গল্প
হেমন্তের সকাল
Advertisement
কামাল হোসাইন
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সকালের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কেটে ওঠেনি। রোদ উঠেছে, অনেকটা তেজহীন। চারপাশে নরম মিষ্টি আলো। দূরের গাছপালা আর ধানখেত কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে। দিদার কাকা মৈশানের কাঁধে হাত রাখলেন। বিশ বছর পর দেখা। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর কাকা বললেন, মনে পড়ল তাহলে বাছা? এসো, দাওয়ায় বসো দেখি! মৈশান তার কাঁধে থাকা ব্যাগটা নামিয়ে ঘরের দাওয়ায় বসল। এ দাওয়ায় বসেই মায়ের সঙ্গে কত দুপুর কেটেছে তার! নতুন ধানের চিড়ে আর গুড় খাওয়া, উঠোনে রোদ পোহানো, পাশের বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা-সব যেন এই সেদিনের কথা! কাকা উঠোনের এক পাশের আমগাছটা দেখিয়ে বললেন, তুমি চলে যাওয়ার পর বেলি ফুলের চারাগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর লাগানো হয়নি। তবে দেখ, গাছটার নিচে কোথা থেকে একটা নীল অপরাজিতা হয়েছে। বেশ ছড়িয়েও গেছে! মৈশান তাকিয়ে দেখল। অপরাজিতার লতাটা আমগাছের গোড়া ছাড়িয়ে উঠোনের একপাশে এসে পড়েছে। কয়েকটা ফুলও ফুটেছে। সে মৃদু হাসল। বাড়ির অনেক কিছুই বদলে গেছে, অথচ কিছু জিনিস প্রকৃতির নিয়মেই বেঁচে আছে।
মা-বাবা মারা যাওয়ার পর আর আসা হয়নি মৈশানের। তাই তো উঠোনে লোকজনের আনাগোনা নেই। তবু জায়গাটাকে পর মনে হলো না। বরং এতদিন পর ফিরে এসে মনে হলো, সে যেন কোথাও কিছু ফেলে গিয়েছিল, আজ আবার তা নতুন করে খুঁজে পেয়েছে। বাতাসে নতুন ধানের খড়ের গন্ধ ভেসে আসছে। পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে ঢেঁকিতে ধান ভানার ঢক ঢক শব্দ। মৈশান কান পেতে শুনল। শহরে থাকতে এমন শব্দের কথা কখনো মনেই পড়েনি! অথচ এই শব্দ শুনেই তার ছোটবেলার কত সকাল মনে পড়ে গেল। দিদার কাকা বললেন, শহর তো কত ঝলমলে, কত লোকজন। সারাক্ষণ ছোটাছুটি। কিন্তু এ হেমন্তের সকালে খেতের আল ধরে হাঁটার যে আরাম, তা কি ওখানে পাওয়া যায়? মৈশান হেসে বলল, শহরে অনেক কিছু আছে সত্যি, তবে এমন সকাল নেই। দুজনেই সামনের ধানখেতের দিকে তাকিয়ে রইল। কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। শিশিরভেজা ধানের শীষে রোদ পড়ে চিকচিক করছে। পাশে কোথাও গরুর গলার ঘণ্টা বাজছে টুংটাং শব্দে। মৈশানের মনে হলো, এতদিন পরও এ গ্রামটা তার কাছে অচেনা হয়নি। সে নিজেই এই গ্রাম থেকে কত দূরে সরে গেছে! আর দূরে থাকবে না। বাকি জীবন এই গ্রাম আঁকড়েই পড়ে থাকবে। একটু পর দিদার কাকা কাপড়ে মোড়া দু’টুকরা গুড়ের পাটালি বের করলেন। একটা মৈশানের হাতে দিয়ে বললেন, নাও, মুখে দাও। এটা দেখে নিশ্চয়ই তোমার মায়ের কথা মনে পড়ছে! মৈশান কেঁপে উঠল যেন। মনে পড়ল, উঠোনের কোণের উনুনে বসে মা রস জ্বালিয়ে গুড় বানাতেন। লোভ সামলাতে না পেরে সে তখন পাশ থেকে ছোট্ট আঙুলে একটু একটু করে খেত। মা বকতেন, আবার হাসতেনও। সেই উঠোনের কোণ, মাটির উনুন, মায়ের গায়ের গন্ধ-কতদিন যে এসব মনে পড়েনি! পাটালির টুকরোটা মুখে দিল মৈশান। সেই চেনা মিষ্টি স্বাদ। শহরে কতরকম মিষ্টি খেয়েছে, কিন্তু এ স্বাদের কোনো তুলনা হয় না। এর সঙ্গে মিশে আছে মায়ের স্মৃতি আর ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। মৈশান কিছু বলল না। দিদার কাকাও আর কথা বাড়ালেন না। শুধু মৈশানের কাঁধে তার হাত রাখলেন। একটু পর মৈশান উঠে দাঁড়াল। বন্ধ ঘরটার দিকে তাকিয়ে বলল, কাকা, তালাটা খুলতে হবে। অনেক দিন বন্ধ হয়ে রয়েছে। কাকা মৃদু হেসে বললেন, খুলতেই তো হবে, তুমি এসেছ যখন। মৈশান ব্যাগের পকেট হাতড়ে চাবির গোছা বের করল। চাবিটা এতদিন তার কাছেই ছিল। এই বিশ বছরে কত শহরে, কত বাড়িতে থেকেছে সে, কত কত দরজা খুলেছে, অথচ এই বাড়ির দরজা আর খোলা হয়নি! তালায় চাবি ঘোরাতেই দরজাটা খুলে গেল। ঘরের ভেতর জমে থাকা অন্ধকারে চকচকে রোদ ঢুকে পড়ল। মৈশান দরজার চৌকাঠে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। আর বাইরে তখন আমগাছের নিচে নীল অপরাজিতা হালকা বাতাসে দুলছে। ততক্ষণে কুয়াশা প্রায় কেটে গেছে। উঠোনে রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। দিদার কাকা দাওয়ায় বসে রইলেন। মৈশান ঘরের ভেতর থেকে একবার ডাকল, কাকা, একটু এসো তো! কাকা উঠে দাঁড়ালেন। হেমন্তের সকালটা ততক্ষণে বেশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে।
