প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেই শেষ বত্রিশে উঠে এসেছে কেপ ভার্দে।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বকাপের নকআউটে ইতিহাস, পরিসংখ্যান, নামের জৌলুস অনেক সময় ৯০ মিনিটের সাহস, বিশ্বাস আর লড়াইয়ের কাছে হার মানে। সেখানেই মুখোমুখি হচ্ছে দুই ভিন্ন জগতের দুই দল। একদিকে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেই শেষ বত্রিশে উঠে আসা কেপ ভার্দে। এক পাশে বিশ্ব ফুটবলের দীর্ঘ ঐতিহ্য, অন্য পাশে অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্য গল্প। একদিকে লিওনেল মেসির শেষ দিকের বিশ্বকাপ অভিযানের আলো, অন্যদিকে আফ্রিকার ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্রের স্বপ্নের ডানা।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে দুই দলের অবস্থানও যেন দুই প্রান্তের। আর্জেন্টিনা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল দেশ। ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালে বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে আলবিসেলেস্তেরা। এছাড়া ১৯৩০, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে হয়েছে রানার্সআপ। শতাধিক বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে অর্ধশতাধিক জয়, ছয়টি ফাইনাল এবং অসংখ্য নকআউট জয়ের গৌরব নিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম পরাশক্তি তারা।
অন্যদিকে কেপ ভার্দের ইতিহাসটা একেবারেই নতুন। চলতি বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো মূল পর্বে জায়গা করে নেয় দেশটি। প্রথম অংশগ্রহণেই গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে শেষ বত্রিশে উঠে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে তারা। এই ম্যাচ আরেকটি নকআউট লড়াই নয়, কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও।
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই নিজেদের শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গ্রুপ ‘জে’-তে তিন ম্যাচের তিনটিতেই জয় পেয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩–০ গোলে হারানোর পর দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ২–০ গোলে হারিয়ে তারা নকআউট নিশ্চিত করে। শেষ ম্যাচে জর্ডানকে ৩–১ গোলে হারিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপসেরা হয় আর্জেন্টিনা। তিন ম্যাচে ৮ গোল করেছে, হজম করেছে মাত্র ১টি। বলের দখল, আক্রমণ গড়া, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণ সব বিভাগেই ছিল তাদের আধিপত্য।
এই যাত্রার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও তার ফুটবলের জাদু ম্লান হয়নি। গ্রুপ পর্বে ৬ গোল করে তিনি গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষে আছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে করেছিলেন দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। বড় ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি মাঝমাঠে নেমে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কাজও করে যাচ্ছেন তিনি।
মেসির পাশাপাশি দারুণ ছন্দে আছেন লাউতারো মার্তিনেজ। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করার পর জর্ডানের বিপক্ষেও পেনাল্টি থেকে জালের দেখা পেয়েছেন। মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার পুরো দলের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করছেন। রক্ষণে ক্রি রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজ প্রতিপক্ষকে খুব কম সুযোগ দিয়েছেন। আর গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ তিন ম্যাচে মাত্র একবার বল কুড়িয়েছেন নিজের জাল থেকে।
নকআউটের আগে সতর্ক স্কালোনি। আর্জেন্টিনা কোচের কথা, ‘নকআউটে কোনো প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কেপ ভার্দে প্রমাণ করেছে তারা এখানে কাকতালীয়ভাবে আসেনি। আমাদের সর্বোচ্চ মনোযোগ নিয়েই খেলতে হবে।’
একই সুর শোনা গেছে অধিনায়ক মেসির কণ্ঠেও, এখানে একটি ভুলই সবকিছু বদলে দিতে পারে। আমাদের শান্ত থাকতে হবে, নিজেদের ফুটবল খেলতে হবে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
চলতি আসরে সবচেয়ে বড় রূপকথাগুলোর একটি লিখছে কেপ ভার্দে। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসেই তারা শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিয়েছে। গ্রুপ ‘এইচ’-এ স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু। এরপর শক্তিশালী উরুগুয়ের বিপক্ষে ২–২ গোলে সমতা এনে সবাইকে চমকে দেয়। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে ০–০ গোলে ড্র করে ৩ পয়েন্ট নিয়ে নকআউটে উঠে ইতিহাস গড়ে তারা। তিন ম্যাচে মাত্র ২ গোল করেছে, আবার হজমও করেছে মাত্র ২টি। এই সাফল্যের ভিত্তি তাদের দুর্দান্ত রক্ষণভাগ এবং অদম্য লড়াই।
কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় নায়ক গোলরক্ষক ভোজিনহা। ৪০ বছর বয়সি এই অভিজ্ঞ গোলকিপার স্পেনের বিপক্ষে সাতটি অসাধারণ সেভ করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষেও তার দৃঢ়তা দলকে টিকিয়ে রেখেছে। ইতোমধ্যেই তিনি চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলকিপারদের একজন হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছেন।
অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস আক্রমণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মাঝমাঠে কেভিন পিনা দলের ভারসাম্য ধরে রেখেছেন। রক্ষণে পিকো লোপেস ও তার সতীর্থরা অসাধারণ দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। উরুগুয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২–২ সমতায় ফেরাটা কেপ ভার্দের মানসিক শক্তির বড় প্রমাণ।
ম্যাচের আগে কেপ ভার্দে কোচ বুবিস্তা বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। কিন্তু নকআউটে ভয় নিয়ে মাঠে নামলে কোনো সুযোগ থাকে না। আমরা নিজেদের ফুটবল খেলতে চাই।’
গোলকিপার ভোজিনহার কণ্ঠেও আত্মবিশ্বাস, ‘আমরা জানি আর্জেন্টিনা কতটা শক্তিশালী দল। কিন্তু মাঠে নামার পর নাম নয়, পারফরম্যান্সই সবকিছু। আমরা ভয় নিয়ে খেলতে আসিনি। নিজেদের সামর্থ্যে বিশ্বাস আছে। শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত আমরা লড়াই করে যাব।’
পরিসংখ্যান বলছে আর্জেন্টিনা স্পষ্ট ফেবারিট। পূর্ণ ৯ পয়েন্ট, ৮ গোল, মাত্র ১ গোল হজম এবং দুর্দান্ত ছন্দে থাকা মেসিকে নিয়ে তারা শিরোপা ধরে রাখার অন্যতম দাবিদার। অন্যদিকে কেপ ভার্দে মাত্র ৩ পয়েন্ট নিয়েই দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে শুধু জয়ের সংখ্যাই সব নয়; কখনও কখনও লড়াই আর বিশ্বাসও ইতিহাস লেখে।
দুই দলের এর আগে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়নি। তাই বিশ্বকাপের এই নকআউটেই প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হবে তারা। নতুন এক ইতিহাসের সূচনা হবে এই ম্যাচ দিয়েই।
কৌশলগতভাবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হবে আর্জেন্টিনার বলের নিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে কেপ ভার্দের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণ। স্কালোনির দল দীর্ঘ সময় বল নিজেদের দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে চাইবে। অন্যদিকে কেপ ভার্দে অপেক্ষা করবে সুযোগের, তারপর গতির ঝড় তুলে আঘাত হানার চেষ্টা করবে।
কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ের চেয়েও এই ম্যাচের গুরুত্ব অনেক বেশি। এটি একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার অভিযান, অন্যদিকে প্রথম বিশ্বকাপেই রূপকথা লিখে ফেলা এক ছোট্ট দেশের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম।


