Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

ক্রেতা-বিক্রেতার উপচেপড়া ভিড়

দখল গুলিস্তানের পাতাল সড়ক

পথচারীদের চরম ভোগান্তি, নাজেহাল নারীরা * সিটি করপোরেশন দায় এড়াচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ করছে সমিতি * কমিটির বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ, নিরুপায় দোকানিরা

Advertisement

Icon

শিপন হাবীব

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দখল গুলিস্তানের পাতাল সড়ক

Advertisement

দখল হয়ে গেছে ঢাকা গুলিস্তানের পাতাল সড়ক। ১০৪টি দোকান, খোলা জায়গায় পণ্যের পসরা, ভ্রাম্যমাণ হকার ও ক্রেতার নিয়ন্ত্রণে পুরো এলাকা। হঠাৎ দেখলে মনে হবে মাটির নিচে বিশাল মার্কেট, জমজমাট কেনাবেচা। সড়ক খুঁজে পাওয়াই কঠিন। ফলে সাধারণ পথচারীদের চলাচল প্রায় বন্ধ। এ পথে নারীদের অধিকাংশ সময় ভিড়ের চাপে নাজেহাল হতে হয়। কাজেই অধিকাংশ মানুষ পাতাল বাদ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনের ভিড় ঠেলে উপর দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। এতে ব্যাহত হয়েছে মাটির নিচে সড়ক নির্মাণের উদ্দেশ্য।

নগরবিদদের মতে সিটি করপোরেশনের কারণে পাতাল সড়কটি গণমানুষের তেমন কাজে আসছে না। শুরুতেই তারা ১০৪টি দোকান বরাদ্দ দিয়েছে। এগুলোর অবস্থান প্রায় ১০ ফুট চওড়া রাস্তার দুই পাশে। ৯০ থেকে ১৪০ বর্গফুটের দোকানগুলোতে সাজানো আছে নানা ধরনের পণ্য। দোকানের সীমানার বাইরে সড়কের এক অংশে বসানো হয়েছে ৬-৮টি ‘টোল-টেবিল’। এসবের পাশে আছে ভ্রাম্যমাণ হকার। এদেরই রাজত্ব এখানে, সিটি করপোরেশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পুরোটাই দেখভাল করছে ‘সমিতি’। প্রতি দোকান থেকে নির্ধারিত ভাড়ার পাশাপাশি নানা অজুহাতে আদায় হচ্ছে হাজার হাজার টাকা চাঁদা।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ যুগান্তরকে বলেন, পাতাল সড়ক শুধু পথচারীদের জন্য নির্ধারিত থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের এ পাতাল সড়কটি মার্কেট হয়ে গেছে। এটা অনেক আগের তৈরি। তখন কোন প্রেক্ষাপটে ডিজাইন করা হয়েছে তা আমরা জানি না। তবে আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব-এখনো যদি সংশোধন করার সুযোগ থাকে তা নিশ্চয় করা হবে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করব।’

বিশিষ্ট স্থপতি ইকবাল হাবিব যুগান্তরকে বলেন, ‘ বাণিজ্যিক ভাবনা গণমানুষের চলাচলের সুবিধা-গ্রাস করেছে। জনগণের সেবা কার্যক্রমে এভাবে অর্থ আয়ের চিন্তা খুবই দুঃখজনক। এটি তৈরির পর যদি সিটি করপোরেশন সব দায়িত্ব থেকে সরে যান, তাহলে বুঝতে হবে, নিশ্চয় এখানে অনিয়ম-দুর্নীতি আছে। সংস্থাটি যেহেতু এ মার্কেট থেকে টাকা নিচ্ছে কাজেই পাতাল সড়ক ও মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তথাকথিত সমিতি কী করে নিয়ন্ত্রণ করে প্রশ্ন রাখেন বিশিষ্ট এ স্থপতি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পাতাল সড়কটির নাম দিয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু স্কোয়ার পাতাল সড়ক মার্কেট’। আর সমিতির দেওয়া নাম হচ্ছে ‘গুলিস্তান বঙ্গবন্ধু স্কোয়ার পাতাল সড়ক মার্কেট সমিতি’। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ২৫ জুন পাতাল সড়ক/মার্কেটটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সঙ্গে ছিলেন ঢাকা সিটি করপোরেশন প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ।

ট্রাফিক সদস্যরা জানান, খুব কম মানুষই মাটির নিচের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করে। সবাই উপরের রাস্তাই ব্যবহার করে থাকে। তারা বলেন, কারো সাধ্য নেই এখান থেকে হকার বা দোকান উচ্ছেদ করবে। এর আগে উপরের রাস্তা থেকে হকার উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়েছে। আহত নিহতের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। জানা গেছে, প্রথম দিকে সড়কটি পথচারীদের শতভাগ অনুকূলে ছিল। খোদ দোকানিরাই বলেন, এক সময় এ সড়কে শুধু পথচারীর দেখাই মিলত। ধীরে ধীরে ভেতরের মার্কেট জমে ওঠায়, পথচারীর স্থান দখল করেছে ক্রেতা-বিক্রেতারা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি দোকানের সামনেই টুল ও টেবিল বাসানো রয়েছে। দোকান ও টেবিল ঘিরে ক্রেতারা রাস্তায় জটলা বেঁধে কেনাকাটা করছেন। মেরামত করছেন মোবাইল। সকাল থেকে রাত-পুরো সড়ক ঘিরেই ক্রেতাদের অবস্থান। পথচারীদের হাঁটার জায়গা নেই। একাধিক নারী পথচারী জানিয়েছেন, সড়কটি ব্যবহার করলে রীতিমতো নাজেহাল হতে হয়। ভিড় ঠেলে পারাপার হওয়া প্রায় অসম্ভব। গত তিনদিন সরেজমিন দেখা যায়, দিনে খুবই সামান্য পথচারী পাতাল সড়কটি ব্যবহার করেছেন। তাদের ভাষ্য, সড়কে ভিড় না থাকলে নির্ভয়ে ব্যবহার করা যেত। ক্রেতা-বিক্রেতা আর হকারদের দখলে থাকায় নিচের সড়ক বাদ দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উপরের রাস্তা ব্যবহার করতে হচ্ছে। দিন-রাত শত শত পথচারী ঝুঁকি নিয়ে উপরের সড়কগুলো আড়াআড়িভাবে পারাপার হচ্ছে।

পাতাল সড়কের সিঁড়িও হকারদের দখলে। সিঁড়ির নিচের দিকে ছোলামুড়ি, দইসহ খাবারের দোকান নিয়ে বসেছেন হকাররা। একাধিক হকার বললেন, মার্কেট সমিতিকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। টাকা ছাড়া ১ মিনিটও ভেতরে থাকা যায় না। স্থায়ী কোনো খাবারের দোকান নেই। তাই চাঁদা দিয়েই অবস্থান করেন ভ্রাম্যমাণ হকাররা। দই বিক্রেতা জানান, পথচারীরা এ সড়কে নামে না। তাই দোকানের ক্রেতা-বিক্রেতারাই তাদের গ্রাহক।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পতি কর্মকর্তা মো. রাসেল সাবরিন যুগান্তরকে বলেন, পাতাল সড়ক ও মার্কেটটি উদ্বোধনের পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমাদের দপ্তরের তত্ত্বাবধানে ছিল। এখন আমরা কিছুই দেখি না। পুরো বিষয়টা রাজস্বসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ দেখাশোনা করছে।

প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল হক জানান, সড়ক দখল করে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় অবৈধ। সংস্থাটির বাজার শাখার কর কর্মকর্তা মো. আবুল খায়ের জানালেন, সড়কটি ঘিরে ১০৪টি দোকান রয়েছে। আমরা নির্ধারিত (প্রতি বর্গফুট ২৬ টাকা করে) হারে ভাড়া তুলি। ওখানে একটি সমিতি আছে তারাই দেখভাল করে। আমাদের পাহারাদারও নেই।

এদিকে সমিতির বিরুদ্ধে কোনো দোকানদারিই নাম প্রকাশে কোনো অভিযোগ করতে চায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিকাংশ দোকানদার জানান, পাতাল সড়ক-মার্কেটটি সিটি করপোরেশনের। কিন্তু সিটি করপোরেশন কিছুই করছে না। তারা শুধু দোকানের বর্গফুট প্রতি ২৬ টাকা হারে ভাড়া আদায় করে। সমিতি প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা করে ১০৪টি দোকান থেকে ৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা আদায় করছে। তাছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে চাঁদা দিতে হচ্ছে। হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।

সমিতির সভাপতি সোহরাব হোসেন নান্নু যুগান্তরকে জানান, পুরো মার্কেটটি তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন। সিটি করপোরেশন কিছুই করছে না। সড়কের বিদ্যুৎ থেকে ধরে এসির বিল সবই তারা পরিশোধ করছেন। প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা করে দোকান প্রতি তোলেন স্বীকার করে বললেন, এটা চাঁদা নয়, রসিদের মাধ্যমে নেওয়া হয়। হকার বসিয়ে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে চাঁদা উঠানোর বিষয়ে বললেন, ‘এমন অভিযোগ সত্য নয়, যে টাকা উঠনো হয় তা দিয়ে মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আমরা আজ নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলে, কাল থেকে পুরো মার্কেট অন্ধকার হয়ে যাবে। সড়ক দিয়ে কেউ হাঁটতে পারবে না। দারোয়ান থেকে শুরু করে সব নিরাপত্তা আমরাই দিচ্ছি।

Advertisement

পাতাল সড়ক

Advertisement

আরও পড়ুন

আশুলিয়ায় কর্মজীবী নারী হোস্টেল জায়গা গিলে খাচ্ছে প্রভাবশালীরা

জায়গা গিলে খাচ্ছে প্রভাবশালীরা

অক্ষুণ্ন রাখে মাটির উর্বরতা রাসায়নিক সার সংকটে জৈব সার যেন আশীর্বাদ

রাসায়নিক সার সংকটে জৈব সার যেন আশীর্বাদ

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেলের দাম পাইকারিতে কমলেও খুচরায় প্রভাব নেই

পাইকারিতে কমলেও খুচরায় প্রভাব নেই

দৌলতপুরে ভাইয়ের হাঁসুয়ার কোপে ভাই খুন

দৌলতপুরে ভাইয়ের হাঁসুয়ার কোপে ভাই খুন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম