প্যারিসে ‘লুট’ বার্সেলোনার আত্মবিশ্বাস
Advertisement
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুনীল গঙ্গোপধ্যায় এই দেশটিকে বলেছিলেন ‘ছবির দেশ, কবিতার দেশ’। তবে এখন সেখানে গেলে দৃশ্যটা চোখে পড়বে সামান্যই। ফ্রান্স, বিশেষ করে এখন প্যারিস এখন দাঙ্গার শহর, সেখানে ২ বিশ্বযুদ্ধেও অক্ষত টিকে যাওয়া লিমোজের বিখ্যাত নান্দনিক স্থাপনা ‘টাউন হল’ পুড়ে গেছে দাঙ্গার আগুনে, লুট হয়ে যাচ্ছে শতশত দোকানপাট আরও কত কী! ছবির দেশ, কবিতার দেশ এখন ‘আগুনের দেশ, লুটের দেশ’ও।
সেই শহরে গেল রাতে পুড়ে গেল, লুট হয়ে গেল আরও একটা বিষয়। গেল আগস্ট থেকে কোচ হানসি ফ্লিক তিলে তিলে যে আত্মবিশ্বাসটা তৈরি করেছিলেন বার্সেলোনার, সেটা ‘লুট’ হয়ে গেছে প্যারিসের পার্ক দে প্রাসে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে পিএসজি ৪-২ গোলে হারিয়ে দিয়েছে কাতালানদের।
ম্যাচের আগে বার্সেলোনার পরিস্থিতিটা দেখুন। ১১ ম্যাচে করেছিল ৪৯ গোল, সবকটিতেই যে জিতেছে তা বলাই বাহুল্য। তবে এই পরিসংখ্যানের অপর পিঠে একটা বাস্তবতাও ছিল দলটির, যা হয়তো অগ্রাহ্য করেছেন অনেকেই। সেটা হলো বার্সেলোনার ক্লিন শিট রাখতে পারার ব্যর্থতা। শুরুর ৪ ম্যাচে ৩টি ক্লিনশিট রাখার পর সবশেষ ৭ ম্যাচে গোল হজম ঠেকাতে পেরেছে মোটে ১ ম্যাচে। যে ৭ ম্যাচে গোল হজম করেছে, সেসব ম্যাচে ১১ বার বার্সার জালে বল জড়িয়েছে।
সেসব বাদ দিন, সবশেষ রিয়াল বেতিস ম্যাচটার কথাই ভাবুন। বার্সেলোনার রক্ষণ যখন বারেবারে ভাঙছিলেন ভালেন্তিন গোমেজ, আবদে এজাজুলিরা, অশনিসংকেতটা তখনি বেজে উঠছিল, কাতালানরা হয়তো তা তখন শুনতেই পায়নি।
পেল গেল রাতে। দুই দলেই চোট সমস্যা ছিল। চোটের কারণে বার্সা পায়নি এরিক গার্সিয়া কিংবা জুল কুন্দের মতো ডিফেন্ডারদের, পিএসজি পায়নি নুনো মেন্দেজকে। পিএসজি ম্যাচ চলাকালেও ভুগেছে, রক্ষণ আর আক্রমণের ৩ বড় তারকাকে হারিয়েছে চোটের কাছে। ২০ মিনিটে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় উসমান দেম্বেলেকে, ৬০ মিনিটের মাথায় কভিচা কভারাৎশখেলিয়া আর মারকিনিয়োসকে হারাতে হয়েছে পিএসজিকে।
তবে এরপরও টানা দুই বারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা সুতোয় একটুও ঢিল দেয়নি। বার্সেলোনা তাদের সহজাত খেলাটা খেলতে পেরেছে মোটে দুই অর্ধের শুরুতে ২০ আর ২০ ৪০ মিনিট। বাকি সময়ে ছড়ি ঘুরিয়েছে, গোল করে ম্যাচ নিজেদের করে নিয়েছে পিএসজি।
৩৮ মিনিটে বক্সের জটলা থেকে গোল করে বার্সার রক্ষণ ভাঙার শুরুটা করেছিলেন দেজিরে দুয়ে। দেম্বেলে, কভারাৎশখেলিয়াদের ভিড়ে যাকে অনেকটা আড়ালেই পড়ে থাকতে হয়। তার আগে বার্সেলোনা সুযোগ পেয়েছে এক গাদা, কিন্তু কাজে লাগানো হয়নি। চোট নিয়ে মাঠ ছাড়ার আগে দানি অলমো সহজ সুযোগ নষ্ট করেছেন, বদলি হিসেবে নামা ফেরমিন লোপেজও সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে শাভি এসপার্ত যখন সুযোগ পেলেন, মিস করলেন না। রাইটব্যাক হিসেবে নেমেছিলেন যা তার সহজাত জায়গা নয়, সেখানে তিনি স্বাক্ষর রেখেছেন, আক্রমণে উঠে এসেও দলকে রক্ষায় সাহায্য করছিলেন। ফেরমিনের পাস থেকে তিনিই গোল করে সমতায় ফেরান বার্সাকে।
এরপর থেকে আবারও পিএসজির দাপট শুরু। ফেররান তরেস শুরুর অর্ধে সুযোগ খুইয়েছেন ২টি, দ্বিতীয়ার্ধে তার শট গিয়ে লাগে ক্রসবারে। স্তবে শেষ পর্যন্ত পিএসজি গোল পায় কর্নার থেকে। লুকাস এর্নান্দেজের দারুণ হেডার গিয়ে আছড়ে পড়ে জালে।
লামিন ইয়ামাল এর একটা জবাব দিয়েছিলেন মিনিট সাতেক পর। ৭৯ মিনিটে বদলি ডিফেন্ডার ওয়ারেন জাইরে এমেরিকে ফাঁকি দিয়ে পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে এক টোকায় বলটা যখন জালে জড়ালেন, তখন মনে হচ্ছিল একটা পয়েন্ট অন্তত নিয়ে প্যারিস ছাড়ছে বার্সা, কিন্তু না, পরিস্থিতিটা বদলে গেল একটু পরই।
চলতি মৌসুমে হজম করা ১১ গোলের ৪টি বার্সেলোনা খেয়েছে নিজেরা গোল করার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে। অর্থাৎ গোল করার পর দলটার মনে মগজে যেন একটু আয়েশি ভাব চলে আসে মনের অজান্তেই। প্যারিসিয়ানরা বার্সাকে ‘লুট’ করতে বেছে নিল সেই সময়টাকেই। বক্সের বাইরে থেকে আসা বল বুক দিয়ে রিসিভ করে মাটিতে পড়ামাত্রই দারুণ এক শট নেন ভিতিনিয়া, সেটাই হোয়ান গার্সিয়াকে ফাঁকি দিয়ে জড়াল জালে।
এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল স্কোরলাইনটা। শেষ ২ বারের চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে সামর্থ্যের পুরোটা দিলেও ঘাটতি থেকে যায় অনেকটাই। কিন্তু বিষয়টা এর চেয়েও বিগড়ে গেল সে গোলের মিনিট পাঁচেক পর। ডান পাশ থেকে আক্রমণে উঠে আসছিলেন আশরাফ হাকিমি, তার ক্রস জোয়াও কানসেলোকে ফাঁকি দিয়ে দখলে নেন ফাবিয়ান রুইজ, বল জালে জড়িয়ে বার্সাকে পরান ৪ গোলের মালা।
লড়াইটা যখন দুই ‘সমশক্তি’র দলের, তখন স্কোরলাইন হিসেবে ৪-২ বেশ বেমানান। বার্সেলোনা গেল রাতে সেটাই হজম করতে হয়েছে। ১১ ম্যাচে ৪৯ গোল করে আসা দলটার আত্মবিশ্বাসেও ভালোভাবেই দাগ কেটে যাবে এই ফলাফল।
তবে দলটার কঠিন পরীক্ষা এখানেই শেষ নয় অবশ্য। পরের ম্যাচটাই এল ক্লাসিকো। প্যারিসে ‘লুট’ হয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস সে ম্যাচের আগে কীভাবে ফেরাবে বার্সেলোনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

