পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার চাই
Advertisement
শহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতিকে আলোকিত করার জন্য গ্রন্থ পাঠের কোনো বিকল্প নেই। জ্ঞানই শক্তি এবং জ্ঞানই আলো। একটি প্রদীপ দ্বারা হাজারও প্রদীপ জ্বালানো যায়; কিন্তু প্রদীপের আলোয় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ে না।
যে জাতি গ্রন্থ পাঠের আলো থেকে বহু দূরে, পৃথিবীতে সে জাতির অবস্থান তত পশ্চাতে। আজ দেশের পাঠাগারগুলোয় পর্যাপ্ত বই নেই, পাঠাগারের কক্ষ দূরে থাক। অথচ গ্রন্থপ্রেমীরা জাতিকে সুসভ্য ও আলোকিত করার জন্য ‘পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার চাই’ স্লোগান দিয়ে থাকেন।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিগুলোর রয়েছে শ্রেষ্ঠ লাইব্রেরি। সর্ববৃহৎ লাইব্রেরি আছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে-লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, যা ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত। এতে বইয়ের সংখ্যা ৭ কোটি ৪৪ লাখ। রাশিয়ার মস্কোতে রয়েছে লেনিন স্টেট লাইব্রেরি, যেখানে বইয়ের সংখ্যা ২ কোটি। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা ৬০ লাখ। জার্মানির মিউনিখে স্টেট লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা ২০ লাখ। আর আমাদের দেশের লাইব্রেরিতে করুণ দশা বিরাজ করছে।
আমি যেখানে অবস্থান করি, সেই ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলার কথাই ধরা যাক। এটি একটি বর্ধিঞ্চু জনপথ, ঢাকা জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। আয়তন ১৬৬.৮৭ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৬,০৩১১৪। কেরানীগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। এখানকার লোকজন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ করেছে। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী কেরানীগঞ্জ উপজেলার বাস্তা, গোয়ালখালি, কোনাখোলা, ব্রাহ্মানকীর্তেই, খাগাইল, খোলামোড়া ইত্যাদি গ্রামের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়।
মুঘল সুবাদার দ্বিতীয় ইব্রাহীম খান প্রমোদ কেন্দ্র হিসাবে জিনজিরা প্রাসাদ নির্মাণ করেন। সেখানে ঘষেটি বেগম, আমেনা বেগম, সিরাজদ্দৌলার স্ত্রী ও তার কন্যাকে বন্দি করে রাখা হয়। জমিদার প্রশান্ত কর্মকারের প্রাসাদও কেরানীগঞ্জ অবস্থিত। কেরানীগঞ্জবাসী তাদের এলাকাকে মডেল থানা হিসাবে দেখতে চায়। এই মডেল থানায় শুধু বাহ্যিকভাবে জৌলুস থাকবে তা নয়।
এখানে অত্যাধুনিক কমিউনিটি সেন্টার, পার্ক, ব্যাংক, মসজিদ, মন্দির আছে। আছে উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখানে কোনো পাবলিক লাইব্রেরি নেই। কায়কোবাদ পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেটা ধুলাবালি আর ইঁদুর-বাদরের দখলে। সেখানে কেউ যায় না। কোনাখোলা উপজেলায় একটি পাবলিক লাইব্রেরি ছিল। কিন্তু সেটা রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে পুলিশ ফাঁড়িতে পরিণত হয়েছে।
স্বামী বিবেকানন্দ একসময় বলেছিলেন, ‘হৃদয় ও মস্তিষ্কের মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব জাগে তখন হৃদয়কেই গ্রহণ কর। কারণ বুদ্ধিমান মানুষের চেয়ে হৃদয়বান মানুষ অনেক শ্রেয়। বুদ্ধিমান বুদ্ধি দিয়ে ভালোও করতে পারে আবার খারাপও করতে পারে। কিন্তু হৃদয়বান লোক কেবল ভালোই করবে।’ এই হৃদয়বান লোক কিভাবে তৈরি হবে তা আজ ভাবার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর সব মনীষী একবাক্যে স্বীকার করেছেন-হৃদয়বান মানুষ তৈরি হবে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মানুষ বই দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে।’ একটি সুখী-সমৃদ্ধ-শান্তিপূর্ণ জাতি চাইলে আমাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ মানুষের মন আলোকিত হলে শান্তির জন্য সংগ্রাম করা লাগবে না। শান্তিতে থাকাই হবে মানুষের স্বভাব। তাই ‘পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার চাই’ স্লোগান যেন আর স্লোগানের ভেতর সীমাবদ্ধ না থাকে সেটা সরকারকে অনুধাবন করতে হবে। মানুষ দুনিয়ায় আসে আর যায়।
কিন্তু আসা-যাওয়ার মধ্যে সে স্বাক্ষর রেখে যেতে চায়, যাতে সে মৃত্যুর পরও মানবের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে। এ জন্য রচনা করতে চায় জীবনদর্শন গ্রন্থ, যার স্থান লাইব্রেরি। আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত জাতি চাই, যা আমাদের মার্যাদা বিশ্ব পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠা করবে।
শহিদুল ইসলাম : প্রভাষক, দর্শন বিভাগ, সরকারি ইস্পাহানী কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
