বিদ্যুৎ-গ্যাস-সার নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব
মূল্য সমন্বয় না হলে বাড়াতে হবে ভর্তুকি
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব :‘কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো যাবে না’
Advertisement
মিজান চৌধুরী
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য বেড়েছে ২৩৪ শতাংশ। টিএসপি সার বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। এলএনজি গ্যাসের মূল্য বেড়েছে প্রতি এমএমবিটিইউতে ১৫ মার্কিন ডলার।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে এসব পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে তা আগের মূল্যেই বিক্রি হচ্ছে। কারণ সরকার মূল্য সমন্বয় (বৃদ্ধি) না করে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারে ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছরে এসব খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হবে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব-‘হয় মূল্য সমন্বয় করতে হবে, না হলে ভর্তুকি আরও বাড়াতে হবে।’ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আর্থিক মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অডিনেশন কাউন্সিল বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
অর্থ মন্ত্রণালয় হিসাবে মূল্য সমন্বয় করা না হলে আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ অর্থের প্রয়োজন হবে ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এটি আগামী অর্থবছরের জিডিপির ১ দশমিক ৯০ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ আছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ টাকার অঙ্কে এসব খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন ২৭ হাজার ৯১০ কোটি টাকা।
মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সারে কৃষককে দেওয়া হচ্ছে ভর্তুকি মূল্যে। গ্যাস যাচ্ছে আবাসিকসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে। এসব পণ্যের মূল্য সমন্বয় করতে হলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। অর্থ বিভাগ প্রস্তাব করেছে দুটিই।
মূল্য সমন্বয় না হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, এর আগে নতুন বছরের শুরুতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে অর্থ বিভাগ। অর্থনৈতিক কো-অডিনেশন কাউন্সিল বৈঠকে দেওয়া হয়েছিল সে প্রস্তাব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মূল্য বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যে কারণে সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে বরাদ্দের চেয়ে আরও প্রায় ১২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো যাবে না। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে। আর ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে যে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে সেজন্য রাজস্ব আহরণ আরও বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, রপ্তানির সব খাতে প্রণোদনার প্রয়োজন আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।
জানা গেছে, বিশ্ববাজারে এলএনজি গ্যাসের মূল্য বেড়েছে। যেখানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য ৫ মার্কিন ডলারের শতাংশের নিচে ছিল। সেটি এখন ২০ মার্কিন ডলারে উঠেছে। যে কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়, আগামী (২০২২-২৩) অর্থবছরে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করতে হবে। আর সেটি না হলে ভর্তুকির প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। সূত্র আরও জানায়, এখনই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। যে কারণে সংশোধিত বাজেটে এ খাতে ভর্তুকি ৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা না হলে এলএনজির আমদানির মূল্য পরিশোধ এবং প্রণোদনা প্যাকেজের সুদ ভর্তুকি পরিশোধ করতে আগামী অর্থবছরে ১৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
সূত্র মতে, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মোট ভর্তুকির অঙ্ক বাড়ানো হয়েছে। সেখানে সবচেয়ে বেশি গেছে এলএনজি খাতে। অর্থবছরের শুরুতে এ খাতে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে বেড়ে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এদিকে সারের মূল্য সমন্বয় করা না হলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষি প্রণোদনা বাবদ ১৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে হিসাব কষছে অর্থ বিভাগ। এরই মধ্যে সংশোধিত বাজেটে সারের ভর্তুকি ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
জানা গেছে, বিশ্ববাজারে সারের মূল্য অস্বাভাবিক বেড়েছে। বেশি দামে আমদানি করে ভর্তুকি মূল্যে কৃষকের হাতে তা তুলে দেওয়া হচ্ছে। সরকার এই মহূর্তে কৃষকের সারের মূল্য বাড়ানোর পথে হাঁটতে চাচ্ছে না। ফলে এ খাতে ভর্তুকি বাড়ানো হবে এমনি ধরে নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এছাড়া করোনার কারণে গরিব মানুষকে কম মূল্যে চাল দেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে স্বল্পমূল্যে বিতরণ কর্মসূচির আওতায় ৩২ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন চাল দেওয়া হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে এই কর্মসূচির ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। আগামী তিন মাসে বাকি ২৫ শতাংশ বিতরণ করা হবে। আর এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে ভতুকি দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে আগামী অর্থবছরের জন্য এ খাতে আরও ৭৪৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৬ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার ভর্তুকির প্রস্তাব করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
