কেন আমরা অকৃতজ্ঞ হব?
Advertisement
জেহসান ইসলাম
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমার পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের মানুষ কয়েকটি কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বিদেশে চলে যান। গত শতকের সত্তরের দশক থেকে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোয় যান কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে- যার ধারা এখনও অব্যাহত আছে। পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যোগ হয় দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান ইত্যাদি দেশ।
গত কয়েক বছরে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইতালি ইত্যাদি দেশেও যাওয়া শুরু হয়েছে। এদের সবাই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার সমৃদ্ধকরণে বিশাল অবদান রেখে চলেছে, এ কথা আমরা সবাই জানি এবং স্বীকার করি।
আরেকটি অংশ হল ছাত্রছাত্রী। সাধারণত মেধাবীরা উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য যায়। এদের কতজন শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসে সে তথ্য কারও জানা নেই। তবে ফিরে আসার সংখ্যা যে খুবই নগণ্য সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই স্বদেশের উন্নয়নে এদের প্রকৃত অবদান নিরূপণ করা কঠিন।
আমরা জানি, বহু আগে থেকেই সিলেট জেলার একটি বড় জনগোষ্ঠী যুক্তরাজ্যে বসবাস করে আসছে। এদের আত্মীয়স্বজনও পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে একই পথ ধরে। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী এ জনগোষ্ঠী স্বদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখছেন সে তথ্য আমার জানা নেই। তবে নিজেদের সিলেট এলাকার উন্নয়নে তারা খুব সক্রিয় বলে অনেকেই বলেন। কিছুটা আমি নিজেও স্বচক্ষে দেখেছি। এদের বাইরে যে একটি গোষ্ঠী স্থায়ীভাবে সপরিবারে বিদেশ চলে গেছে বা যাচ্ছে তারা কারা?
আমার পর্যবেক্ষণে এরা হল একশ্রেণির ধনী ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরিজীবী (সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত) এবং কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তি। প্রশ্ন হল, এরা কখন, কীভাবে এবং কেন যান? উত্তরটা অনেকেই জানেন। এদের প্রায় সবাই অসৎ উপায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন এমন এক সময়, যখন তারা মনে করেন এ দেশে থাকা নানা কারণে তাদের জন্য নিরাপদ নয়, এ দেশ থেকে আর অর্থ উপার্জনের সুযোগ নেই বা সীমিত এবং সর্বোপরি যে অর্থ তারা আয় করেছেন, বিদেশে থেকে তা দিয়ে ভোগবিলাস করা যাবে। কারণ উন্নত দেশগুলোয় ভোগবিলাসের যত সুযোগ আছে, তা বাংলাদেশে নেই। কোনো সংকোচ না করেই বলা যায়, বিভিন্ন সময়ে বৈধ-অবৈধ নানা সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশকে শোষণ ও সর্বস্বান্ত করে দেশটাকে তারা বসবাসের অযোগ্য ভাবেন।
আমার জন্ম গ্রামে এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত গ্রামেই পড়ালেখা করেছি। প্রাথমিকের পাঁচ বছর বিনাবেতনে পড়ালেখা করেছি। বইও পেয়েছি ফ্রি। এরপর বিএসএস (সম্মান) পর্যন্ত সব পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়ে মাস্টার্স পর্যন্ত বিনাবেতনে পড়াশোনা শেষ করেছি। মাসে মাসে বৃত্তির আর্থিক অনুদানের সঙ্গে টিউশনির মাধ্যমে নিজের আয় করা টাকা দিয়ে অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মিটিয়েছি। সরকারি ও প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ালেখার খরচে কী বিশাল ব্যবধান, তা আগে বোঝা না গেলেও এখন তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।
পড়ালেখা শেষ করে সরকারি চাকরি করছি ৩০ বছর ধরে। মাঝখানে বাংলাদেশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগও পেয়েছি। তার মানে হচ্ছে, আমি যা কিছু পেয়েছি, সবই এ দেশের সাধারণ মানুষের টাকায়। এখনও যা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি তাও একইভাবে। আমি যদি এখন সুযোগ বুঝে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চলে যাই, তাহলে কি সেটা অকৃতজ্ঞতা হবে না? এ দেশের আরও অগুনতি ব্যক্তির বেলায় এ একই সত্য প্রযোজ্য।
একটি কথা বলে শেষ করতে চাই। চাকচিক্য, উন্নত জীবনযাপন, ভোগ-বিলাসে আকৃষ্ট হয়ে আমরা যেসব দেশে যাচ্ছি, সেসব দেশ তো কোনো দৈবশক্তির বলে ওই পর্যায়ে যায়নি। গিয়েছে সেসব দেশের মানুষদের প্রবল দেশপ্রেম ও আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে। আমরাও কি সবাই মিলে নিজের দেশের জন্য তা করতে পারি না?
জেহসান ইসলাম : কবি
