সিপিডির ভার্চুয়াল ব্রিফিং
তেলের দাম বাড়ানো ভুল পদক্ষেপ
আমদানি শুল্ক ও দুর্নীতি কমিয়ে লোকসান সমন্বয়ের পরামর্শ * মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া বিজ্ঞানসম্মত নয়
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাম্প্রতিক সময়ে সরকার জ্বালানি তেলের দাম যে বাড়িয়েছে তা অযৌক্তিক, অগ্রহণযোগ্য এবং ভুল পদক্ষেপ। এটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। নৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়। সাধারণ মানুষের স্বার্থে এই দাম আগের অবস্থায় ফিরে নেওয়া উচিত।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে বুধবার এসব কথা বলা হয়। সেখানে বক্তব্য দেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ। সরকারের লোকসান কমাতে আমদানি শুল্ক কমানো এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত-এমন পরামর্শ দেওয়া হয় ওই ব্রিফিংয়ে।
প্রসঙ্গত, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় বাজারে দাম বাড়ানো হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ বাড়ানো হয়েছে ২৩ শতাংশ। এরপর মালিকপক্ষের দাবির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবহণ ভাড়াও বাড়ানো হয়। এক্ষেত্রে বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২৭ শতাংশ এবং লঞ্চের ৩৫ শতাংশ। সোমবার থেকে এই বাড়তি ভাড়া কার্যকর হয়েছে। এসব বিষয় নিয়েই সিপিডির সংশ্লিষ্টরা ব্রিফিংয়ে কথা বলেন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুক্তিসংগত নয়। সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং রাজনৈতিকভাবে এটা কোনো আলোকিত সিদ্ধান্ত নয় বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। মূল প্রবন্ধে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে হয়তো বিত্তবানদের ওপর খুব একটা প্রভাব পড়বে না। কিন্তু যারা দরিদ্র এবং যারা নতুন করে দরিদ্র হয়েছে, যারা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিতে নতুন করে রিকোভারির চেষ্টার মধ্যে রয়েছে, তাদের ওপর সে প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, আমরা যদি ন্যায্যতার কথা বলি সেই ন্যায্যতার দিক থেকেও এটা অন্যায্য পদক্ষেপ। তিনি আরও বলেন, এই দাম বাড়ানো হচ্ছে বিপিসির লোকসানের কথা বলে। বিপিসির লোকসানের কারণ কী? আমরা জানি এখানে সুশাসনের অভাব রয়েছে। বিপিসির তেল সংগ্রহ, বিক্রি, মার্কেটিংয়ে সিস্টেমের ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের অনেক অভিযোগ রয়েছে। তারা বিভিন্ন মার্কেটিং কোম্পানিকে দিয়ে তেল মার্কেটিং করে। সেখানে দুর্নীতির খবর আসছে। যে হারে দাম বাড়ানো হয়, বাজারে তার থেকে বেশি হারে প্রভাব পড়ে-এমন অভিযোগ করে ড. ফাহমিদা বলেন, যখন কোনো একটা জিনিসের মূল্য ৫, ১০ বা ২০ শতাংশ বাড়ানো হলো, তখন আমরা বাজারে গিয়ে দেখব, মূল্য অনেক বেশি। এই যে এখন তেলের দাম ২৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, সেখানে বাসের ভাড়া প্রকৃতপক্ষে ৫০ শতাংশ বেশি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মূল্য নির্ধারণ করার মেকানিজমে আমরা বৈজ্ঞানিক কোনো পদ্ধতি দেখি না। আমরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকি, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন মূল্য কম থাকে তখন সেটার সুফল কেন জনগণ পায় না? যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হয়, লোকসানের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানো হয়। এই যুক্তিকে কোনো বৈজ্ঞানিক বা সঠিক যুক্তি বলে মনে হয় না। সুতরাং এই প্রাইস মেকানিজমটিকে ঠিক করার প্রয়োজন রয়েছে। মূল্যবৃদ্ধি বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে জ্বালানি তেল আবার আগের দামে ফিরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করে ফাহমিদা বলেন, এটি (জ্বালানি তেল) একটি কৌশলগত পণ্য। এই পণ্য ছাড়া অর্থনীতি অচল হয়ে পড়বে। এই প্রেক্ষিতে আমরা বলছি পূর্ববর্তী দামে ফিরে যাওয়া দরকার। ডিজেল এবং কেরোসিনের যে মূল্য বাড়ানো হয়েছে, আমরা এই মূল্য প্রত্যাহার করে আগের মূল্যে ফেরত যাওয়ার সুপারিশ করছি। তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এটা কীভাবে সম্ভব তাও উল্লেখ করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, তেলের ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক কর রয়েছে। সেখান থেকে কোনো একটি শুল্ক প্রত্যাহার করে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া যেতে পারে।
যখন অর্থনীতিতে কোনো ধরনের সংকট দেখা দেয় বা জরুরি অবস্থা দেখা দেয়, মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের ওপর একটা বোঝা হয়ে দেখা দিচ্ছে, তখন সরকারের হাতে বিভিন্ন ধরনের রাজস্ব নীতি থাকে। সেই নীতি ব্যবহার করতে হয়। ভর্তুকি বিভিন্ন সময় নানাভাবে দেওয়া হয়ে থাকে। এখানে কেন এই মুহূর্তে দেওয়া হবে না? না দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভুল। এখান থেকে সরে আসা উচিত। এক প্রশ্নের উত্তরে ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিদিন ২০ কোটি টাকা ধরলে বছরে ৭ হাজার দুইশ কোটি টাকা। এই ৭ হাজার দুইশ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া খুব কঠিন বিষয় না। খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০২২ অর্থবছরে প্রক্ষেপণ হচ্ছে বিপিসি থেকে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ সরকার ৭ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা আয় করার কথা লিখেছে। সুতরাং ৭ হাজার দুইশ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার জন্য এই আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করলে আর বাড়তি টাকার প্রয়োজন হয় না। শুধু আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট সমন্বয় করেই সরকার লোকসানের টাকা সমন্বয় করতে পারে।
