জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি
jugantor
জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

  ড. এসএসএম সাদরুল হুদা  

২৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাহিত্য জগতে আবু রুশদ নামে খ্যাত সৈয়দ আবু রুশদ মতিনউদ্দিন ১৯১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর কলকাতায় একটি সম্মানিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আজ তার জন্মশতবার্ষিকী।

আবু রুশদ ছিলেন শিক্ষাবিদ, লেখক, মুক্তিযোদ্ধা, কূটনীতিক, সর্বোপরি সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন নাগরিক। তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি তার মাস্টার্স চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই হুগলি মহসিন কলেজে প্রভাষক হিসেবে তার প্রথম চাকরি পান।

পরে তিনি অক্সফোর্ডের এক্সেটর কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে আরও পড়াশোনা করতে যান। ফিরে এসে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ, ঢাকা কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ ও রাজশাহী কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং সব শেষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজির সুপারনিউমারি অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি পরীক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

শিক্ষকতা ছিল তার সারা জীবনের ব্রত। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে। আবু রুশদ বিভিন্ন সরকারি পদে নিযুক্ত ছিলেন।

তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পাবলিক ইন্সট্রাকশন (ডিপিআই) ছিলেন এবং এক সময় লন্ডনের হাইকমিশনে শিক্ষা কাউন্সেলরের দায়িত্ব পালন করেছেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

আবু রুশদ কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজে মুসলিম সাহিত্য বিকাশের একজন অগ্রপথিক। ১৯৩৭ সালে হাবিবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত মাসিক পত্রিকা বুলবুলে ‘অথর্ব’ নামের একটি গল্প প্রকাশের মাধ্যমে তিনি শিক্ষিত সমাজের নজর কাড়েন। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘রাজধানীতে ঝড়’।

তৎকালীন মুসলিম সমাজে তরুণ সাহিত্যিকদের সাহচর্য তার সাহিত্যচর্চাকে করেছে বেগবান। সৈয়দ আলী আহসান, শওকত ওসমান, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন প্রমুখের সাহিত্যজীবনের বেড়ে ওঠার গল্প পাওয়া যায় আবু রুশ্দের আত্মজীবনীতে।

দেশভাগ, মুসলিম শিক্ষিত সমাজের উত্থান, মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের জীবন কাহিনীর সুনিপুণ উপস্থাপক আবু রুশ্দের ছয়টি উপন্যাস, ৫০টি ছোটগল্প এবং তিন খণ্ডের আত্মজীবনী বাংলা সাহিত্যে তার অসামান্য অবদানের প্রমাণ। তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হল ‘এলোমেলো’ (১৯৪৬), ‘সামনে নতুন দিন’ ( ১৯৫১), ‘ডোবা হলো দীঘি’ (১৯৬০), ‘নঙ্গর’ (১৯৬৭), ‘অনিশ্চিত রাগিনী’ (১৯৬৯) এবং ‘স্থগিত দ্বীপ’ (১৯৭৪)। তার অনুবাদ সংকলন ‘লালনের গান’ বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে ১৯৬৪ সালে।

১৯৬৩ সালে তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। স্বাধীন বাংলাদেশে তার প্রথম স্বীকৃতি ১৯৮১ সালে একুশে পদক লাভ।

বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি হাবিব ব্যাংক পুরস্কার (১৯৭০), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯২), আলক্তা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯২), বাংলা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৩), শের-ই-বাংলা স্বর্ণ পুরস্কার (১৯৯২), লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৯২), রোটারি ক্লাব পুরস্কার (১৯৯৫) এবং চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৯) লাভ করেন।

আবু রুশদ ১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে পাকিস্তান দূতাবাসে কাউন্সেলরের (শিক্ষা ও সংস্কৃতি) দায়িত্ব পালন করার সময় অন্যান্য মিশন কর্মীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।

পরবর্তীকালে তারা ‘বাংলাদেশ মিশন ওয়াশিংটন’ নামে একটি সংহতি সংগঠন গঠন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে তিনি ‘বাংলাদেশ নিউজলেটার’ নামে একটি সাপ্তাহিক প্রকাশের দায়িত্বে ছিলেন।

অধ্যাপক আবু রুশদ ২০১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

ড. এসএসএম সাদরুল হুদা : সহকারী অধ্যাপক, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি

জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

 ড. এসএসএম সাদরুল হুদা 
২৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি
সৈয়দ আবু রুশদ মতিনউদ্দিন

সাহিত্য জগতে আবু রুশদ নামে খ্যাত সৈয়দ আবু রুশদ মতিনউদ্দিন ১৯১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর কলকাতায় একটি সম্মানিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আজ তার জন্মশতবার্ষিকী।

আবু রুশদ ছিলেন শিক্ষাবিদ, লেখক, মুক্তিযোদ্ধা, কূটনীতিক, সর্বোপরি সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন নাগরিক। তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি তার মাস্টার্স চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই হুগলি মহসিন কলেজে প্রভাষক হিসেবে তার প্রথম চাকরি পান।

পরে তিনি অক্সফোর্ডের এক্সেটর কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে আরও পড়াশোনা করতে যান। ফিরে এসে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ, ঢাকা কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ ও রাজশাহী কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং সব শেষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজির সুপারনিউমারি অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি পরীক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

শিক্ষকতা ছিল তার সারা জীবনের ব্রত। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে। আবু রুশদ বিভিন্ন সরকারি পদে নিযুক্ত ছিলেন।

তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পাবলিক ইন্সট্রাকশন (ডিপিআই) ছিলেন এবং এক সময় লন্ডনের হাইকমিশনে শিক্ষা কাউন্সেলরের দায়িত্ব পালন করেছেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

আবু রুশদ কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজে মুসলিম সাহিত্য বিকাশের একজন অগ্রপথিক। ১৯৩৭ সালে হাবিবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত মাসিক পত্রিকা বুলবুলে ‘অথর্ব’ নামের একটি গল্প প্রকাশের মাধ্যমে তিনি শিক্ষিত সমাজের নজর কাড়েন। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘রাজধানীতে ঝড়’।

তৎকালীন মুসলিম সমাজে তরুণ সাহিত্যিকদের সাহচর্য তার সাহিত্যচর্চাকে করেছে বেগবান। সৈয়দ আলী আহসান, শওকত ওসমান, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন প্রমুখের সাহিত্যজীবনের বেড়ে ওঠার গল্প পাওয়া যায় আবু রুশ্দের আত্মজীবনীতে।

দেশভাগ, মুসলিম শিক্ষিত সমাজের উত্থান, মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের জীবন কাহিনীর সুনিপুণ উপস্থাপক আবু রুশ্দের ছয়টি উপন্যাস, ৫০টি ছোটগল্প এবং তিন খণ্ডের আত্মজীবনী বাংলা সাহিত্যে তার অসামান্য অবদানের প্রমাণ। তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হল ‘এলোমেলো’ (১৯৪৬), ‘সামনে নতুন দিন’ ( ১৯৫১), ‘ডোবা হলো দীঘি’ (১৯৬০), ‘নঙ্গর’ (১৯৬৭), ‘অনিশ্চিত রাগিনী’ (১৯৬৯) এবং ‘স্থগিত দ্বীপ’ (১৯৭৪)। তার অনুবাদ সংকলন ‘লালনের গান’ বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে ১৯৬৪ সালে।

১৯৬৩ সালে তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। স্বাধীন বাংলাদেশে তার প্রথম স্বীকৃতি ১৯৮১ সালে একুশে পদক লাভ।

বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি হাবিব ব্যাংক পুরস্কার (১৯৭০), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯২), আলক্তা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯২), বাংলা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৩), শের-ই-বাংলা স্বর্ণ পুরস্কার (১৯৯২), লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৯২), রোটারি ক্লাব পুরস্কার (১৯৯৫) এবং চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৯) লাভ করেন।

আবু রুশদ ১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে পাকিস্তান দূতাবাসে কাউন্সেলরের (শিক্ষা ও সংস্কৃতি) দায়িত্ব পালন করার সময় অন্যান্য মিশন কর্মীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।

পরবর্তীকালে তারা ‘বাংলাদেশ মিশন ওয়াশিংটন’ নামে একটি সংহতি সংগঠন গঠন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে তিনি ‘বাংলাদেশ নিউজলেটার’ নামে একটি সাপ্তাহিক প্রকাশের দায়িত্বে ছিলেন।

অধ্যাপক আবু রুশদ ২০১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

ড. এসএসএম সাদরুল হুদা : সহকারী অধ্যাপক, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন