Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

Advertisement

Icon

সৈয়দ তোশারফ আলী

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

প্রায় একশ বছর আগে বার্ট্রান্ড রাসেল সতর্ক করেছিলেন, অর্থনৈতিক শক্তি কখনো কখনো রাজনৈতিক স্বাধীনতার অন্তর্নিহিত অর্থকে দুর্বল করে দিতে পারে। ১৯২২ সালে প্রকাশিত The Problem of China গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছিলেন, বিদেশি আর্থিক স্বার্থ কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করলে দেশটি বাহ্যিকভাবে রাজনৈতিক দিক থেকে স্বাধীন থাকলেও তার অর্থনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। রাসেল চীনের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবতা নিয়ে লিখেছিলেন। তার বক্তব্যকে একুশ শতকের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না। তবু তার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক : কোনো দেশ যদি অতিরিক্তভাবে বহিরাগত অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তার রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব কতটা অর্থবহ থাকে? প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য প্রশ্ন : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্যসংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কহার নির্ধারণ করেছে এবং নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য পারস্পরিক শুল্কের ব্যবস্থা রেখেছে। চুক্তিটি বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সমর্থকদের বক্তব্য হলো, এর ফলে বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়তে পারে। সমালোচকরা বাংলাদেশের দেওয়া বিভিন্ন ছাড় এবং তার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিষয়টিকে স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রশ্নগুলো সামনে আনা জরুরি। এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কি আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে? দেশীয় শিল্প কি প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে? কর্মসংস্থান ও মজুরি কি বাড়বে? চুক্তিটি কি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী করবে, নাকি একটি বড় বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াবে? রাসেলের পুরোনো সতর্কবাণী এখানেই নতুন প্রাসঙ্গিকতা লাভ করে।

অর্থনৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব : বিদেশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মানেই অর্থনৈতিক আধিপত্য নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য মূলধন, প্রযুক্তি, বাজার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। বিদেশি বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং দেশীয় উৎপাদকদের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। সমস্যা দেখা দেয় যখন বিকল্পের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। কোনো দেশ যদি রপ্তানির জন্য একটি বাজার, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য একমাত্র সরবরাহকারী, জ্বালানির জন্য একটি উৎস অথবা অর্থায়নের জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে বহিরাগত চাপ ও অর্থনৈতিক অভিঘাতের কাছে দেশটির ঝুঁকি বেড়ে যায়। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের অর্থ তাই বলে বিচ্ছিন্নতা নয়। এর অর্থ হলো-একটি দেশের নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতা ও বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এতটাই শক্তিশালী হওয়া, যাতে কোনো একটি বাইরের শক্তির ওপর দেশটি অতিরিক্ত নির্ভর না করে সে নিজের জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

ভারত ও আঞ্চলিক নির্ভরতা : ঠিক এ নীতিই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণে প্রযোজ্য। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক এবং উভয় দেশের জন্যই উপকারী। বাংলাদেশের জন্য তুলা, সুতা, কাপড়, যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্য এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে ভারত। বাংলাদেশি অনেক উৎপাদক এসব ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভর করেন, কারণ এগুলো তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক দামে এবং সহজে পাওয়া যায়। তবে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগও যথেষ্ট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ১.৭৫ বিলিয়ন ডলার। এ বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি এককভাবে অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রমাণ নয়। উৎপাদনক্ষমতার পার্থক্য, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং শিল্পের প্রয়োজনীয়তার মতো বিভিন্ন কারণ বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে। আবার বাংলাদেশি শিল্পও ভারতীয় কাঁচামাল ও শিল্প-উপকরণ থেকে বাস্তব সুবিধা পেয়ে থাকে। অতএব মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত-বাংলাদেশ কীভাবে নিজের উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ করে দুই দেশের সম্পর্ককে ক্রমশ আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক করে তুলতে পারে।

আমেরিকাবিরোধী বা ভারতবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয় : রাসেলের বক্তব্যকে আমেরিকা বা ভারতের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসাবে ব্যবহার করা সমীচীন নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশসহ অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দরকার। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার; ভারত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদার এবং শিল্পের কাঁচামালের অন্যতম বড় উৎস। সুতরাং কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে অন্য একটি দেশকে বন্ধু হিসাবে বেছে নেওয়া উচিত নয়; বরং কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলাই সঠিক নীতি। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে যত বেশি বিকল্প থাকবে, বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতাও তত বাড়বে।

সস্তা শ্রম থেকে মানবসম্পদ : দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও কম মজুরি সম্পর্কে রাসেলের উদ্বেগ বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার সঙ্গেও কিছুটা সাযুজ্য রয়েছে।

শ্রমনির্ভর উৎপাদন, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য রপ্তানি সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু দেশের পরবর্তী উন্নয়ন পর্যায় চিরকাল কম মজুরির ওপর নির্ভর করতে পারে না। বাংলাদেশকে সস্তা শ্রম থেকে দক্ষ শ্রমে, কম মূল্য সংযোজনের উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্যের শিল্প ও সেবায় এবং আমদানিনির্ভর প্রযুক্তি থেকে অধিকতর দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিকে যেতে হবে। আর এর জন্য শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা, উদ্ভাবন, অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বহুমুখীকরণই পারে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে : বাংলাদেশের কৌশলগত লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতির বহুমুখীকরণ। রপ্তানি পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্য আনতে হবে; জ্বালানি ও প্রযুক্তির উৎস বহুমুখী করতে হবে; বিনিয়োগের অংশীদার বাড়াতে হবে এবং সর্বোপরি দেশের উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণ করতে হবে। পোশাকশিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাত সম্প্রসারণ করা গেলে নির্দিষ্ট কোনো শিল্প বা বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সহজ হবে। একইভাবে, যেসব শিল্প-উপকরণ এখন আমদানি করতে হচ্ছে, সেগুলোর কিছু দেশে উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করা যেতে পারে-যা হবে অর্থনৈতিকভাবে দক্ষ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টেকসই। এটি আত্মনির্ভরতার নামে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। এটি হলো কৌশলগত উন্মুক্ততা।

স্বাধীনতার একটি ভিন্ন অর্থ : জাতীয় স্বাধীনতার অর্থও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক যুগে স্বাধীনতার প্রধান অর্থ ছিল বিদেশি রাজনৈতিক শাসন থেকে মুক্তি। আজ রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অবশ্যই অপরিহার্য; কিন্তু তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের পতাকা, সংসদ ও সার্বভৌম সরকার থাকতে পারে; কিন্তু যদি সে উন্নয়নের অর্থায়ন করতে না পারে, প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করতে না পারে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে না পারে এবং বহিরাগত অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলা করার সক্ষমতা না থাকে, তাহলে তার স্বাধীনতা বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই রাসেলের বক্তব্য আজও বিবেচনার দাবি রাখে। এর অর্থ এই নয় যে আমেরিকা, ভারত বা অন্য কোনো শক্তি বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করবে। অর্থাৎ বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে জাতীয় স্বার্থে। এজন্য সম্যকভাবে বুঝতে হবে অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে শক্তির সম্পর্ক। বাংলাদেশের উচিত হবে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে স্বাগত জানানো, কিন্তু নিজের অর্থনৈতিক বিচারবোধ বিসর্জন না দেওয়া। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করতে হবে, পাশাপাশি নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করতে হবে, কিন্তু একটি নির্ভরতার পরিবর্তে আরেকটি নির্ভরতা সৃষ্টি করা যাবে না। কোনো একটি পরাশক্তির সঙ্গে অবস্থান নেওয়া কিংবা অন্য কোনো শক্তির বিরোধিতা করা ঠিক হবে না। নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে সক্ষম হতে হবে বাংলাদেশকে। প্রায় এক শতাব্দী আগে আর্থিক শক্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে রাসেল যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা আজও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তিতে শক্তিশালী করতে পারলেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সত্যিকার অর্থে সমমর্যাদার অংশীদারত্বে পরিণত হতে পারে।

সৈয়দ তোশারফ আলী : দ্য নিউ নেশন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম