‘স্মার্টফোন ছাড়ার সিদ্ধান্ত আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে’
Advertisement
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমান যুগে স্মার্টফোন ছাড়া যখন জীবন চলেই না? ঠিক সেই সময় বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছেন নিউ ইয়র্কের দৃশ্যশিল্পী ও প্রযুক্তি সচেতন সমাজকর্মী আগস্ট লাম। তার লেখা নতুন বই ‘ইউ ডোন্ট নিড এ স্মার্টফোন: এ প্র্যাকটিক্যাল গাইড টু ডাউনগ্রেডিং ইউর ফোন অ্যান্ড আপগ্রেডিং ইউর লাইফ’-এ তিনি দেখিয়েছেন, প্রযুক্তিকে কিছুটা দূরে সরিয়ে সাধারণ একটি বাটনফোন ব্যবহার করার সুফল এতই বেশি যে, সামান্য কিছু ঝামেলার কথা অনায়াসেই ভুলে থাকা যায়।
এমনকি লাম মনে করেন, স্মার্টফোন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত তার জীবনটাই বদলে গেছে।
কাজের চেয়ে স্ক্রিনেই বেশি সময় কেটে যাচ্ছিল, একটা সময় নিজেকে স্মার্টফোনে আসক্ত মনে হতে শুরু করে আগস্টের। নিজের সৃজনশীলতাকে ধরে রাখতে ২০২২ সালে ২৭তম জন্মদিনের পরপরই জীবনের বড় এই সিদ্ধান্ত নেন—বিদায় জানান স্মার্টফোনকে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বইটি লিখেছেন তিনি। সেখানে একদিকে যেমন আছে স্মার্টফোন বর্জনের জোরালো যুক্তি, তেমনি রয়েছে এই নতুন জীবনে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়, তার সহজ নির্দেশনা।
সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে লাম বলেন, স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে দেওয়ার পর প্রথম দিকে বেশ ভয় করছিল। ভেবেছিলাম স্মার্টফোন না থাকলে পরিচিত মানুষগুলোর থেকে দূরে সরে যাব, আবার নতুন কারও সঙ্গেও হয়তো আর দেখা-সাক্ষাৎ হবে না। কারণ অনলাইনে কোথায় কী অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেসব তো আর জানতে পারব না। কিন্তু সত্যি বলতে, স্মার্টফোন ছাড়ার পর দেখলাম আমার বন্ধুসংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কটাও আরও মজবুত ও নিবিড় হয়েছে।
এর একটি বড় কারণ হলো, প্রযুক্তি বা ডিভাইসে যখন আপনি মন না দিচ্ছেন, তখন মানুষের প্রতি আপনার মনোযোগ ও আন্তরিকতা এমনিতেই বেড়ে যায়। আপনি যখন কারো সঙ্গে থাকছেন, পুরোপুরিভাবেই সেখানে উপস্থিত থাকছেন। আর যখন একা থাকছেন, আপনার মন নিজের মতো করেই একা থাকা আর সামাজিক মেলামেশার স্বাভাবিক ছন্দটা ধরে ফেলছে।
কিন্তু কাছে একটা স্মার্টফোন থাকলে পুরো বিষয়টাই উলটে যায়। মানুষের ভিড়ে বসেও ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে আপনি মানসিকভাবে একা হয়ে পড়েন, আবার যখন সম্পূর্ণ একা থাকেন, তখনো ফোনের পর্দায় সামাজিক জীবন খুঁজতে যান। আমি দেখলাম, যখনই ফোনটা সরিয়ে রাখলাম, আমার শক্তি ও মনঃসংযোগ আরও কেন্দ্রীভূত হলো। আশপাশের মানুষও এই পরিবর্তনের খুব ইতিবাচক সাড়া দিতে শুরু করল।
প্রথমে একটু মানিয়ে নিতে কষ্ট হলেও পরে দেখা গেল, এটি অত্যন্ত সুন্দর এক চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢালাওভাবে সবাইকে জানানোর বদলে নির্দিষ্ট কোনো অনুভূতির খবর ব্যক্তিগতভাবে ভাগাভাগি করার একটা সুযোগ তৈরি হলো।
এ ছাড়া নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগও অনেক বেড়েছে। এখন কারও সঙ্গে দেখা হলে আর বলতে হয় না, ‘চলুন সোশ্যাল মিডিয়ায় একে অপরকে যুক্ত করে নিই।’ বরং সেখানেই তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, ‘আসুন আগামী সপ্তাহে এক জায়গায় বসে চা খাই’ কিংবা ‘আমার একটা অনুষ্ঠান আছে, আপনি আমন্ত্রিত।’ পরে আলাদা করে সময় বের করে মেসেজ দেওয়ার সেই ঝক্কি আর থাকছে না।
তিনি আরও বলেন, প্রথম প্রথম মনে হতে পারে আপনি যেন খাঁচায় বন্দি, আর কোনো সমস্যার সমাধান আপনার জানা নেই। দীর্ঘ এক বা দুই দশক পর হঠাৎ করেই যেন নিজের আসল মানসিক অনুভূতিগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এনালগ বা একদম সাধারণ পদ্ধতিতেই এর সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন মন খারাপ বা মানসিক চাপ হলে কোনো বন্ধুকে ফোন দেওয়া, কোনো বই খুলে বসা, একটু হাঁটাহাঁটি করা কিংবা গান শোনা। খালি জায়গাটা পূরণ করার একটা পথ ঠিকই বের হয়ে আসে, তবে একদম সুস্থ ও সুন্দর উপায়ে।
আর বড় কথা হলো- কোনো খারাপ অনুভূতি এলে এখন আর অত ভয় লাগে না। নিজের সঙ্গে এত সুন্দর একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে যে, মনে হয়—‘ঠিক আছে, খারাপ লাগছে লাগুক, আমি তো এর সঙ্গে পরিচিত!’
আগস্ট লাম বলেন, ধরুন, আমরা প্রতিদিন গড়ে পাঁচ ঘণ্টা ফোনে স্ক্রল করি। এখন স্ক্রল করা বন্ধ করলে সেই পাঁচ ঘণ্টা সময় কিন্তু আমাদের জীবনে সরাসরি ফিরে আসছে। এখন অনলাইন বিল না দিয়ে সরাসরি অফিসে গিয়ে বিল পরিশোধ করা, পোস্ট অফিসে যাওয়া বা বাস টিকিট প্রিন্ট করতে লাইব্রেরিতে যাওয়া—এই কাজগুলোতে নিশ্চয়ই পুরো পাঁচ ঘণ্টা লেগে যাবে না? মানুষ হয়তো এগুলোকে বেশ ঝামেলা মনে করে, কিন্তু বাস্তবে এতে খুব সামান্য সময় বেশি লাগে। বরং হেঁটে হেঁটে এসব জায়গায় গেলে কিছুটা শারীরিক ব্যায়াম হয়, মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয় এবং বাইরের পৃথিবীর স্বাদ পাওয়া যায়।
দিনের শেষে কিন্তু কেউ ভেবে বলে না, ‘আজ সারা দিন আমি অনলাইনে সময় নষ্ট করেছি।’ কারণ অপচয়টা হয় একটু একটু করে। একটা মেসেজের উত্তর দেওয়া, এরপরই চট করে খবরগুলো একবার দেখে নেওয়া—প্রতিদিন ৫০ বার এমন করলে দেখতে দেখতে কয়েক ঘণ্টা সময় এমনিতেই শেষ হয়ে যায়। এই সুযোগটা বন্ধ করে দিলেই বাড়তি সব সময় নিজের হাতের মুঠোয় চলে আসে।
এই একটা সিদ্ধান্ত আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে। কাজের খুব চাপ থাকলেও দিনশেষে নিজের জন্য কয়েক ঘণ্টা সময় আমি ঠিকই বের করে নিতে পারি। ডিভাইস কাছে থাকার সময় যে সার্বক্ষণিক অস্থিরতা আর প্যানিক বা ভয় কাজ করত, তা এখন একেবারেই নেই। আমরা সবাই নিজেদের অনেক ব্যস্ত ভাবি, কিন্তু আমার মনে হয় এই ভাবনাটাকে এখন একটু প্রশ্নবিদ্ধ করার সময় এসেছে।
স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়ার বুদ্ধি কি আগের চেয়ে বেশি শানিত মনে হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে এই তরুণ বলেন, মানুষের স্বাভাবিক দক্ষতাগুলো খুব দ্রুতই আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসে। এর জন্য আলাদা করে কোনো প্রশিক্ষণের দরকার হয় না। মানুষ হিসেবে প্রকৃতিগতভাবেই আমরা যেকোনো তথ্য মনে রাখতে এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে শিখতে পারদর্শী। এমনকি যাদের মনে রাখার ক্ষমতা দুর্বল, মনসংযোগে সমস্যা আছে কিংবা দিক চেনার হাত কাঁচা, তাদের ক্ষেত্রেও কিন্তু একই কথা প্রযোজ্য।
দিক বা তথ্য মনে রাখার এই সক্ষমতা মূলত বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক মৌলিক আদিম দক্ষতা। আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবেই বিবর্তিত হয়েছে। কাগজ-কলম কিংবা লেখার চল শুরু হওয়ার হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানুষের ব্রেন সবকিছু মনে রাখা ও দিক চিনতে পারার কাজে ভীষণ পারদর্শী ছিল।
স্মার্টফোন ছেড়ে দিয়ে যখন নিজের ওপর ভরসা রাখতে শুরু করলাম, নিজের মানসিক সক্ষমতা দেখে আমি নিজেই তাজ্জব হয়ে গিয়েছি! যারা স্মার্টফোন ছেড়েছেন, তাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা ঠিক একই রকম।
মনোযোগ বিভক্ত হওয়া মানেই বর্তমান মুহূর্ত থেকে ছিটকে যাওয়া। বাস্তবে উপস্থিত থাকার অর্থ হলো—আপনি এখন যে অবস্থায় আছেন, তাতেই পুরোপুরি শান্ত থাকা। অন্য মুহূর্তের সঙ্গে এর তুলনা না করা, কোনো কিছু দিয়ে এই মুহূর্তটাকে জোর করে ভরিয়ে তোলার চেষ্টা না করা, কিংবা সময় অপচয় হচ্ছে ভেবে অহেতুক ছটফট না করা।
স্মার্টফোন ছাড়া যাদের একদিনও চলবে না- এমন মনোভাব পোষণকারীদের উদ্দেশে লামের পরামর্শ হলো- অন্তত একবারের জন্য হলেও স্মার্টফোন ছাড়া থাকার একটা পরীক্ষা চালিয়ে দেখুন না! সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত এক মাস বোতামফোন ব্যবহার করে দেখুন কেমন লাগে। কারণ আপনি তো চেষ্টা করেই দেখেননি, চেষ্টা না করে কী হবে না হবে তা আগেভাগে বলবেন কীভাবে?
আর হ্যাঁ, চিকিৎসার প্রয়োজনে যদি রক্তের শর্করা (গ্লুকোজ) মাপার মতো কোনো অ্যাপের জন্য স্মার্টফোন রাখতেই হয়, তবে সে ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ থাকবে—সরাসরি যোগাযোগের জন্য একটা বোতামফোন বা সাধারণ ফোন ব্যবহার করুন। আর স্মার্টফোনটিকে ব্যবহার করুন স্রেফ একটা ডিজিটাল মেডিকেল ডিভাইস হিসেবে!


