Logo
Logo
×

Advertisement

খেলা

হাঙ্গেরির স্বপ্ন ভেঙে অন্ধকার থেকে উঠে আসা জার্মানির ইতিহাস

Advertisement

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম

হাঙ্গেরির স্বপ্ন ভেঙে অন্ধকার থেকে উঠে আসা জার্মানির ইতিহাস

ফাইল ছবি

Advertisement

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ যদি কাউকে অবাক করে থাকে, তবে ১৯৫৪ সালেরটা ছিল আরও বড় বিস্ময়। সেই আসরের আগে গোটা ফুটবল দুনিয়ার চোখ ছিল হাঙ্গেরির দিকে। ফেরেঙ্ক পুশকাস, স্যান্ডর কচসিস, নান্দোর হিডেকুটি… এই নামগুলো তখন ইউরোপের ময়দানে বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ছিল। কেউ ভাবেনি অন্য কোনো দল তাদের ঠেকাতে পারবে।

আর সেটা বলার কারণও ছিল। ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে ওয়েম্বলিতে এই হাঙ্গেরি দল ইংল্যান্ডকে ৬-৩ গোলে উড়িয়ে দেয়। প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি দল ইংল্যান্ডের নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাদের হারাল। পরের বছর মে মাসে বুদাপেস্টে আবার মুখোমুখি হয়, সেবার ফল আরও ভয়াবহ– ৭-১। ফুটবলের মানচিত্র তখন নতুন করে আঁকা হচ্ছিল, আর সেই কলম ছিল হাঙ্গেরির হাতে।

এই দলটাকে ডাকা হতো ম্যাজিক ম্যাগিয়ার্স। কিন্তু তাদের জাদুর পেছনে ছিল কঠোর শৃঙ্খলা। পাহাড়ে চড়া, অ্যাথলেটিক্স, বল নিয়ন্ত্রণ; সবকিছুতেই তারা অন্যদের থেকে এক যুগ এগিয়ে। হিডেকুটি মাঝমাঠে নেমে এসে এমন একটা ভূমিকায় খেলতেন যা তখনকার ফুটবলে প্রায় ভাবাই যেত না। বোজিক ছিলেন সুরকারের মতো, আর পুশকাসের বাঁ পায়ের শট ছিল যেন কামানের গোলা।

অন্যদিকে পশ্চিম জার্মানি ছিল এক নীরব ছায়া।

যুদ্ধের পর ধ্বংস, বিভাজন, লজ্জার বোঝা নিয়ে চলা এক দেশ। তাদের দিকে কেউ বিশেষ তাকায়নি। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই জমছিল একটা আগুন।

ফ্রিটজ ওয়াল্টার ছিলেন সেই আগুনের কেন্দ্র। যুদ্ধফেরত সৈনিক। বিমানে চড়তে ভয় পেতেন, কারণ কাছ থেকে দেখেছিলেন মৃত্যুর মুখ। তার খেলা ছিল শান্ত নদীর মতো; চোখধাঁধানো নয়, কিন্তু অসম্ভব গভীর। বাজে পাস দিতেন না, অকারণে বল ধরে রাখতেন না। যেন জানতেন, জীবনে প্রতিটি মুহূর্ত কতটা দামি।

সেই বিশ্বকাপের টুর্নামেন্ট কাঠামোটাও ছিল অদ্ভুত। গ্রুপের চারটি দল একে অপরের বিপক্ষে খেলেনি। প্লে-অফ, বিশৃঙ্খল হিসাব… সব মিলিয়ে এই কাঠামো শেষ পর্যন্ত সুবিধা করে দিল জার্মানিকে। গ্রুপপর্বে হাঙ্গেরির কাছে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পরও তারা টিকে রইল। ফিরে আসার একটা পথ খোলা ছিল।

সেই বাসেলের ম্যাচে হাঙ্গেরি জার্মানিকে রীতিমতো ধ্বংস করে দিয়েছিল। কচসিস একাই চার গোল। পুশকাসের পায়ে আগুন। কিন্তু সেই ম্যাচেই জার্মান ডিফেন্ডার ওয়ার্নার লিবরিশের একটি ট্যাকলে আহত হন পুশকাস। অভিযোগ ছিল সেটা ইচ্ছাকৃত। সেই আঘাতই কি শেষ পর্যন্ত ইতিহাস বদলে দিয়েছিল?

টুর্নামেন্ট জুড়ে প্রতিটি মাঠে আলাদা আলাদা মহাকাব্য তৈরি হচ্ছিল।

উরুগুয়ে নীরবে এসে স্কটল্যান্ডকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দিল। শিয়াফিনোর পাস আর ফুটওয়ার্ক দেখে মনে হচ্ছিল মানুষটা ঘাসের উপর হাঁটছেন না, ভাসছেন। অস্ট্রিয়া আর সুইজারল্যান্ডের ম্যাচে ১২টা গোল পড়ল, অস্ট্রিয়া জিতল ৭-৫-এ। অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড় বকোয়েট শরীরে টিউমার নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। ডাক্তার নিষেধ করেছিলেন। তিনি শুধু বললেন, খেলতেই হবে।

তারপর এল বার্নের যুদ্ধ; হাঙ্গেরি বনাম ব্রাজিল। বৃষ্টিভেজা মাঠে সেই ম্যাচ ফুটবল থেকে ধীরে ধীরে সত্যিকারের যুদ্ধে পরিণত হলো। ফাউল, লাথি, ঘুষি… সভ্যতার মুখোশ খুলে পড়ল। ড্রেসিংরুমেও সংঘর্ষ ছড়াল, বোতল উড়ল, রক্ত ঝরল। তবু হাঙ্গেরি জিতল। তারা তখনও অপ্রতিরোধ্য।

সেমিফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটা ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা লড়াই। অতিরিক্ত সময়ে কচসিসের দুটো হেড যেন বজ্রপাত হয়ে নামল। উরুগুয়ে হারল ৪-২ গোলে, কিন্তু হেরেও বীরের সম্মান পেল।

তারপর এল সেই দিন।

৪ জুলাই, ১৯৫৪। বার্ন। মেঘে ঢাকা আকাশ। অবিরাম বৃষ্টি। ৫৫ হাজার মানুষের নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠা এক সন্ধ্যা।

হাঙ্গেরি বনাম পশ্চিম জার্মানি।

সবাই জানত ফল কী হবে। মাত্র আট মিনিটেই স্কোর ২-০। পুশকাস গোল করলেন, তারপর কচসিসের আক্রমণ থেকে আরেকটা। জার্মান শিবিরে তখন আতঙ্ক। কিন্তু ফুটবল কখনো কেবল যুক্তির খেলা নয়।

ম্যাক্স মরলক একটা শোধ করলেন। তারপর হেলমুট রান সমতায় ফেরালেন। ২-২!

হাঙ্গেরির শরীরে তখন ক্লান্তি জমেছে। পুশকাস পুরোপুরি ফিট নন। বৃষ্টি মাঠকে ভারী করে তুলেছে। কিন্তু তবু তারা লড়ছে। যেন শুধু কাপ নয়, নিজেদের অমরত্ব রক্ষা করতে নেমেছে।

ফ্রিটজ ওয়াল্টার তখন জার্মানিকে সামনে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন। তার চোখে ছিল সেই যুদ্ধফেরত মানুষের জেদ - যিনি জানেন হারানোর মানে কী।

শেষ মুহূর্তে এল সেই আঘাত। হেলমুট রান বাঁ পায়ে শট নিলেন। বল গড়িয়ে গেল জালে। ৩-২!

স্টেডিয়াম মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

তবু নাটক শেষ হয়নি। পুশকাস আবার বল পাঠালেন জালে। হাঙ্গেরিয়ানরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। কিন্তু লাইন্সম্যানের পতাকা উঠল আকাশে। অফসাইড।

সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। অনেকে বলেন গোলটা বৈধ ছিল। অনেকে বলেন, ইতিহাস সেদিন জার্মানির পক্ষ বেছে নিয়েছিল।

শেষ বাঁশি বাজতেই বৃষ্টি থামল। ওয়াল্টার হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। জার্মান খেলোয়াড়রা কাঁদছিল। গ্যালারিতে মানুষ কাঁদছিল। এটা শুধু একটা ফুটবল ম্যাচের জয় ছিল না - ছিল ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো এক জাতির পুনর্জন্ম।

আর অন্যদিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন পুশকাস। চোখে বিষণ্নতা। বুকে ভাঙা স্বপ্ন।

হাঙ্গেরি হয়তো সেদিনের সেরা দল ছিল। কিন্তু ইতিহাস সবসময় সেরাদের মনে রাখে না - ইতিহাস মনে রাখে বিজয়ীদের।

বার্নের সেই সন্ধ্যাকে বলা হয় অলৌকিক ঘটনা। শুধু একটা ম্যাচ নয়, এটা ছিল মানুষের আশা আর হতাশার মহাকাব্য। যেখানে এক দল ট্রফি জিতেছিল, আরেক দল জিতেছিল অমরত্ব।

ফুটবল কেবল ঘাসের উপর গড়িয়ে চলা একটা বল নয়। এটা মানুষের কান্না। মানুষের অহংকার। মানুষের পুনর্জন্ম।

বার্নের সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় ফুটবল আরেকবার প্রমাণ করল - সবচেয়ে গভীর পরাজয়ের বুক থেকেই জন্ম নেয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয়।

Advertisement

Advertisement

ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬


আরও পড়ুন

সম্পর্কিত খবর

বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার কী হয়েছিল? মুখ খুললেন মেসি

বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার কী হয়েছিল? মুখ খুললেন মেসি

চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে আরও এক ফিফা বিশ্বকাপ জিতল স্পেন

চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে আরও এক ফিফা বিশ্বকাপ জিতল স্পেন

‘নতুন যুগেও’ পুরোনো জার্মানি, এবার হারল গ্রিসের কাছে

নেশনস লিগ ‘নতুন যুগেও’ পুরোনো জার্মানি, এবার হারল গ্রিসের কাছে

ক্লপ-জাভির অভিষেকে জার্মানিকে রুখে দিলো নেদারল্যান্ডস

ক্লপ-জাভির অভিষেকে জার্মানিকে রুখে দিলো নেদারল্যান্ডস

ইতালির ৩ বার বিশ্বকাপে খেলতে না পারা নিয়ে মুখ খুললেন কোচ

ইতালির ৩ বার বিশ্বকাপে খেলতে না পারা নিয়ে মুখ খুললেন কোচ

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পর বিশ্বকাপ ফাইনালও আয়োজন করতে চায় বার্সেলোনা

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পর বিশ্বকাপ ফাইনালও আয়োজন করতে চায় বার্সেলোনা

আরও পড়ুন

টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দশে নাসুম-মেহেদী, শ্রেয়াসেরও বড় লাফ

টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দশে নাসুম-মেহেদী, শ্রেয়াসেরও বড় লাফ

মেসির বিদায়ে অশ্রুসজল এনজো সামনে এলো ২০১৫ সালে লেখা সেই চিঠি

সামনে এলো ২০১৫ সালে লেখা সেই চিঠি

যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলে ডাক পেলেন পাকিস্তানের সাবেক যুব অধিনায়ক

যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলে ডাক পেলেন পাকিস্তানের সাবেক যুব অধিনায়ক

‘একা ম্যাচ জেতানো খেলোয়াড়টি আর দলের সঙ্গে নেই’ —ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত স্কালোনি

‘একা ম্যাচ জেতানো খেলোয়াড়টি আর দলের সঙ্গে নেই’ —ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত স্কালোনি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম