স্বাভাবিক হচ্ছে পরিস্থিতি
কাজে যোগ দিয়েছেন পোশাক শ্রমিকরা
শিল্পাঞ্চলে ৩৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন ড্রোনে নজরদারি * আশুলিয়ায় ১২০ কারখানায় ছুটি
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কয়েকদিনের টানা আন্দোলন, বিক্ষোভ, ভাঙচুর, সংঘর্ষের পর স্বাভাবিক হয়ে আসছে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি। ন্যূনতম মজুরির বিষয়ে সরকারের আশ্বাসের পর বৃহস্পতিবার এসব এলাকার অধিকাংশ পোশাক কারখানায় যথারীতি কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা। কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে আশুলিয়ায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বাইরে এলে কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এরপর ১২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে পোশাক কারখানাসহ শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৩৩ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা কার্যক্রমে ড্রোনের মাধ্যমে লাইভ মনিটরিংয়ের পাশাপাশি সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরা ব্যবহার করে নজরদারি চালানো হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, মোতায়েন করা বিজিবি সদস্যদের মধ্যে মিরপুরে তিন প্লাটুন, সাভার ও আশুলিয়ায় ১১ প্লাটুন, গাজীপুরে ১২ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জে সাত প্লাটুন দায়িত্ব পালন করছেন। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা ও নিরাপত্তা জোরদারে আর্মার্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) ও রায়ট কন্ট্রোল ভেহিকল (আরসিভি) মোতায়েন রাখা হয়েছে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা আরও জানান, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালানো হচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে সরাসরি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনকালে বিজিবি সদস্যরা বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ইম্প্র্রোভাইজড বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করছেন। বিজিবি সদর দপ্তরের মনিটরিং সেল থেকে এসব কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করা হচ্ছে।
আশুলিয়া ও সাভার : শিল্পাঞ্চল আশুলিয়া ও সাভারে বৃহস্পতিবার সকালে হাজার হাজার শ্রমিক তাদের নিজ
নিজ কারখানায় কাজে যোগ দেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশুলিয়ায় কয়েকটি বড় কারখানায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেন। তবে কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ১২০টি কারকানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এরপর হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসায় বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে বুধবার পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ এবং পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। বন্ধ রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের পোশাক কারখানাসহ বেশ কয়েকটি কারখানা। পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকানি ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশ তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করেছে। তারা হলেন-বাংলাদেশ ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম (৪৮), জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের আশুলিয়া থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল হালিম (৩৭) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মনসুর আলী (৪৬)।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন জানান, শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি ও উসকানির অভিযোগে সাভার মডেল থানায় দুটি এবং আশুলিয়া থানায় ছয়টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও কয়েকটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। সহিংসতার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এদিকে, হেমায়েতপুর, পদ্মার মোড়, উলাইলসহ আরিচা ও বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর মহাসড়কে অবস্থান করছেন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা।
স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে কালিয়াকৈর : টানা ছয় দিনের শ্রমিক আন্দোলন শেষে সরকারের আশ্বাসে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর শিল্পাঞ্চল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কাজে যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। স্বাভাবিক ছিল যানবাহন চলাচলসহ সার্বিক পরিস্থিতি। শ্রমিক-পথচারীসহ সব পেশার মানুষ স্বস্তিতে কাজ করেছেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা কারখানাগুলো সব চালু না থকলেও যে কয়টি কারখানা খোলা ছিল সবাই কাজে যোগদান করেছেন। মৌচাক এলাকায় পুলিশ ও বিজিবির পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মীদেরও সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পৌরসভার হরিণহাটি এলাকার মমতাজ উদ্দিনের ছেলে তিন মামলার আসামি আজমল হোসেন ফিরোজ খানকে (৪২) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাকে বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে গাজীপুর জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
কাশিমপুর-কোনাবাড়ী : শান্তিপূর্ণভাবে কারখানায় কাজে ফিরেছেন গাজীপুর মহানগরের কাশিমপুর ও কোনাবাড়ীসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানার পোশাক শ্রমিকরা। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত গাজীপুরের কাশিমপুর-কোনাবাড়ী, চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া ও মৌচাকসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
মিরপুরে রাস্তায় নামতে পারেনি শ্রমিকরা : পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গোটা মিরপুর এলাকায় কঠোর অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সড়ক ও ফুটপাতে কোথাও কোনো জটলা হতে দিচ্ছে না পুলিশ। এলাকায় ঘুরে ঘুরে টইল দিচ্ছেন তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া অবস্থানের ফলে বৃহস্পতিবার রাস্তায় নামতেই পারেননি পোশাক শ্রমিকরা। মিরপুর-১, ২, ৭, ১০, ১১, ১২ নম্বর, শিয়ালবাড়ি, রূপনগর, প্রশিকা ও মিল্কভিটা রোড ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এদিকে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত মিরপুর এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিল করতে দেখা যায়।
ফতুল্লার পরিস্থিতি স্বাভাবিক : নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলে বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। সকাল থেকে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছে। কোনো শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। বিকেএমইএ’র সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জে কোনো কারখানা বন্ধ ছিল না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন সতর্ক। গত তিনদিন নারায়ণগঞ্জে শিবু মার্কেট, কাঠেরপুল, জালকুড়িসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় বুধবার রাতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। মামলায় আটজনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলায় ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০০-৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ধামরাইয়ে পাহারা দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকর্মীরা : ঢাকার ধামরাইয়ে পোশাক কারখানার নিরাপত্তা দিতে রাতে পাহারা দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকর্মীরা। ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান অভির নেতৃত্বে বুধবার রাতে এ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন নাজমুল হাসান অভি।
