং জমির চূড়ান্ত ও নিষ্কণ্টক মালিকানা নিশ্চিত করতে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু ধাপ অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
জমি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সাধারণ মানুষকে নানা জটিলতা, প্রতারণা ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি বিরোধের মুখোমুখি হতে হয়। সঠিক নিয়মে জমি রেজিস্ট্রি না করা, কর পরিশোধে অস্পষ্টতা, আইনি বাধাগুলো সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা জমি ক্রয়ের পর নামজারিসহ পরবর্তী আবশ্যিক পদক্ষেপগুলো সঠিক সময়ে গ্রহণ না করার কারণে অনেকেই তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে কেনা সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব হন।
আদালতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয় মামলার জটলায়। অথচ কেনাবেচার সময় একটু সচেতনতা এবং আইনের সাধারণ কিছু বিষয় জানা থাকলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি অনায়াসেই এড়ানো সম্ভব। জমি হস্তান্তরের সময় ক্রেতা ও বিক্রেতা-উভয় পক্ষেরই কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি দায়-দায়িত্ব এবং করণীয় রয়েছে, যা সঠিকভাবে পালন করা দুই পক্ষের জন্যই জরুরি। রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার জটিলতা এড়াতে এবং জমি ক্রয়ের পর নিজের মালিকানা শতভাগ সুরক্ষিত রাখতে আইনসম্মত যে বিষয়গুলো প্রত্যেকের জানা থাকা দরকার চলুন সেসব জেনে নিই।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)।
জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ভ্যাট (VAT) এবং উৎস কর সর্বদাই বিক্রেতার আয়ের ওপর ধার্যকৃত কর। ফলে আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী এই দুই প্রকার কর বিক্রেতার নামেই সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। তবে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে অন্যান্য বাকি করসমূহ পরিশোধ করবেন মূলত জমির ক্রেতা।
রেজিস্ট্রি করার পর দলিলে দাগ, খতিয়ান, মৌজা, সীমানা (চৌহদ্দি) বা নামে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে। ভুল ধরা পড়ার ৩ বছরের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হয়। নির্ধারিত ৩ বছর পার হয়ে গেলে মামলাটি তামাদি আইনের দ্বারা বারিত হয়ে যায়। তবে তিন বছর অতিক্রান্ত হলে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করা সম্ভব। আদালতের রায়ের কপি সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে পৌঁছালে তিনি ভলিউম সংশোধন করে নেন। এছাড়া পৃথক 'ভ্রম সংশোধন দলিল' সম্পাদন করেও ভুল সংশোধন করা যায়।
অন্যদিকে, কোনো দলিল জাল প্রমাণিত হলে তা জানার ৩ বছরের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে উক্ত দলিল বাতিল ও একই সাথে সম্পত্তির দখল প্রাপ্তির মামলা করা সমীচীন।
কোনো দলিলদাতা শারীরিক অক্ষমতার কারণে রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হতে না পারলে, রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩৮ ধারা মতে কমিশনের জন্য আবেদন করতে পারেন। আবেদনের ভিত্তিতে সাব-রেজিস্ট্রার বা তার প্রতিনিধি দলিলদাতার বাসস্থানে গিয়ে সম্পাদন স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী দলিলদাতা ও গ্রহীতা উভয়ই অফিসে যেতে ব্যর্থ হলে 'ভিজিট ফি' জমা দিয়ে বাড়িতে বসেই দলিল রেজিস্ট্রি করানোর বিধান রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের নামে জমি কিনতে হলে সরাসরি প্রতিষ্ঠানের বরাবরেই দলিল সম্পাদন করতে হবে, সেখানে ব্যক্তিবিশেষের নাম যুক্ত করা যাবে না। তবে কোনো কোম্পানির পক্ষে তার চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক দলিল সম্পাদন করতে পারবেন। এছাড়া, সাফ কবলা দলিল তৈরির সময় কোথাও ভুলত্রুটি হলে দলিলের শেষাংশে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা ও লাইন নম্বর উল্লেখ করে 'কৈফিয়ত' লিখে নিচে দলিল লেখকের স্বাক্ষর প্রদান বাধ্যতামূলক।
আইন অনুযায়ী নাবালক, শত্রু দেশের নাগরিক, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া বা উন্মাদ ঘোষিত ব্যক্তি এবং মদ্যপ অবস্থায় সম্পন্ন করা যেকোনো দলিল বাতিল বলে গণ্য হবে। তাছাড়া আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সম্পাদিত দলিল কিংবা ভয়ভীতি, লোভ ও জোরজবরদস্তি করে রেজিস্ট্রি করা দলিল আইনিভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল।
জমি কেনার পর সর্বপ্রথমে জমি পরিমাপ করে সীমানা নির্ধারণ ও বাস্তব দখল (যেমন— চাষাবাদ বা অবকাঠামো নির্মাণ) গ্রহণ করতে হবে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মূল দলিল বা দ্রুততম সময়ে 'সার্টিফায়েড কপি' সংগ্রহ করে অবিলম্বে স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নামজারি বা মিউটেশনের আবেদন করতে হবে। নামজারি শেষে খতিয়ান, ডিসিআর (DCR) এবং ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা নিজের কাছে সংরক্ষণ করা আবশ্যক। মনে রাখবেন, ক্রয়ের পর দখলে যেতে বিলম্ব কিংবা নামজারি না করলে অসাধু বিক্রেতা একই জমি অন্য কারো কাছে পুনঃবিক্রি করার সুযোগ পেতে পারে।
জমিজমা সংক্রান্ত আইনি ঝামেলা এড়াতে অসচেতনতার কোনো সুযোগ নেই। সঠিক সময়ে কর প্রদান, দলিল যাচাই, কমিশন ও ভিজিটের সঠিক ব্যবহার এবং জমি হস্তান্তরের পরপরই দখল ও নামজারি সম্পন্ন করাই একজন সচেতন নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব। আইনি নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করলে জমি কেনাবেচায় প্রতারণা সম্পূর্ণ রোধ করা সম্ভব।
