Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাজেটে নিরাপদ খাদ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হোক

Advertisement

Icon

ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাজেটে নিরাপদ খাদ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হোক

ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন। ফাইল ছবি

Advertisement

সারা পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ধান, মাছ, সবজি, ফলমূল, দুধ ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। ভেজাল, রাসায়নিক দূষণ, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে জনস্বাস্থ্য আজ ঝুঁকির মুখে। তাই আসন্ন জাতীয় বাজেটে নিরাপদ খাদ্যকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

রোববার ৭ জুন বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস। নিরাপদ খাদ্য কেবল একটি ভোক্তা অধিকার নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা হলেও সেই খাদ্য যদি দূষিত, ভেজালযুক্ত বা ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্বারা আক্রা হয়, তাহলে তা জীবন রক্ষার পরিবর্তে জীবন ও স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলে। তাই বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; বরং কৃষক, উৎপাদক, ব্যবসায়ী, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং ভোক্তা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

বর্তমান বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্য নিরাপদ দুটি ভিন্ন কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে খাদ্যের প্রাপ্যতা, আর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেই খাদ্য মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। একটি দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও যদি খাদ্য নিরাপদ না হয়, তাহলে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যায়। তাই আজকের বিশ্বে ‘খাদ্য উৎপাদন’ নয়’, বরং ‘নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনই’ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। দূষিত খাদ্যের কারণে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, ক্যানসার, কিডনি রোগ এবং নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে খাদ্য নিরাপদতা কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ধান, মাছ, সবজি, ফলমূল, দুধ ও ডিম উৎপাদনে দেশ এখন অনেক এগিয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের এই সাফল্যের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ে ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, মাছ ও মাংস সংরক্ষণে ক্ষতিকর রাসায়নিক, শাকসবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক এবং খাদ্যে ভেজালের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যদিও সরকার ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তবুও সমস্যাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

খাদ্যে রাসায়নিক দূষণ বর্তমানে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অনেক সময় ফসলের মধ্যে অবশিষ্টাংশ থেকে যায়। নির্ধারিত মাত্রার বেশি অবশিষ্টাংশ মানবদেহে প্রবেশ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, হরমোনজনিত সমস্যা এবং স্নায়ুবিক জটিলতার কারণ হতে পারে। একইভাবে মাছ ও পোল্ট্রি খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টি করছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য নতুন হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সতর্কতা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে বীজ বপন, চাষাবাদ, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহণ এবং বিপণন পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো একটি ধাপে অবহেলা পুরো খাদ্য শৃঙ্খলকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। নেদারল্যান্ডস, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশ, সেখানে খাদ্যের প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি সিস্টেমের আওতায় রয়েছে। কোনো পণ্যে সমস্যা দেখা দিলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এর ফলে ভোক্তাদের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

জাপান খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরেকটি অনুকরণীয় উদাহরণ। খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ফলে খাদ্যবাহিত রোগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

জার্মানি এবং ডেনমার্কের মতো দেশগুলো খাদ্যে রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ ও ভেজাল শনাক্ত করতে অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন করেছে। নিয়মিত বাজার তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তারা খাদ্য নিরাপত্তার উচ্চমান বজায় রেখেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং কার্যকর মনিটরিং অপরিহার্য।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, কৃষকদের ভালো কৃষি চর্চা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সঠিক মাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহার, ফসল তোলার আগে নির্ধারিত অপেক্ষাকাল মেনে চলা এবং জৈব পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, দেশে আরও আধুনিক কৃষি খামার স্থাপন করতে হবে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হলে দ্রুত খাদ্যের গুণগত মান যাচাই করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে।

তৃতীয়ত, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। 

চতুর্থত, ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। অনেক সময় ভোক্তার অসচেতনতার কারণেও ঝুঁকি বাড়ে। ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য এড়িয়ে চলা এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে খাদ্য ক্রয় করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সঙ্গে অর্থনীতিরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপদতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বাজারে প্রবেশ করতে হলে আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। ফলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, বরং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিরও অন্যতম পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশে আম, কাঁঠাল, আনারস, সবজি, চিংড়ি, মাছ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তাই নিরাপদ খাদ্যে বিনিয়োগকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। এসব বিবেচনায় নিয়ে আগামী বাজেটে নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন।

বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস ২০২৬ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। নিরাপদ খাদ্য ছাড়া সুস্থ জাতি গঠন সম্ভব নয়। একটি দেশের মানবসম্পদ যত বেশি সুস্থ ও কর্মক্ষম হবে, সেই দেশ তত দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে। তাই খাদ্য নিরাপদতা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হওয়া প্রয়োজন।

আজকের এই বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক আমরা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করব, নিরাপদ খাদ্য বাজারজাত করব এবং নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করব। কৃষক থেকে ভোক্তা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ‌‘আজ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করলে, আমাদের আগামী প্রজন্ম পাবে সুস্থ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ।’

লেখক

নিরাপদ খাদ্য বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক

কৃষি রসায়ন বিভাগ

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

ই-মেইল: [email protected]

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন বিজ্ঞানীরা

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন বিজ্ঞানীরা

‘সুপার’ এল নিনোর কবলে বিশ্ব, যে ১০টি বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে পৃথিবী

‘সুপার’ এল নিনোর কবলে বিশ্ব, যে ১০টি বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে পৃথিবী

তৃতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে নুরুন্নাহারের এভারেস্ট জয়

তৃতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে নুরুন্নাহারের এভারেস্ট জয়

৬ মিনিটের জন্য অন্ধকারে ঢাকা পড়বে পৃথিবীর একাংশ

৬ মিনিটের জন্য অন্ধকারে ঢাকা পড়বে পৃথিবীর একাংশ

চাঁদে অভিযানের সময় ক্যামেরায় ধরা পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য

চাঁদে অভিযানের সময় ক্যামেরায় ধরা পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য

মুমিনের আখিরাত যখন দূরে সরে যায়

মুমিনের আখিরাত যখন দূরে সরে যায়

আরও পড়ুন

যখন মাৎস্যন্যায় ফিরে আসে

যখন মাৎস্যন্যায় ফিরে আসে

হালফিল বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম