৫৬ বছর ধরে গাছ লাগাচ্ছেন প্রফেসর এনামুল
দুর্যোগ মোকাবিলায় এলাকায় ৩০ হাজার তাল বীজ রোপণ
আবুল খায়ের, কুমিল্লা
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লায় পরিবেশ রক্ষায় ৫৬ বছর যাবৎ ফলদ এবং বনজ গাছ লাগাচ্ছেন প্রফেসর এনামুল হক খান। রাস্তার পাশে, পতিত ভূমি, পুকুর, খাল, নদীর পাড়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি নানা ধরনের বৃক্ষরোপণ করে আসছেন। সম্প্রতি এলাকার ২৬টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীরা তার এ কর্মযজ্ঞের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। ইতঃপূর্বে দুর্যোগ মোকাবিলায় এলাকায় তিনি ৩০ হাজার তাল বীজ রোপণ করেছেন। বৃক্ষরোপণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে তিনি পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর তিতুমীর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বৃক্ষপ্রেমিক প্রফেসর এনামুল হক খানের বয়স ৭০ বছর। তিনি কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার কালীরবাজার ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামের বাসিন্দা। এলাকার লোকজন তাকে বৃক্ষ মানব এবং বৃক্ষ পাগল বলেও অভিহিত করেন। ১৯৬৬ সালে আদর্শ সদর উপজেলার ধনুয়াখলা গ্রামে বজ্রপাতে এক দিনে আটজনের মৃত্যু হয়। প্রফেসর এনামুল হক তখন হাইস্কুলের ছাত্র। বিষয়টি তাকে খুব নাড়া দেয়। এরপর ১৯৬৯ সাল থেকে দুর্যোগ মোকাবিলায় তিনি গ্রামের সড়কের পাশে তালের বীজ এবং পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো শুরু করেন। সেসময় নিজের বাড়ি, জমি ও সরকারি সড়কের পাশে তাল বীজসহ অন্যান্য বৃক্ষরোপণ করেন। সময়ের পরিক্রমায় সড়ক সম্প্রসারণে কাটা পড়ার পর এখনো ওই শিক্ষকের রোপণ করা ২ শতাধিক বড় তালগাছ এবং অন্যান্য বৃক্ষ এলাকায় ছায়া দেওয়ার পাশাপাশি বজ পাত প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছে। স্থানীয়রা জানায়, গাছ লাগানো নিয়ে তাকে প্রথমদিকে নানা কটূক্তি করা হলেও তিনি থেমে যাননি। কর্মজীবন শেষ করে তিনি নতুন উদ্যমে বৃক্ষরোপণ শুরু করেছেন। ২০২২ সাল থেকে তার ইউনিয়নের ৩৪টি গ্রামের ৩২ কিলোমিটার সড়কে তালের বীজসহ অন্যান্য বৃক্ষরোপণ শুরু করেন। গত চার বছরে এলাকার ২৬টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে লাগান ৩০ হাজার তাল বীজ। পর্যায়ক্রমে তিনি আরও ৭০ হাজার তালের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশাপাশি নিমগাছ, পেঁপের চারাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করে যাচ্ছেন। সরেজমিন দেখা যায়, কালীরবাজার-কাবিলা সড়ক থেকে পশ্চিমে বয়ে গেছে বল্লভপুর গ্রামের একটি সড়ক। সড়কের দুই পাশে মাথা তুলে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে বহু তালগাছ। সম্প্রতি তার নেতৃত্বে আনন্দপুর কলেজের পাশের সড়কে তালের বীজ লাগানো হয়। এছাড়া বল্লভপুর, ধনুয়াখলা, আদমসার, কমলাপুর, কালীরবাজারসহ বিভিন্ন গ্রামের সড়কের পাশে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি তাল বীজসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগান।
স্থানীয় ধনুয়াখলা গ্রামের শিক্ষার্থী এমদাদুল হক, আহসান হাবীব, বল্লভপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান, ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘এনামুল হক গত ৪ বছরে এলাকায় ৩০ হাজার তালবীজ রোপণ করেছেন। এলাকার শিক্ষার্থী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা তাকে এ কাজে সহযোগিতা করছেন। তিনি একজন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। শুরুতে মানুষ নানা সমালোচনা করলেও এখন তাকে সবাই সহযোগিতা করেন। আগামী তিন বছরে তার আরও ৭০ হাজার তালের বীজ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’ আনন্দপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ উম্মে নাসরিন নূর বলেন, এনামুল স্যারের উদ্যোগে আমাদের ইউনিয়নের ১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি হাইস্কুল, তিনটি মাদ্রাসা ও তিনটি কলেজের শিক্ষার্থীরা মিলে তালবীজ রোপণ করছে।
প্রফেসর এনামুল হক খান বলেন, ১৯৬৬ সালে ধনুয়াখলা গ্রামে বজ পাতে এক দিনে আটজন মানুষ মারা যাওয়ার পর বাড়িতে ও গ্রামের সড়কের পাশে তালের বীজ লাগানো শুরু করি। গাছ লাগানো আমার নেশা। যতদিন জীবিত আছি বৃক্ষরোপণ এবং পরিচর্যায় কাজ করে যাব। বাকি জীবন প্রকৃতির সঙ্গে থাকতে চাই। কুমিল্লা বন বিভাগের কোটবাড়ী রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বজ পাত প্রতিরোধে প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হকের উদ্যোগে এলাকায় ৩০ হাজার তালবীজ রোপণ করা হয়েছে। তাছাড়া পরিবেশ রক্ষায় তিনি বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগাচ্ছেন। আমরা তাকে বৃক্ষরোপণে নানান পরামর্শ দিয়ে থাকি। বৃক্ষপ্রেমিক হিসাবে এবার তিনি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন।
