সিন্ডিকেটের কবলে ঢামেক
চিকিৎসা ক্ষেত্রে চাই জিরো টলারেন্স নীতি
Advertisement
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার আশায় নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসে থাকেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, দীর্ঘদিন ধরে মুমূর্ষু রোগী ও তাদের অসহায় স্বজনদের জিম্মি করে আসছে একটি প্রভাবশালী দালালচক্র। বৃহস্পতিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-সারা দেশের সাধারণ মানুষের শেষ আশার স্থলটিতে ঢোকা যতটা সহজ, চিকিৎসা শেষে বা অন্য কোথাও স্থানান্তরের জন্য রোগী নিয়ে বের হওয়া ততটাই কঠিন। অ্যাম্বুলেন্সের মালিক, চালক এবং কতিপয় স্থানীয় প্রভাবশালীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা শক্তিশালী চক্রের হাতে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
অভিযোগ আছে, ঢামেক প্রাঙ্গণে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণাধীন অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো যানবাহনে রোগী পরিবহণের কোনো সুযোগ নেই। গন্তব্য যত কাছেরই হোক না কেন, অ্যাম্বুলেন্সে উঠলে শুরুতেই হাজার হাজার টাকার মাশুল গুনতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নানা অজুহাতে সার্ভিস চার্জ, ভ্যাট, হুইলচেয়ার কিংবা সাপোর্ট স্টাফের নামে অতিরিক্ত অর্থ। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সাধারণের নাগালের বাইরে থাকায় বাধ্য হয়েই সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে।
অসুস্থ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট ও স্বজনদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অসাধু উপায়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এই অপচেষ্টা কেবল অনৈতিকই নয়, অমানবিকও বটে। অবাক হতে হয়, বাণিজ্যিক অ্যাম্বুলেন্সের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও ভাড়ার তালিকা তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এমনকি অত্যন্ত সংবেদনশীল এই বাহনের অধিকাংশ চালকেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রাথমিক চিকিৎসা বা জরুরি সেবার প্রশিক্ষণ নেই। তার ওপর সরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক ও জরুরি গেটের স্থান দখল করে বেসরকারি মালিক কল্যাণ সমিতির কার্যালয় বানিয়ে প্রকাশ্যে এই বাণিজ্য চালানো সামগ্রিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নজরদারির অভাবকেই নির্দেশ করে।
চিকিৎসাসেবা পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আর সেই সেবার এক অবিচ্ছেদ্য ও জরুরি অনুষঙ্গ হলো নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও সাশ্রয়ী পরিবহণব্যবস্থা। তাই কোনো অবস্থাতেই মুমূর্ষু রোগীর জীবন-মরণ সংকটের সুযোগ নিয়ে এমন লাগামহীন বাণিজ্য চলতে দেওয়া যাবে না। এই জিম্মিদশা ও বিশৃঙ্খলা থেকে রোগীদের মুক্ত করতে হাসপাতাল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখনই কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢামেক প্রাঙ্গণ থেকে সব ধরনের অবৈধ সিন্ডিকেট, দালালচক্র ও অবৈধ দখলদারত্ব যেমন পুরোপুরি উচ্ছেদ করতে হবে, তেমনি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বাড়িয়ে একটি স্বচ্ছ কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডিসপাচ বা কল সেন্টারব্যবস্থা চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বা অ্যাপভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে বাধাহীনভাবে চলাচলের সুযোগ দিয়ে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বিআরটিএ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে চালকদের প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সের ডিজিটাল ফিটনেস কার্ড থাকাও বাধ্যতামূলক করতে হবে। একটি মানবিক সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সব ধরনের হয়রানি চিরতরে বন্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।
