মনে পড়লে হাসি পায়
ছাগল কেনা নিয়ে মজার স্মৃতি আছে -আবুল হায়াত, নাট্যব্যক্তিত্ব
Advertisement
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঈদ স্মৃতি
ছোটবেলায় কোরবানির ঈদ এলে অন্যরকম আনন্দ হতো। শৈশবের সেসব কথা মনের ভেতর এখনও দাগ কেটে দেয়। বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করে সেই দিনগুলোতে। বাবা আগে দুটি ছাগল কোরবানি দিতেন। ছাগল কেনা নিয়ে মজার স্মৃতি আছে আমাদের। আর এই স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দুকে ছিলেন আমার বাবা। বাবার কাছে থেকে অনেক কিছু শিখেছি। শেখার শেষ নেই। তবে কোরবানিতে যেটি শিখেছি তা হল পশুর চামড়া ছাড়ানো। বাবা ছাগল কোরবানির পর নিজ হাতে চামড়া ছাড়াতেন। কাজটা তিনি বেশ আনন্দ নিয়ে করতেন। বাবার এই আনন্দ দেখে মনে মনে আমারও ইচ্ছা জাগে। বাবা হয়তো বুঝতে পেরে আমাকে পশুর চামড়া ছাড়াতে শেখাতেন। বাবার দীক্ষায় আমিও ছাগলের চামড়া ছাড়ানো শিখি। এটা ছাড়াতে বেশ আনন্দ পাই।
এখন তো ছাগল কোরবানি দেয়া হয় না। এখন কোরবানি দেয়া হয় গরু। বছরে একটি করে গরু কোরবানি দিই। তবে কোরবানির গরু আমি আর আমার স্ত্রী দু’জন মিলে কিনে থাকি। বেশিরভাগ বাসার আশপাশে থেকেই গরু কিনি। এখন গরু কিনতে আগের মতো সময় বেশি নেয়নি। গাড়িতে বসে গল্প করতে করতে যাই। গাড়ি হাটের কাছে থামাই। কখনও আমি, আবার কখনও আমার স্ত্রী হাটে যায়। আমার গরু কেনার সিস্টেম হল হাটে গিয়ে জানতে চাই, দাম কত? বিক্রেতা একটা দাম বলে, আমি আমার মতো বলি। মাছ বাজারের মতো দামাদামি করে গরু কিনতে ভালো লাগে না। গরু পছন্দ হলে খুব বেশি আর সময় নেয়নি। দেয়ার মতো একটা দাম বলে কিনে নিই। তবে আগের মতো আর চামড়া ছাড়াতে পারি না এখন আর।
খবর পাঠ
ঘটনাটি অনেককে বলেছি। মনে হলেই ভীষণ হাসি পায়। সম্ভবত এটা আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার আগের ঘটনা। তখন আমি ছাত্র। বুয়েটে পড়ি। একবার ছুটিতে চট্টগ্রামে বাবা-মার কাছে যাই। বন্ধুরা সবাই ধরল, ‘একটি স্যাডো ড্রামা করব। তোকে করতে হবে।’ আমি গলা ভারি করে অভিনয় করলাম। অভিনয় শেষ করার পর এক ভদ্রলোক আমার কাছে এলেন। জানলেন রেডিওর প্রযোজক তিনি। বললেন, ‘আপনি খবর পাঠ করবেন?’ আমি লুফে নিলাম প্রস্তাব। পরদিন যেতে বললেন আমাকে। কখন যাব জানতে চাইলে বললেন, ‘সাতটায় নিউজ। চারটায় চলে আসবেন।’
অনেক অনুবাদ করতে হবে। সাত দিনের চুক্তি। সাত দিনই বেশ মজার ঘটনা ঘটল। শেষ দিন একটা শব্দের মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কেউ এটার মানে ভালো করে বলতে পারছিল না। খুঁজতে খুঁজতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাতটা বেজে গেছে। প্রযোজক বললেন, ‘শব্দ যেটি আছে সেটিই বলে যাবেন।’
আমি দৌড়ে নিচের তলায় স্টুডিওতে চলে এলাম। রুমে প্রবেশ করেই হাঁপিয়ে উঠলাম। শুরু করলাম খবর পাঠ। তখনকার গভর্ণর মোনেম খানের খবর পাঠ করছি। খবর পাঠের মাঝেই প্রযোজক আমার রুমে দৌড়ে এলেন। খবর পাঠের জন্য আমার হাতে ধরা বোর্ডটি টান মারলেন। আমি কিছুতেই সেটি হাতছাড়া করতে রাজি নই। আরও শক্ত করে ধরে রাখি বোর্ডটা। একপর্যায়ে আমিই জয়ী হই। তারপর খবর পাঠ করতে থাকি, মোনেম খান অমুক করছেন, তমুক করছেন। শেষের লাইনে এসে তার মাগফিরাত কামনা করি। আসল ঘটনাটি ছিল খবর পাঠের জন্য দেয়া পাতাগুলোর মধ্য থেকে মাঝের পাতাটা সিঁড়িতে কখন যেন পড়ে গেছে। এদিকে যিনি মারা গিয়েছিলেন সেদিন তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের একজন বিখ্যাত মানুষ। তাই খবরের শেষদিকে তার মৃত্যুসংবাদটি ছিল। প্রযোজক আমার হাতে ধরা বোর্ড থেকে পাতা টানছিলেন হয়তো দ্বিতীয় পাতাটি যুক্ত করে দিতে। পাতা সিঁড়িতে পড়ে যাওয়ার কারণে খবরে মোনেম খানের মাগফিরাত কামনা করে ফেলি আমি। এরপর খবর শেষ হয়। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন প্রযোজক। বললেন, ‘কী করলেন এটা! একজন জীবিত মানুষকে মৃত বানিয়ে ফেললেন!’ সবশেষে সম্পাদকের রুমে যেতে বললেন। সেখানে যেতেই আরেক দফা ঝড় তুললেন। আমিও সেদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, খবর পাঠের কাজ আর নয়।
যা কখনও বলা হয়নি
* ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় ৩য় বর্ষ থেকেই চুল পড়া শুরু করে। চুল পড়ার কারণে নায়কের অভিনয় করতে পারিনি।
* তিন বোনের পর আমার জন্ম। স্বাভাবিকভাবে আমার আদর বেশি ছিল। ছোট বেলায় পারিবারিকভাবে আমার নাম রাখা হয় খন্দকার মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন আবুল হায়াত গোলাম মাহবুব রবি। স্কুলে যাওয়ার পর স্যার ধমক দিয়ে একটু ছোট করলেন নাম। এরপর বাবা আরেক দফা নাম কাটলেন। এভাবে কাটতে কাটতে নাম ছোট হয়ে যায়। হয়ে উঠি আবুল হায়াত।
* বাবার রেলওয়ের চাকরির সুবাদে ছোট বেলায় চট্টগ্রামে বসবাস করতাম। সেখানে রেললাইন, পাহাড়ের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই ভালোলাগা থেকে হয়তো লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হই। সকাল হলে রেললাইনের ওপর গিয়ে পাথর কুড়াতাম। পাথর ঘষে আগুন ধরাতাম। অন্যরকম মজা হতো।
* ছোট বেলা থেকেই লাজুক প্রকৃতির ছিলাম। নারী দেখলে লজ্জায় দূরে সরে যেতাম। মঞ্চে উঠে নাটক করব-এটা কল্পনাতেই ছিল না। অথচ এখন অভিনয় ছাড়া থাকার কথা চিন্তাও করি না।
* অভিনয়ের জন্য একবার অডিশন দিয়েছিলাম। অডিশন দিয়ে ভেবেছিলাম আমিই সেরা! আমার ওপর কোনো অভিনেতা নেই। একপর্যায়ে কয়েকদিন পর জানানো হল, আমি উত্তীর্ণ হতে পারিনি। তারা আন্তরিকভাবে দুঃখিত!
* নাটক যখন লিখি তখন সাহস হয়নি। পরে মাহফুজা খাতুন ও শিরি হায়াত নামে নিজের লেখা নাটক চালিয়ে দেই।
অনুলিখন : ফরিদুল ইসলাম নির্জন
