ট্রেনের ৭০ ইঞ্জিন কেনায় আর কত অপেক্ষা
৯ বছরে তিনবার দরপত্র আহ্বান * ২৮০ ইঞ্জিনের ১৯৫টিই আয়ুষ্কালের চেয়েও ৭০ বছর অতিক্রম করেছে * সিডিউল বিপর্যয় চরমে, বহু ট্রেন বন্ধ হওয়ার শঙ্কা
Advertisement
শিপন হাবীব
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রেলওয়েতে এখন ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) আছে ২৮০টি। এর ১৯৫টিই আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে আরও অন্তত ৭০ বছর আগে। এসব ইঞ্জিন দিয়ে কোনোরকমে চালানো হচ্ছে ট্রেন। চলন্ত অবস্থায় প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ছে ইঞ্জিনগুলো। নির্ধারিত গতির চেয়ে কমগতিতে চালাতে হচ্ছে ট্রেন। ফলে একের পর এক বিপর্যয় ঘটছে সিডিউলে। এর ওপর প্রতি মুহূর্তে থাকছে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
এ অবস্থায় ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ৭০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার জন্য প্রকল্প হাতে নেয়। প্রধানমন্ত্রী ‘শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ’-এর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ৯ বছরে তিনবার আহ্বান করা হয়েছিল দরপত্র। কিন্তু নানা টালবাহানায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ সময়ে আরও করুণ হয়েছে প–রনো ইঞ্জিনের অবস্থা। ফলে যে কোনো সময় একেবারেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে বহু ট্রেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনও যদি এসব লোকোমোটিভ কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়, তারপরও এসব ইঞ্জিন পেতে অন্তত তিন বছর সময় লাগবে। ওই সময়ের মধ্যে রেল ব্যবস্থার চিত্র কী হবে, তা নিয়ে ভয়াবহ উদ্বেগ রয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেলে ৪৫টি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এর একটি হল ওই ৭০ লোকোমোটিভ কেনা। এমনই আরেক প্রকল্প ২৭০টি যাত্রীবাহী বগি কেনা। ২০১৬ সালে এসব বগি বুঝে পেয়েছে রেল, যা দিয়ে নতুন ট্রেন চালুসহ পুরাতন ট্রেনে নতুন বগি সংযোগ করা হয়েছে। এরপরও শুধু ইঞ্জিন সংকটের কারণে এসব বগির ৫০টি পড়ে আছে।
সিডিউল বিপর্যয় এখন রেলের নিত্যদিনের বিষয়। যাত্রীর চাপও ভয়াবহ। ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-লালমনিরহাট, ঢাকা-সৈয়দপুর, ঢাকা-দিনাজপুরসহ বিভিন্ন রুটে আরও ট্রেন বাড়ানোর দাবিও আছে। অথচ ইঞ্জিন সংকটে এসবের কিছুই পূরণ করা যাচ্ছে না। রেলপথ সচিব, রেলওয়ে মহাপরিচালক এবং প্রকল্প পরিচালকই বলছেন, ইঞ্জিনের অভাবে বর্তমান ট্রেনগুলোতেই যথাযথ যাত্রী সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সাময়িক চাহিদা পূরণ ও চলমান সংকট কাটাতে আপাতত ওই (৭০টি) ইঞ্জিন কেনা জরুরি। তা না হলে মিটারগেজের ট্রেন পরিচালনা সেবা অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়বে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে উদ্যোগ নেয়ার পর ২০১১ সালে টেন্ডারস ফাইন্যান্সের অধীনে একনেকে ৭০ ইঞ্জিন কেনার প্রকল্প অনুমোদন পায়। এরপর বিভিন্ন সময়ে তিনবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু বরাদ্দের চেয়ে বেশি অর্থ দাবি এবং কারিগরি ত্রুটির কারণ দেখিযে দরপত্রগুলো বাতিল করা হয়। সর্বশেষ ২০১৪ সালে দুটি বিদেশি কোম্পানি- কোরিয়ার মেসার্স হুন্দাই রোটেম ও স্পেনের মেসার্স ভসলোহ এস্পানা এসএ (বর্তমান স্টেডলার রেল ভালেন্সিয়া এসএইউ) এর দরপত্র কারিগরিভাবে যোগ্য বিবেচিত হয়। ‘৭০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রুনিক লোকোমোটিভ’ ক্রয় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, এ মুহূর্তে ৭০টি লোকোমোটিভ কেনার কোনো বিকল্প নেই। এ প্রক্রিয়া অনেক দিন থেকেই চলছে। তিন দফা সময় বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০১৪ সালে বিদেশি ২টি কোম্পানির দরপত্র বিবেচিত হয়। এর মধ্যে স্পেনের ভসলোহ এস্পানা এসএ সর্বনিন্ম দর দেয়। তারা ১ হাজার ৮৩৫ কোটি ৭৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ টাকা প্রস্তাব করে। তাদের প্রস্তাব দ্বিতীয় সর্বনিন্ম দরদাতার চেয়ে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা আনুমানিক ২৪৫ কোটি টাকা কম। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২২শ’ কোটি টাকা।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এ প্রকল্পের অর্থ দিচ্ছে স্প্যানিশ সরকার এবং সে দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংক। স্প্যানিশ সরকারের তহবিল থেকে ৮৫ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংক থেকে ১৫ শতাংশ ঋণ গ্রহণের প্রস্তাব রেখে মেসার্স ভসলোহ এস্পানা এসএ দরপত্রে অংশ নেয়। রেলপথমন্ত্রী প্রস্তাবটি ক্রয় কমিটিতে পাঠানোর জন্য অনুমোদন দিয়েছেন, যা আগামী সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপিত হবে।
রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ইঞ্জিনের অভাব চরমে উঠেছে। এ প্রকল্পটি আগামী সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিজিপি) মিটিংয়ে উপস্থাপিত হবে- এমনটা আশা করছি আমরা। রেলপথমন্ত্রী চান দ্রুত ৭০টি ইঞ্জিন কেনা হোক। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যেসব লোকোমোটিভ রয়েছে তার প্রায় ৯০ শতাংশেরই আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। আয়ুষ্কাল শেষে ৫০-৬৫ বছর অতিক্রম করেছে এমন লোকোমোটিভও রয়েছে। এসব ইঞ্জিন প্রায়ই বিকল হচ্ছে।
