Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

কুমিল্লায় সোনালি আঁশের শিল্পে কালো মেঘ

বন্ধ ৪৪ কারখানা ধুঁকছে ছয়টি

Icon

তাবারক উল্লাহ কায়েস, কুমিল্লা

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

এক সময় কুমিল্লার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল পাটশিল্পের। সোনালি আঁশ থেকে সুতা, ব্যাগ, বস্তা, জুতাসহ তৈরি হতো নানা ধরনের পণ্য। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা অর্ধশত কারখানায় চলত এসব পণ্যের উৎপাদন। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে পণ্য রপ্তানি হতো ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান ও ভারতে। কিন্তু সেই সুদিন এখন অতীত। এক যুগের ব্যবধানে বন্ধ হয়ে গেছে ৪৪টি কারখানা। টিকে থাকা ছয়টির অবস্থাও নাজুক। কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ শ্রমিকের অভাব ও পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে এসব কারখানাও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক সময় কুমিল্লার পাটশিল্পে কাজ করতেন লক্ষাধিক শ্রমিক। এ শিল্পকে ঘিরে জেলার অর্থনীতিও ছিল চাঙা। বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছিল কুমিল্লায় উৎপাদিত পাটজাত পণ্য। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে রপ্তানি কার্যক্রম। কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি কমেছে উৎপাদন সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। কুমিল্লার কারখানাগুলোর রপ্তানি আয় কতটা কমেছে, তার সমন্বিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট, উৎপাদন কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিকবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কঠিন হচ্ছে। একবার বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে গেলে সেই বাজার ফিরে পাওয়া সহজ হবে না।

জাতীয় পর্যায়েও কমছে রপ্তানি আয় : কুমিল্লার পাটশিল্পের সংকট দেশের সামগ্রিক পাট খাতের দুরবস্থারই প্রতিফলন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় করে প্রায় ১১৬ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১১৩ কোটি ডলারে। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে রপ্তানি আয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় নেমে আসে ৯১ কোটি ১৫ লাখ ডলারে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮৫ কোটি ৫২ লাখ ডলারে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে দাঁড়ায় ৮২ কোটি ১৬ লাখ ডলারে। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৩৪ কোটি ডলার বা ২৯ শতাংশ। দেশের পাটকলগুলোর অবস্থাও সংকটাপন্ন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৬৬টি পাটকলের মধ্যে ৭৩টি বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ মোট পাটকলের প্রায় ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ বর্তমানে উৎপাদনের বাইরে। জাতীয় পর্যায়ে রপ্তানি আয় কমে যাওয়া ও কারখানা বন্ধের এই চিত্রের সঙ্গে কুমিল্লার পরিস্থিতিরও মিল রয়েছে।

টিকে আছে মাত্র ছয় কারখানা : কুমিল্লা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কুমিল্লা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সদর, সদর দক্ষিণ, বুড়িচং, দেবিদ্বার, চান্দিনা, মুরাদনগর ও দাউদকান্দি এলাকায় এক সময় অর্ধশত কারখানায় পাটজাত পণ্য উৎপাদন হতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশা, ঊষা ও ডাজীসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করেছে। এক যুগের ব্যবধানে বর্তমানে উৎপাদনে টিকে থাকা ছয়টি কারখানা হলো ফুলহার, সোনালী আঁশ-১, সোনালী আঁশ-২, জিহান, এনএসআর ও সাদাত জুট মিল।

কারখানা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাটের তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিকবাজারে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যাগ, পরিবেশবান্ধব জুতা, পাটের সুতা, বস্তা ও নকশাদার পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল সরবরাহ, মানসম্মত উৎপাদন, প্রতিযোগিতামূলক দাম ও সময়মতো পণ্য সরবরাহ। তাদের ভাষ্য, কাঁচামালের অভাবে সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করা না গেলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন। অন্যদিকে পুরোনো যন্ত্রপাতি ও দক্ষ শ্রমিকের অভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে কম দামে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে পুরোনো ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগও কমছে।

কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়কের পাশে অবস্থিত জিহান ফুটওয়্যার লিমিটেডের মালিক মো. শাহাজাদা টিপু বলেন, পাটজাত পণ্যের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে। এতে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জিহান ফুটওয়্যারে তৈরি জুতা পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি হয়। কিন্তু কাঁচামালের দাম বাড়লেও বিদেশি ক্রেতারা আগের দামেই পণ্য কিনতে চান। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বিক্রয়মূল্য না বাড়ায় আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চললে উৎপাদন অব্যাহত রাখা ও আন্তর্জাতিকবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

বন্ধ হয়ে যাওয়া আশা পাটকলের ব্যবস্থাপক কৃষ্ণ জানান, আর্থিক সংকট ও কাঁচা পাটের অভাব কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ। কয়েক বছর ধরে চাহিদা অনুযায়ী পাট পাওয়া যাচ্ছিল না। অন্যদিকে পাটের দাম বাড়লেও রপ্তানি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি জামাল আহমেদ বলেন, পাটকল বন্ধ হওয়ার অর্থ শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন থেমে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে শ্রমিকের আয়, পরিবহণ, কাঁচামাল সরবরাহ, স্থানীয় ব্যবসা এবং শিল্পকেন্দ্রিক নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িত।

কুমিল্লা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৈয়দ নাজমুল রাশেদ জানান, এনএসআর ও আশ্রাফ জুট মিল কাঁচামাল, দক্ষ জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে নামমাত্র উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। বন্ধ কারখানার মালিকদের ভাষ্য, কাঁচামাল, দক্ষ শ্রমিক ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবেই অনেক বেসরকারি পাটজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানায় এক সময় সুতা, ব্যাগ, জুতা ও অন্যান্য পণ্য তৈরি হতো। দেশের বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হতো।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কুমিল্লার পাটশিল্প টিকিয়ে রাখতে বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি পাটের উৎপাদন বাড়ানো, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কাঁচামাল সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আধুনিক যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। অন্যথায় টিকে থাকা কারখানাগুলোর উৎপাদনও দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়তে পারে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

কুমিল্লায় সোনালি আঁশের শিল্পে কালো মেঘ বন্ধ ৪৪ কারখানা ধুঁকছে ছয়টি

বন্ধ ৪৪ কারখানা ধুঁকছে ছয়টি

৫৬ বছর ধরে গাছ লাগাচ্ছেন প্রফেসর এনামুল

৫৬ বছর ধরে গাছ লাগাচ্ছেন প্রফেসর এনামুল

স্বাভাবিক হচ্ছে পরিস্থিতি কাজে যোগ দিয়েছেন পোশাক শ্রমিকরা

কাজে যোগ দিয়েছেন পোশাক শ্রমিকরা

চাঁদপুর জেলা পরিষদ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে ২৮ কোটি টাকার এফডিআর

ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে ২৮ কোটি টাকার এফডিআর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম