পদক নয়, তারা বাংলাদেশের স্বপ্নের দূত
Advertisement
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কমনওয়েলথ গেমস শেষ হলে পৃথিবী প্রথমে পদকের হিসাব করে। কতটি স্বর্ণ, কতটি রুপা, কতটি ব্রোঞ্জ?পদক তালিকার সংখ্যাই হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্র। প্রতিটি গেমসের আড়ালে থেকে যায় আরও কিছু গল্প। সেই গল্পে থাকে না ঝলমলে মঞ্চ, থাকে না বিজয়ের সুর। থাকে ঘাম, অপেক্ষা, লড়াই আর একটি দেশের পতাকা বুকে নিয়ে এগিয়ে চলার সাহস।
গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের ১৫ ক্রীড়াবিদের কেউ পদকের মঞ্চে উঠতে পারেননি, কেউ ফাইনালের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি, কিন্তু প্রত্যেকেই লিখেছেন বাংলাদেশের ক্রীড়ার এক একটি অধ্যায়। তাদের কাছে গ্লাসগো ছিল নিজেদের প্রমাণ করার মঞ্চ।
ইংল্যান্ডপ্রবাসী স্প্রিন্টার ইমরানুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তাঁর সঙ্গে ট্র্যাকে ছিলেন শিরিন আক্তার, স্বপ্না খাতুন, লুশাদ ইসলাম ও নাজিমুল হোসেন রনি।
পুরুষদের ৪০০ মিটারে লুশাদ ইসলাম স্কটস্টাউন স্টেডিয়ামের ট্র্যাকে ৪৯.৭৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে গড়েছেন চলতি মৌসুমের সেরা টাইমিং। হিটে ষষ্ঠ হলেও এই পারফরম্যান্স তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
বক্সিং রিংয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আশা ছিলেন রাকিব হোসেন। ৫৫ কেজি ব্যান্টামওয়েট বিভাগে তাঁর প্রতিটি ঘুষির সঙ্গে ছিল দেশের মানুষের প্রত্যাশা। দ্বিতীয় রাউন্ডে পাপুয়া নিউগিনির মাইকেল ইনোইনোকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিলেন তিনি। পদক থেকে মাত্র এক জয় দূরে ছিলেন রাকিব। শেষ আটের লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়ার ডিক্সন জেইয়ের কাছে হারলেও তাঁর সাহসী লড়াই মনে রাখার মতো।
বক্সিং দলে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী জিন্নাত ফেরদৌস ও মো. রুহিন রেজা। রুহিন ৬০ কেজি বিভাগে রাউন্ড অব ১৬ পর্যন্ত লড়েছেন। ফলাফল তাঁদের পক্ষে যায়নি, তবে আন্তর্জাতিক রিংয়ের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য বড় সম্পদ হয়ে থাকবে।
টলক্রস ইন্টারন্যাশনাল সুইমিং সেন্টারের নীল জলে বাংলাদেশের হয়ে লড়েছেন সোনিয়া আক্তার, কাজল মিয়া ও সামিউল ইসলাম রাফি। পানির মধ্যে ছিল নিজেদের সীমাকে অতিক্রম করার চেষ্টা। রাফি ৫০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে ২৫.২৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত সেরা রেকর্ড গড়েছেন। নিজের হিটে দ্বিতীয় হয়েছেন।
জিমন্যাস্টিকসে শিশির আহমেদ, রাজিব চাকমা ও আবু সাঈদ রাফির জন্য গ্লাসগো ছিল বিশ্বের সেরা জিমন্যাস্টদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ। জিমন্যাস্টিকসে প্রতিটি মুহূর্তে নিখুঁত হতে হয়। একটি ছোট ভুলও বদলে দেয় পুরো ফলাফল। তারপরও তাঁরা দাঁড়িয়েছেন, বাংলাদেশের পতাকা বহন করেছেন।
সীমিত সুযোগ-সুবিধা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার স্বল্পতা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবের বাধা পেরিয়েই তাঁরা লাল-সবুজ জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছেন।
বিশ্বের অনেক দেশের অ্যাথলেট বছরের পর বছর আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, উন্নত প্রযুক্তি ও বড় বাজেটের সহায়তা পান। বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের অনেকেই সেই সুযোগের বাইরে থেকেও স্বপ্ন আঁকড়ে রাখেন। ভোরের অনুশীলন, পরিবারের প্রত্যাশা, নিজের সঙ্গে লড়াইকে পেছনে ফেলে তাঁরা দাঁড়ান আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
কমনওয়েলথ গেমসে পদক জিতেছেন হাতে গোনা কয়েকজন। একটি দেশের ক্রীড়ার ভবিষ্যৎ তৈরি হয় এমন অনেক মুখের হাত ধরে। আজ যারা পদক পাননি, তাঁদের মধ্য থেকেই আগামী দিনের কোনো চ্যাম্পিয়নের জন্ম হবে।
গ্লাসগোর স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাবে। দর্শকেরা ঘরে ফিরে যাবেন। পদক তালিকা ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবে। বাংলাদেশের এই ১৫ ক্রীড়াবিদের লড়াই থেকে যাবে স্মৃতিতে।
সব বিজয় গলায় ঝোলানো পদকে মাপা যায় না। কিছু বিজয় থাকে সাহসে, কিছু থাকে স্বপ্ন ধরে রাখায়, আর কিছু থাকে হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও দেশের পতাকা উঁচু করে ধরার মধ্যে।
গ্লাসগোতে তারা পদক জিততে পারেননি। তবে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা লড়তে জানেন, স্বপ্ন দেখতে জানেন। তাঁরাই বাংলাদেশের গর্ব।

