স্বাধীনতা স্বাধীনতা

  হাবীবাহ্ নাসরীন ১৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একবার ভেবে দেখুন তো, আপনি নিজের ভাষায় কথা বলতে পারছেন না, স্বাধীনভাবে চলাফেরার স্বাধীনতা নেই, আপনার দাবি-দাওয়াগুলো পেশ করার কোনো জায়গা নেই, দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার কোনো সুযোগ নেই- এমন একটি জীবন পেলে আপনি কী করতেন? হয়তো মাথা পেতে মেনে নিয়ে চুপচাপ কাটিয়ে দিতেন সেই দুঃসহ পরাধীন জীবন। অথবা বিদ্রোহী হয়ে উঠতেন, নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও ছিনিয়ে আনতেন সেই আরাধ্য স্বাধীনতা। যেমনটা এনেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা।

সেই ১৯৫২তে ভাষা আন্দোলনে নিজের বুকের রক্তে রাজপথ ভাসিয়ে, প্রিয় জীবনটা অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মাতৃভাষার দাবি। সেই অনুপ্রেরণাই বুঝি প্রবাহমান ছিল আমাদের রক্তে। তাই তো আঠারো বছর পর স্বাধীনতার দাবিতে রক্তে ফের বেজে উঠেছিল সেই দামামা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার পরে আমরা চুপসে যেতে পারতাম। ভয় আর উৎকণ্ঠায় চুপ হয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু ভয়ে চুপ হয়ে যাওয়াটা যে আমাদের রক্তে নেই! তাই তো জাতির পিতার আহ্বানে আমরা কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।’ তাই তো আমরা নিজের জীবনটা উৎসর্গ করতেও উৎকণ্ঠিত হলাম না!

একে একে নয় মাস যুদ্ধ হল। ঝরে গেল আমাদের ত্রিশ লাখ তাজা প্রাণ। অসংখ্য মা-বোন হলেন সম্ভ্রমহারা। তবু এ যে মরণপণ লড়াই। বাঁচতে হলে স্বাধীনভাবেই বাঁচব। পরাধীনতা যে মৃত্যুর চেয়েও কষ্টকর! আমাদের সাহস আর একাগ্রতার কাছে মাথানত করতে বাধ্য হল পাকিস্তানি বাহিনী। অবশেষে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে আত্মসমর্পণ করল। জয়ী হলাম আমরা। যুদ্ধ শেষে কেউ কেউ ফিরে এলেন, অনেকেই ফিরে এলেন না। কত মা যে তার খোকার অপেক্ষায় কাটিয়ে দিয়ে গেল পুরো জীবনটাই!

বলা হয়ে থাকে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। এই গুরুদায়িত্বটিই আমাদের ওপর অর্পণ করে গেছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। তাদের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া প্রিয় এ স্বাধীনতাকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। আজ যে আমরা স্বাধীন দেশে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি এর সবটুকু অবদান তো তাদেরই। আমরা যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিই তাদের বীরত্বগাঁথা ইতিহাসের কথা।

বছরজুড়ে বিভিন্ন দিবসে তো বটেই, স্বাধীনতা মিশে আছে আমাদের জীবনযাপনের প্রতিটি পরতে। তাই তো কোথাও লাল-সবুজের ছটা দেখলে রক্তে দোলা লাগে, ওটাই যে আমাদের প্রিয় পতাকার রং! কোনো দূরদেশে বসেও ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ শুনলে চোখে জল চলে আসে, ওটাই যে আমাদের প্রিয় জাতীয় সঙ্গীত! আমাদের মতো জন্মেই স্বাধীন দেশ দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্য সবার হয় না। আমরা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান।

আমাদের এই সৌভাগ্যের ধারাবাহিকতা কখনও নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। প্রিয় স্বাধীনতাকে আগলে রাখতে হবে পরম মমতায়। জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, ‘আমি আমার নিজের দেশ নিয়ে অসম্ভব রকম আশাবাদী। আমাকে যদি একশ’বার জন্মাবার সুযোগ দেয়া হয় আমি একশ’বার এ দেশেই জন্মাতে চাইব। এ দেশের বৃষ্টিতে ভিজতে চাইব। এ দেশের বাঁশবাগানে জোছনা দেখতে চাইব।’ আমাদেরও একইরকম আশাবাদী হতে হবে, স্বপ্ন দেখতে হবে আপন এই মাতৃভূমি নিয়ে।

আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের কাছে জীবনের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা যেন কখনও বিপন্ন না হয়। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য- আর কোনো কিছুকেই আমরা আমাদের কাছে ঘেঁষতে না দিই। আমাদের রক্তে যে গৌরবময় ইতিহাস প্রবাহমান, সেই ধারা যেন কখনও বন্ধ না হয়। জীবন দিয়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা বজায় থাকুক আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধে, পারস্পরিক সহযোগিতা আর সহমর্মিতায়। ভালোবাসা রোজ একবার করে উঁকি দিয়ে যাক আমাদের দুয়ারে, স্বাধীনতার সুখ নিয়ে আমরা প্রাণ ভরে বাঁচি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×