Logo
Logo
×

Advertisement

খেলা

২০১৮ বিশ্বকাপ

রাশিয়ার বরফ ঢাকা ফুটবলের মঞ্চে ফ্রান্সের উত্থান, মেসির নিঃসঙ্গতা

Advertisement

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

রাশিয়ার বরফ ঢাকা ফুটবলের মঞ্চে ফ্রান্সের উত্থান, মেসির নিঃসঙ্গতা

২০১৮ বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলে নিয়েছিল তরুণদের ফ্রান্স

Advertisement

রাশিয়ার বিশাল ভূখণ্ডে ২০১৮ সালের গ্রীষ্মটা ছিল অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতির সময়। বরফের ইতিহাস আর আধুনিক শহরের কাচঘেরা স্কাইলাইন একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসবকে বরণ করে নিতে। মস্কোর লুঝনিকি থেকে শুরু করে সাইবেরিয়ার দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা শহরগুলোর দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল পুরো দেশটাই যেন এক বিশাল স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে। এই বিশ্বকাপ ছিল শুধু খেলাধুলার আয়োজন নয়, ছিল এক ধরনের বৈশ্বিক নাট্য, যেখানে প্রতিটি ম্যাচ লিখছিল নতুন অধ্যায়, আর প্রতিটি মুহূর্ত বদলে দিচ্ছিল ইতিহাসের মানচিত্র।

উদ্বোধনী দিনেই সেই নাটকের প্রথম দৃশ্য উন্মোচিত হয়। স্বাগতিক রাশিয়া সৌদি আরবের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল অনিশ্চয়তার চাপ নিয়ে। কিন্তু ম্যাচ শুরু হতেই সেই চাপ উড়ে যায় উল্লাসের ঝড়ে। একের পর এক গোল, দ্রুত আক্রমণ আর স্টেডিয়ামের প্রতিটি কোণায় লাল রঙের উন্মাদনা মিলিয়ে ৫-০ ব্যবধান কেবল স্কোরলাইন ছিল না, ছিল স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার ঘোষণা। সেই ম্যাচ যেন বলে দিয়েছিল রাশিয়া এখানে কেবল আয়োজক নয়, তারা গল্পের অংশ হতে এসেছে।

তবে বিশ্বকাপের প্রকৃত ঝড় শুরু হয় গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ধাপ থেকে। আর্জেন্টিনার অবস্থা তখন একেবারে ভঙ্গুর। লিওনেল মেসির কাঁধে পুরো জাতির স্বপ্ন, কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন প্রতিটি ম্যাচে ভার হয়ে নামছিল। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে মিস করা পেনাল্টি ছিল চাপের প্রতীক। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের হার আর্জেন্টিনার কাঠামোকে নাড়িয়ে দেয় ভিতর থেকে। সেই ম্যাচে যেন হারেনি শুধু দল, হারিয়ে গিয়েছিল আত্মবিশ্বাস, হারিয়ে গিয়েছিল ছন্দ।

নাইজেরিয়ার বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে আর্জেন্টিনা যখন বাঁচার লড়াইয়ে নামে, তখন পুরো দল যেন এক শেষ সুযোগের ভেতর দিয়ে হাঁটছিল। মেসির গোল, রোহো’র শেষ মুহূর্তের সেই উদ্ধার আর পুরো স্টেডিয়ামের নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া মিলিয়ে সেই ম্যাচ ছিল এক আবেগঘন নাটক। কিন্তু সেই বাঁচা কেবল অস্থায়ী। শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের বিপক্ষে এসে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় এক ঝলকে। এমবাপ্পের গতি, ফ্রান্সের তরুণ শক্তি আর আর্জেন্টিনার ভেঙে পড়া রক্ষণ মিলিয়ে ৪-৩ ব্যবধানের ম্যাচটি হয়ে ওঠে এক যুগের বিদায়ঘণ্টা। মেসি তখনও খেলছিলেন, কিন্তু চারপাশের পৃথিবী যেন তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল।

অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প। লুকা মদ্রিচের নেতৃত্বে তারা খেলছিল এমন এক ফুটবল, যেখানে জোর নয়, ছিল বুদ্ধিমত্তা। ক্লান্তি নয়, ছিল নিয়ন্ত্রণ। প্রতিটি ম্যাচে তারা যেন লড়ছিল সময়ের বিরুদ্ধে, আবার নিজেদের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধেও। ডেনমার্কের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়, তারপর স্বাগতিক রাশিয়ার বিপক্ষে আরেকটি নাটকীয় পেনাল্টি যুদ্ধ সবকিছুই তাদের মানসিক শক্তির পরীক্ষা ছিল। মদ্রিচ শুধু পাস দিচ্ছিলেন না, তিনি যেন পুরো দলের হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।

ইংল্যান্ড তখন দীর্ঘ শীতঘুম ভেঙে জেগে উঠছে। বহু বছরের ব্যর্থতার ভার কাঁধ থেকে নামিয়ে তারা পৌঁছে গিয়েছিল সেমিফাইনালে। হ্যারি কেইন ছিলেন গোলমেশিন, দলের আত্মবিশ্বাসের কেন্দ্র। পেনাল্টি শুটআউটে কলম্বিয়ার বিপক্ষে জয় ইংল্যান্ডকে নতুন করে স্বপ্ন দেখায়। মনে হচ্ছিল হয়ত এবার ফুটবল ফিরছে বাড়িতে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ থেমে যায় ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। ত্রিপিয়েরের ফ্রি কিক দিয়ে শুরু হওয়া ম্যাচ শেষ পর্যন্ত গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে, যেখানে মানজুকিচের গোল ইংল্যান্ডের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটায়। স্টেডিয়ামে তখন ইংলিশদের নীরবতা ছিল সবচেয়ে ভারী শব্দ।

ফ্রান্স ছিল পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল। তাদের খেলা ছিল এক ধরনের আধুনিক সংগীতের মতো, যেখানে প্রতিটি যন্ত্র আলাদা হলেও মিলিতভাবে তৈরি করছিল শক্তিশালী সুর। দিদিয়ের দেশম দলকে গড়ে তুলেছিলেন এমনভাবে, যেখানে প্রতিভা ছিল স্বাধীন, কিন্তু কাঠামো ছিল শক্ত। পগবার নিয়ন্ত্রণ, কান্তের পরিশ্রম, গ্রিজমানের সৃজনশীলতা আর এমবাপের বিস্ফোরণ মিলিয়ে ফ্রান্স ছিল এক ভয়ংকর সমন্বয়।

বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ছিল টানটান উত্তেজনার লড়াই। দুই দলই খেলছিল আক্রমণাত্মক ফুটবল, কিন্তু ফ্রান্স এক মুহূর্তের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যায়। উমতিতির হেডে করা গোলটি ছিল ছোট, কিন্তু তার গুরুত্ব ছিল বিশাল। সেই এক মুহূর্তেই বেলজিয়ামের স্বপ্ন ভেঙে পড়ে। ডি ব্রুইনে, হ্যাজার্ড, লুকাকু সবাই ছিলেন, কিন্তু ফ্রান্সের সংগঠিত রক্ষণ তাদের থামিয়ে দেয়।

অন্য সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়া আবারও লিখে ফেলে এক অবিশ্বাস্য গল্প। ইংল্যান্ড প্রথমে এগিয়ে গেলেও ক্রোয়েশিয়া ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়। মদ্রিচের ক্লান্ত পায়ে তখনও ছিল অদ্ভুত এক শক্তি। পেরিসিচের গোল ম্যাচকে সমতায় ফেরায়, আর অতিরিক্ত সময়ে মানজুকিচ ইংল্যান্ডের সব আশা শেষ করে দেন। সেই রাতের পর ইংল্যান্ড শুধু হেরে যায়নি, তারা আবারও শিখেছিল অপেক্ষার কঠিন বাস্তবতা।

ফাইনালের দিন মস্কো ছিল এক বিশাল আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। ফ্রান্স আর ক্রোয়েশিয়া দুই ভিন্ন ইতিহাস, দুই ভিন্ন মানসিকতা, কিন্তু একটাই লক্ষ্য। শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় ফ্রান্স। প্রথম গোল আসে আত্মঘাতীভাবে, যা ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। এরপর গ্রিজমানের পেনাল্টি, পগবার দূরপাল্লার শট আর এমবাপ্পের তরুণ বিস্ফোরণ ধীরে ধীরে ম্যাচ ফ্রান্সের দিকে নিয়ে যায়।

ক্রোয়েশিয়া হার মানেনি সহজে। মদ্রিচ শেষ পর্যন্ত লড়েছেন, পেরিসিচ আক্রমণ চালিয়েছেন, আর মানজুকিচ প্রতিপক্ষের ভুল কাজে লাগিয়েছেন। কিন্তু ফ্রান্সের শক্তি ছিল এতটাই সংগঠিত যে শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই থেমে যায়। ৪-২ ব্যবধানে শেষ হয় ফাইনাল, আর ফ্রান্স দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

শেষ বাঁশির পর লুঝনিকির আকাশে যে দৃশ্য তৈরি হয়েছিল তা শুধু একটি দেশের জয় ছিল না। ছিল এক নতুন প্রজন্মের আগমন। এমবাপ্পে তখন পুরো বিশ্বের নজরে একজন কিশোর, যিনি ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি হয়ে উঠেছেন। মদ্রিচ ছিলেন পরাজিত হলেও সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়া এক যোদ্ধা, যিনি পরে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন।

Advertisement

Advertisement

ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬


আরও পড়ুন

সম্পর্কিত খবর

সেই ইতালিকে এবারও হারানো হলো না জিদানের ফ্রান্সের

সেই ইতালিকে এবারও হারানো হলো না জিদানের ফ্রান্সের

২০ বছর পর মুখোমুখি ইতালি-জিদান, সেই ‘ঢুস’ নিয়ে নেই অনুশোচনা

২০ বছর পর মুখোমুখি ইতালি-জিদান, সেই ‘ঢুস’ নিয়ে নেই অনুশোচনা

৩২ বছরে যা হয়নি, সে রেকর্ড গড়ে দেখালেন জিদান

৩২ বছরে যা হয়নি, সে রেকর্ড গড়ে দেখালেন জিদান

শেষ মুহূর্তের গোলে বেলজিয়ামকে হারিয়ে শীর্ষে ফ্রান্স

শেষ মুহূর্তের গোলে বেলজিয়ামকে হারিয়ে শীর্ষে ফ্রান্স

চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে আরও এক ফিফা বিশ্বকাপ জিতল স্পেন

চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে আরও এক ফিফা বিশ্বকাপ জিতল স্পেন

জিদানের প্রথম ম্যাচেই গোল করে চোটে পড়লেন এমবাপ্পে

জিদানের প্রথম ম্যাচেই গোল করে চোটে পড়লেন এমবাপ্পে

আরও পড়ুন

ভারত ৪-০ গোলে হারলেও মুগ্ধ দর্শকরা

ভারত ৪-০ গোলে হারলেও মুগ্ধ দর্শকরা

এশিয়ান গেমসে ব্যর্থ, লিটন কি অধিনায়কত্ব ছাড়বেন?

এশিয়ান গেমসে ব্যর্থ, লিটন কি অধিনায়কত্ব ছাড়বেন?

সোনা জিততে গিয়ে হারালেন ব্রোঞ্জ, অজুহাত খাবারে

সোনা জিততে গিয়ে হারালেন ব্রোঞ্জ, অজুহাত খাবারে

চণ্ডীগড়ে ভারতের রেকর্ড, লজ্জা এড়াতে ভাঙতে চায় উইন্ডিজ

চণ্ডীগড়ে ভারতের রেকর্ড, লজ্জা এড়াতে ভাঙতে চায় উইন্ডিজ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম