উন্নয়ন কাজে সমন্বয়হীনতা কাম্য নয়
Advertisement
আর কে চৌধুরী
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানী। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানী ঢাকা দুনিয়ার অন্যতম একটি মেগাসিটি। এ মহানগরীকে সুন্দরভাবে সাজানোর জন্য সরকারের আগ্রহের অভাব নেই। কিন্তু ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি সে আগ্রহ পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীবাসীর সেবায় ৫৬টি সংস্থা নিয়োজিত। তাদের কাজের সমন্বয় না থাকায় নগরবাসী সত্যিকার অর্থে কতটা সেবা পায় তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় ঢাকা ইতিমধ্যে দুনিয়ার অন্যতম বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত হয়েছে। ঢাকার উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে মহানগরীকে দুই সিটি কর্পোরেশনে ভাগ করা হলেও সেবা সংস্থাগুলোর ওপর সিটি মেয়রের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তাদের পক্ষেও জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে নতুন রাস্তা, ফুটপাত নির্মিত হওয়ার পরের মাসেই তা কেটে স্যুয়ারেজ লাইন বসাচ্ছে ওয়াসা। কখনও রাস্তা খুঁড়ে বিটিসিএল নিয়ে যাচ্ছে টেলিফোন লাইন। নাগরিক সেবা বাড়াতে সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিপত্র জারি করা হলেও এক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি ঘটেনি।
এ অবস্থায় গত বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বরাবর একটি অভিযোগপত্র দেন। কিন্তু তাতেও জট খোলেনি। মেয়ররা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তাদের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্য সেবা সংস্থাগুলোর সে দায়বদ্ধতা নেই।
সেবা সংস্থাগুলো সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন না হওয়ায় তারা মেয়রের নির্দেশনা মানতে বাধ্য নয়। সেবা প্রদানকারী প্রতিটি সংস্থার প্রকল্প ও বরাদ্দ আলাদা। রাজধানীর উন্নয়নে স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, রেল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গণপূর্ত, সড়ক পরিবহন এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে।
এ ছাড়া অর্থ, পরিকল্পনাসহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় পরোক্ষভাবে ঢাকার উন্নয়নের অংশীদার। সমন্বয়হীনতার কারণে এ সংস্থাগুলোর সেবা যথার্থভাবে নগরবাসীর কাজে আসছে না। রাজধানীর উন্নয়নও হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। পরিণামে অচল নগরীতে পরিণত হচ্ছে ঢাকা, যা এড়াতে রাজধানীর সেবাদানকারী সব সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে।
যখন-তখন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা, নর্দমার ময়লা-আবর্জনা বৃষ্টির পানিতে পড়ে রাস্তাজুড়ে উপচে পড়া, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার ঢিবি, খানাখন্দপূর্ণ প্রধান সড়ক- যুগ যুগ ধরে এমন দৃশ্যের সঙ্গে বসবাস ও বেড়ে ওঠা ঢাকা মহানগরবাসীর। সহ্য ও ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত তারা।
অবস্থা এমন যে, একবার যে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বা কাটাছেঁড়া হয়েছে, তার মেরামতে বছর গড়িয়ে যায়। মাসের পর মাস ধরে চলে নানা সংস্থার কথিত উন্নয়নের কাজ। মনে হয় এসব কাজ চলবে অনন্তকাল ধরে।
মানুষ দুর্ভোগ, কষ্ট যতই পোহাক, তাতে কিছু যায় আসে না সংশ্লিষ্টদের। এসব দেখার কোনো দায়ভারও যেন নেই তাদের। একই রাস্তা একবার ওয়াসা কেটে মাটি ভরাট করে তো পরদিন আসে গ্যাস কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের অবস্থাও একই। সবখানেই সেবা সংস্থাগুলোর কাজে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এসব সংস্থার ওপর সিটি কর্তৃপক্ষের কোনো কর্তৃত্ব নেই।
মেয়ররা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছেন, সংবাদপত্রগুলোও লেখালেখি করছে; কিন্তু তাতে টনক নড়ে না কারও। কারণ এখানে আর্থিক সুবিধার ব্যাপার রয়েছে। অর্থ শ্রাদ্ধের এমন বিপুল যজ্ঞ থেকে পকেট ভারি করার মওকা কেউ হারাতে চায় না। তাই কোনো সংস্থাই আগ্রহী নয় সমন্বয় সাধনে।
অবশেষে প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে আসতে হয়েছে। বলা হয়েছে, সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কাজের অগ্রগতির বিষয় কর্পোরেশনকে অবহিত করতে হবে। কাজে আনতে হবে গতিশীলতা।
কিন্তু সমন্বয় সাধনের এ সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্টরা কতটা মানবেন, সেটাই প্রশ্ন। নাগরিক স্বার্থে নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের জন্য আইন প্রণয়ন জরুরি।
আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা
