ইন্ডাস্ট্রি, একাডেমিয়া ও সরকারের সমন্বয়েই সমস্যার সমাধান সম্ভব: মাহদী আমিন
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইন্ডাস্ট্রি, একাডেমিয়া ও সরকারের সম্মিলিত সমন্বয়ের মাধ্যমেই দেশের বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান সম্ভব বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব এবং একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির যৌথ উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাদান, গবেষণা কিংবা যেকোনো প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে বিদেশি পণ্য আমদানি, পরামর্শক এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অথচ দেশের উজ্জ্বল ও শীর্ষ মেধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি সমস্যার স্থানীয় সমাধান বের করা পুরোপুরি সম্ভব।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) যৌথ উদ্যোগে ‘শিল্প ও একাডেমিয়ার সংযোগ: ব্যবসায়িক উদ্ভাবনের দিকে এআই-এর রূপান্তর’ শীর্ষক সেশনটি অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক উদ্ভাবনী ভাবনাগুলোকে এগিয়ে নিতে সরকার বিভিন্ন স্টার্টআপ ফান্ড ও অনুদানের ব্যবস্থা করছে বলেও জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিতে রয়েছেন, তাদের সম্ভাবনাময় উদ্যোগেও প্রাথমিক মূলধনের জোগান দেওয়ার উদ্যোগ চলমান রয়েছে। বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে একটি টেকসই জাতীয় শিল্প বলয় গড়ে তোলা হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট নিয়ে যে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তার মূল লক্ষ্যই হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে সফলতার জন্য রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য নয়; দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির একযোগে কাজ করার আহ্বান
যানজট নিরসন, কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আবহাওয়া পূর্বাভাসভিত্তিক আধুনিক চাষাবাদ কিংবা শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ানোর মতো প্রতিটি সমস্যার স্থানীয় সমাধানে একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রিকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, এই ধরনের উদ্ভাবনী সমাধান যে কেবল ঢাকার কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেই আসতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ঢাকার বাইরেও বহু শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছেন, যেখান থেকে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ গড়ে উঠছে। তাই জেলা পর্যায়ে স্থানীয় ব্যবসা ও শিল্প উদ্যোগের সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি কার্যকর যোগসূত্র তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও মেশিন লার্নিংয়ের প্রভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে কিছু প্রচলিত কর্মসংস্থান হ্রাস পেলেও ডাটা অ্যানোটেশন থেকে শুরু করে এআই অ্যাপ্লিকেশনের মতো অসংখ্য নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে। শিক্ষাক্রমকে সময়ের সঙ্গে উপযোগী ও বাস্তবমুখী করে গড়ে তুলতে পারলে তরুণ প্রজন্মের জন্য বিপুল নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে তা মানবকল্যাণে প্রয়োগ করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষা ব্যবস্থার দুটি মৌলিক লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, প্রথমত, শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা-যার মধ্যে নীতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন পেশাগত দক্ষতা তৈরি করা, যেন তারা কর্মক্ষেত্রে কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে সঠিক সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন।
সবাইকে প্রথাগতভাবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা গবেষক হতে হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও কারিগরি শিক্ষায় অনেকের বিশেষ পারদর্শিতা থাকতে পারে। সে লক্ষ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে, তাদের কারিগরি শিক্ষা ও ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভিন্ন ক্যারিয়ারের পথ তৈরি করে দেওয়া হবে। মেধা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে সমতার সুযোগ সৃষ্টি করে প্রতিটি নাগরিকের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা বিকশিত করাই সরকারের দায়িত্ব।
‘ব্রেন ড্রেইন’ ঠেকাতে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ জোর
মেধা পাচার (ব্রেন ড্রেইন) প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, দেশের বহু প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, গবেষকসহ বিভিন্ন বিষয়ের মেধাবীরা বিদেশে অবস্থান করছেন এবং সেখানে শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। এতে প্রমাণ হয় যে আমাদের মেধার কোনো সংকট নেই; আসল সংকট হলো দেশে তাদের মেধা বিকাশের উপযুক্ত সুযোগ ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে না পারা।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ‘ব্রেন ড্রেইন’কে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ রূপান্তর করার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, মেধাবীরা বিদেশে অবস্থান বা বসবাস করলেও যাতে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারেন, সরকার সেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে।
নতুন এই ইকোসিস্টেমের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, প্রবাসে থাকা উদ্যোক্তারা যেন বাংলাদেশে সহজে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং গবেষক ও শিক্ষকেরা যেন দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা চালাতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করা হবে। সফল আন্তর্জাতিক একাডেমিশিয়ানরা যাতে দেশে ফিরে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারেন, সরকার সেই ধরনের একটি শক্তিশালী পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরি করা সরকারের অগ্রাধিকার
মাহদী আমিন বলেন, তরুণ প্রজন্মের অফুরন্ত প্রাণশক্তি, উদ্দীপনা ও মেধা দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই সুবর্ণ সময়ে বিপুল যুবশক্তিকে উপযুক্ত নীতি ও প্রণোদনার মাধ্যমে কার্যকর কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হিসেবে রূপান্তর করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
তারুণ্যের প্রত্যাশাকে ধারণ করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বেসরকারি খাতের এই অংশীদারিত্বের মতো সরকারের অন্যান্য বিভাগও যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে নীতিমালার সংস্কার ও বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফ্লাক্সের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রাজ্জাক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি) ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন, বুয়েটের শিক্ষার্থী ও নেভোলিনের সিইও মো. রাহিনুর রহমান, আইইউটির শিক্ষার্থী ও অ্যান্টসের সিইও তৌসিফ ইসলাম এবং এআইইউবির সিএসই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ মৃধা।

-6aec552fbbfa3.jpg)