কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতাল
চিকিৎসক স্বল্পতায় ভোগান্তি
শিপন হাবীব
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তুলতুল ও বুলবুলকে (পোষা দুই বিদেশি কুকুর) নিয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন তরুণী সাবাতুর সুভা। নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিপড়ুয়া সুভা একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন। সঙ্গে থাকা বকসাদা দুটি কুকুরও কোঁকাচ্ছিল। সান্ত্বনা দিতে গিয়ে এ প্রতিবেদক জানতে পারেন, কুকুর দুটির সর্দিজ্বর হয়েছে।
তখন দুপুর ১টা। স্থান রাজধানীর গুলিস্তান বঙ্গমার্কেটের বিপরীতে কাজী আলাউদ্দিন রোডে কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতাল প্রাঙ্গণ। বসুন্ধরা এলাকা থেকে আসা সুভা জানালেন, তিন রাত তারা পরিবারের কেউ ঘুমাতে পারেননি।
তুলতুল ও বুলবুলের কিছু হয়ে গেলে তারা সহ্য করতে পারবেন না। কুকুর দুটো পরিবারের সবার খুবই আদরের।
এ হাসপাতালে লোকবলের অভাব উল্লেখ করে তিনি বললেন, চিকিৎসা পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু অপেক্ষার মধ্যেই যদি এ দুটোর কিছু হয়ে যায়... বলতেই তার চোখের জল গড়াল গাল বেয়ে।
শুধু সুভা নন, বহু তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সি লোকজন পোষা পশুপাখি নিয়ে ব্যাকুল হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ও ভেতরে। প্রতিনিয়ত অসুস্থ পশুপাখির সার্জারি হয় এ হাসপাতালে। সার্জারি সফল না হলে কিংবা ওই সময় প্রিয় পশুর মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মালিকরা।
রামপুর থেকে আসা শাহিনুর আক্তার ঊর্মি এক চিকিৎসকের কাছে হাতজোড় করে বলছিলেন, তার আনা দুটি বিড়ালকে যেন বাঁচানো হয়। যে কোনো মূল্যে ওগুলো সুস্থ দেখতে চান।
বারবার সৃষ্টিকর্তার কাছেও প্রার্থনা করছিলেন তিনি। কুমিল্লা থেকে আসা দুই তরুণ ভিড় ঠেলে চিকিৎসকের উদ্দেশে বলছিলেন : স্যার, আমার পাখির অবস্থা ভালো নয়। প্লিজ তাড়াতাড়ি পাখিগুলো দেখে দিন।
ওই সময় ছোট্ট একটি ঘরে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন হাসপাতালের ভেটেরিনারি অফিসার ডা. হুমায়ুন কবির। হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় লেখা রয়েছে: এখানে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কাউকে টাকা দেবেন না। এখানে টিকিটও বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিভিন্ন পোষা পাখি, গাভি, ঘোড়া, কুকুর, বিড়াল, ছাগল, ভেড়া নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন লোকজন। কিছু প্রাণী আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছিল। হাসপাতালের ২-৩ জন কর্মচারী দ্রুততার সঙ্গে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু অপেক্ষায় থাকা লোকজন কিছুতেই ধৈর্য ধরতে পারছিলেন না। পশুপাখি নিয়ে তারা গাছের নিচে অপেক্ষা করছেন। বিড়াল ছানাকে রোদে খাবার খাওয়াচ্ছিলেন এক মহিলা ও তার দুই কন্যাসন্তান।
একটি ভ্যানের ওপর দুটি কুকুর কাতরাচ্ছে। পাশে থাকা আহমেদ সাকি জানান, তার ৪টি পোষা কুকুর আছে। ভোররাতের দিকে কে বা কারা বিষাক্ত কিছু খেতে দিয়েছে। বিশালকে (দুটি কুকুরের একটি) কুপিয়েছে।
তাতে এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে ওরা। দেওয়াল ঘেঁষে এক নারী ফিডারে দুই বিড়ালছানাকে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। পাশে থাকা কন্যা সেঁজুতি বারবার বলছিল: আম্মু দেখে নাও, দুধ ঠান্ডা হয়ে গেছে কি না।
সাবধান, ঠান্ডা দুধ খাওয়াবে না কিন্তু। মা জানান, ফিডার কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো ছিল, এখনো গরম আছে।
প্রবাসী নাবিল হাসান জানান, কানাডা থেকে তিনি দুটি কুকুরছানা নিয়ে এসেছেন। খাওয়া-দাওয়া-ঘুম নড়চড় হলে সেগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ জন্য সব সময় ডাক্তার দেখাতে হয়। তিনি মনে করেন, রাজধানীতে পশু হাসপাতাল বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
হাসপাতালটির চিফ ভেটেরিনারি অফিসার ডা. আফাজউদ্দিন মিঞা যুগান্তরকে জানান, দেশে পশু পালনের হার দ্রুত বাড়ছে। এ হাসপাতালে শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশ থেকে পশুপাখি আসে।
বিত্তশালী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের পালা পশুপাখিও আসে। ভোর থেকেই মানুষ এখানে আসতে শুরু করেন। আমরা সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সেবা দিই।
এ ছাড়া রাতে আসা পশুপাখিরও চিকিৎসা দিতে হয়। হাসপাতালের ভেতরে ডাক্তার, নার্স-স্টাফদের বাসা রয়েছে।
তিনি জানান, রাজধানীসহ বিভাগীয় ও জেলা-উপজেলা শহরগুলোয় মানুষ নানারকম প্রাণী পোষেন। এ হাসপাতালে তারা পোষা প্রাণীর উন্নত চিকিৎসা পেতে ছুটে আসেন।
এ ছাড়া আমরা গণভবন, বঙ্গভবনে পালিত পশুপাখির চিকিৎসা করি। রাজারবাগ পুলিশ হর্স ইউনিট, র্যাবের ডক স্কোয়াড ইউনিটে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এসব জায়গাসহ যে কোনো নাগরিকের পোষা প্রাণীর সমস্যা হলে ছুটে যেতে হয় পশু-চিকিৎসকদের।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ হাসপাতালটি পাকিস্তান আমলে নির্মাণ করা হয়। নড়বড়ে হয়ে গেছে। বৃষ্টি এলে ঘরে পানি পড়ে। চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।
এ ছাড়া প্রতিনিয়ত যে হারে পশুপাখি আসছে, তাতে পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি রাজধানীতে একাধিক ভেটেরিনারি হাসপাতাল নির্মাণ ছাড়া কোনো উপায় নেই।
গবাধি পশুর চিকিৎসা দেওয়া হয় হাসপাতালের মূল গেটের পাশেই। একটি শেডের নিচে চিকিৎসা চলছে। তবে মূল গেট থেকে হাসপাতালের ভেতরে যাওয়ার পথটি ভেঙে গেছে। জমে আছে পানি। মানুষ বাধ্য হয়ে এ পথেই প্রিয় পশুপাখির চিকিৎসা করাতে আসছেন।
ভেটেরিনারি অফিসার ডা. হুমায়ুন কবির জানান, ডাক্তারসহ লোকবলের স্বল্পতা থাকায় যথাযথ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
এখানে ওষুধের অভাব থাকলেও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি নেই। অত্যাধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, প্রাথমিক অস্ত্রোপচার, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব প্রভৃতি রয়েছে।
মূলত এ জন্যই এ হাসপাতালে ভিড় হচ্ছে। জেলা-উপজেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালগুলোয় এসব সুবিধা নেই। এ ছাড়া এখানে গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। টিচিং অ্যান্ড ট্রেনিং ব্যবস্থা রয়েছে।
সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় একটি পশু হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প করার জন্য দুবছর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। প্রায় তিন একর জায়গায় গড়ে ওঠা এ হাসপাতালটি অত্যাধুনিক হাসপাতালে রূপান্তর হবে-এমন আশা চিকিৎসকসহ সাধারণ মানুষেরও।
