Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

Advertisement

Icon

সম্রাট মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

যে নারী স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়ে, তাকে যেন দুঃস্বপ্ন নিয়ে ফিরতে না হয়। প্রলোভনের ফাঁদ নয়, নিরাপদ ভবিষ্যৎ চাই-নারী পাচার রুখে দাঁড়াই।

নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। জেন্ডার সমতায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থানীয়। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নারীদের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কেবল দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নারীর গুরুত্বের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রত্যেক নারীর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সদা সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন দেশে গমনেচ্ছু নারীদের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন পুলিশকে সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হয়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ হিসাবে ইমিগ্রেশন পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব কেবল পাসপোর্ট ও ভিসার পাতা উলটে সিল মারা নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের প্রস্থান এবং নিরাপদে দেশে ফেরা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি নিরূপণ করাও তাদের আইনি ও নৈতিক কাজের অপরিহার্য অংশ।

সম্প্রতি তিন তরুণীকে নেপালযাত্রায় ইমিগ্রেশন পুলিশের বাধা এবং এ বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্টের রুল জনমনে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এই তিন নারী কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করতে নেপাল যেতে চাইলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের ফেরত পাঠায়। কনফারেন্সে যাওয়ার উপযুক্ত ডকুমেন্ট উপস্থাপন করতে বললে তারা তা দেখাতে পারেননি। কোথায়, কখন, কোন বিষয়ে কনফারেন্স-তা-ও সঠিকভাবে বলতে পারেননি। তারা শিক্ষার্থী হিসাবে কোথায় লেখাপড়া ও কোথায় চাকরি করেন, তারও সঠিক তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি। তারা তাদের ভ্রমণের বিষয়ে অসত্য তথ্য দিয়েছেন। তাদের যাত্রা সন্দেহজনক হওয়ায় মানব পাচারের ঝুঁকি এড়াতে তাদের নিরাপত্তার জন্যই যাত্রা স্থগিত করা হয়। সাধারণ দৃষ্টিতে একে নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য বলে মনে হতে পারে; কিন্তু আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মুদ্রার অপর পিঠে এক রূঢ় বাস্তবতা ও ভয়াবহ অপরাধজগতের ছায়াও দেখা যেতে পারে।

আমাদের সামাজিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় মানব পাচার, বিশেষ করে নারী পাচার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রগুলো বাংলাদেশ থেকে নারীদের মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য দেশে পাচার করার জন্য নেপাল, ভারত বা দুবাইকে নিরাপদ ‘ট্রানজিট রুট’ হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। পাশাপাশি চায়নাতে ট্যুরিস্ট এবং কিউ ওয়ান ভিসার আড়ালে পাচারের শিকার হওয়া নারীদের ক্রন্দন-আহাজারির বিভিন্ন প্রতিবেদন সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। এসব চক্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তু থাকেন তরুণী এবং একা ভ্রমণকারী নারীরা। তাদের উদ্দেশ্য সাধারণত ‘ট্যুরিস্ট ভিসা’ বা ‘আকর্ষণীয় চাকরির’ টোপ দিয়ে নারীদের বিদেশে নেওয়া। ইমিগ্রেশন ডেস্কে কয়েক মিনিটের কথোপকথনে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে যাত্রীর সার্বিক প্রোফাইল যাচাই করতে হয়। যাত্রীর ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য, স্পন্সরের সত্যতা, গন্তব্যে থাকার জায়গা বা আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে যদি ‘যৌক্তিক সন্দেহ’ তৈরি হয়, তবে দেশের নাগরিককে সম্ভাব্য বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা ইমিগ্রেশন পুলিশের অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এটি কোনোভাবেই লিঙ্গবৈষম্য নয়, বরং এটি ‘ভিক্টিম প্রোফাইলিং’-এর অংশ।

ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালে ১ জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৩৮ হাজার ৪৮০ জন যাত্রী নেপালে গমন করেছেন এবং তার মধ্যে ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও ৩ হাজার ৪০৮ জন যাত্রী বাংলাদেশে ফেরত আসেননি। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৭৭ জন পুরুষ এবং ৭৩১ জন হচ্ছে নারী যাত্রী! নেপালকে রুট হিসাবে ব্যবহার করে চীন, মালয়েশিয়া, মিসর ও ইতালিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের একটা হাব গড়ে উঠেছে। নেপালস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস চিঠির মাধ্যমে এ বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলেছে।

আমরা প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমে দেখি, সাধারণ ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে বিদেশে গিয়ে অসংখ্য নারী ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিসহ বিভিন্ন রকম অমানবিক ও অবৈধ কাজে লিপ্ত করানো হয়। এ অসহায় নারীদের উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা বাংলাদেশ দূতাবাস এবং রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল ও কূটনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জিং একটি প্রক্রিয়া। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখলে ইমিগ্রেশন পুলিশের ভূমিকাকে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে হলেও এটি মূলত মানব পাচার প্রতিরোধের সর্বশেষ রক্ষাকবচ। কারণ একবার কোনো নাগরিক ইমিগ্রেশনের ফাইনাল চেকিং অতিক্রম করে বিমানে উঠে বসলে, তার নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টিও আওতার বাইরে চলে যায়।

BRAC Migration Programme-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২৫ সময়কালে অন্তত ৬৭ হাজার ১৯৯ জন বাংলাদেশি নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি মজুরি না দেওয়া, খাদ্যবঞ্চনা ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, জোরপূর্বক শ্রম, দেশে যোগাযোগ করতে না দেওয়া এবং জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তির মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত। তবে এ সংখ্যাকে সঠিক হিসাবে গণ্য করা যাবে না। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শোষণের শিকার নারীরা নিজের ও পরিবারের মানসম্মানের ভয়ে ঘটনা রিপোর্ট করেন না।

মহামান্য হাইকোর্টের রুল আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের দিকটি স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার রয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক কেবল ‘নারী’ বা ‘অবিবাহিত’ হওয়ার কারণে বিদেশে যেতে পারবেন না-এমন কোনো বিধান বাংলাদেশে নেই। ইমিগ্রেশন পুলিশ এ বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। নেপালগামী তিনজন নারী যাত্রীর মিথ্যা তথ্য দিয়ে ইমিগ্রেশন অতিক্রম করার চেষ্টা যেমন তাদের নিজের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, একইসঙ্গে রাষ্ট্রের জন্যও তা উদ্বেগের কারণ। আন্তর্জাতিক রুটে নারীর নিরাপদ গমনাগমন নিশ্চিত করতে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট, ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ (ঝুঁকি নিরূপণ) পদ্ধতি রয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করেই নারীদের মানব পাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

সম্রাট মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান : সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

নারীর বিদেশযাত্রা ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্বশীলতা

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম