Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

সিপিডি ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আলোচনা

বাজেটে জিডিপির লক্ষ্য রাজনৈতিক অভিলাষ

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেটে জিডিপির লক্ষ্য রাজনৈতিক অভিলাষ

ফাইল ছবি

নির্বাচনকে সামনে রেখে যে ধরনের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি দরকার ছিল, প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে তা নেই। ভর্তুকি ও কর রেয়াত সব একসঙ্গে মিলিয়ে অঙ্কটা বড় দেখানো হয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ। এটি বাস্তবসম্মত নয়। এখানে প্রবৃদ্ধি কোনো পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, রাজনৈতিক অভিলাষের প্রকাশ।

আর গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ঘাটতি হলে সরকারের কর আহরণ ও উন্নয়ন ব্যয়, উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে বাজেটবিষয়ক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরম এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। এতে সহযোগিতায় ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সিপিডির বিশেষ ফেলো-ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান, ব্র্যাক শিক্ষা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রোগ্রাম হেড সমীর রঞ্জন নাথ, দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ড. দিবালোক সিংহ এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রেসিডেন্ট ড. আসিফ ইব্রাহিম প্রমুখ।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কোনো পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক অভিলাষের প্রকাশ। এ বছর সাড়ে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। এটি নির্বাচন উপলক্ষ্যে উদ্দীপনা তৈরির জন্য দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনের বছরে যে জনতুষ্টিমূলক বাজেট দেওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। তিনি বলেন, নির্বাচনি বাজেট বলা হলেও এটি তা নয়। এখানে পরিসংখ্যান নিয়ে খেলা হয়েছে। আমি ছলনা বললাম না। অঙ্কটা বড় দেখাতে ভর্তুকি, কর রেয়াত একসঙ্গে মিলিয়ে দেখানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক বাজেটে আমরা গৎবাঁধা সমালোচনা করি। এটি অযৌক্তিক নয়। কারণ আমাদের সমস্যা তো একই। আর একই রোগের জন্য ডাক্তারকে ভিন্ন ওষুধ দিতে বলা যাবে না। তার মতে বিশ্বে বাজেট প্রক্রিয়ার একটি র‌্যাংকিং হয়। এই র‌্যাংকিংয়ে ১০০টি দেশের ২০০৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩৮তম। এখন হিসাব করলে দেখা যাবে সেটি ৯৫ নম্বরে চলে এসেছে। বাজেট প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে এই র‌্যাংকিং নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ সঠিক সময়ে বাজেটের অর্থ পাওয়া গেল কিনা, দলিল আছে কিনা এবং জনগণের অংশগ্রহণ আছে কিনা ইত্যাদি। ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, অনেকে দাবি করেন, রাজনৈতিক কল্পকথা হিসাবে, আমরা যে বাজেট দিই, তা আমরা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করি। কিন্তু এটি সত্য নয়। এ ধরনের বক্তব্যকে তথ্য-উপাত্ত সমর্থন করে না। কারণ বাজেট ঘোষণা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান থাকে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের যতটুকু উন্নতি হয়েছে, তা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় নিতান্তই কম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্য হার কমছে, কিন্তু বৈষম্য বাড়ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ আগামী দিনে এগিয়ে যেতে চায় কিনা সেটি বড় প্রশ্ন। কারণ এতে আমাদের প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়।

তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে সম্পদ নিয়ে যে জরিপ হয়েছে। ওই জরিপে বৈষম্যের ফল এখনো পাওয়া যায়নি। গ্রাম থেকে খাদ্য, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের জন্য মানুষ শহরে আসছে। এটি কি টেকসই উন্নয়ন হবে কিনা, সেটি আমাদের প্রশ্ন। তিনি বলেন, যেসব দেশ জিডিপি অনুপাতে বেশি টাকা খরচ করে তাকে বড় বাজেট বলা হয়। এ ধরনের ১৪৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৭তম। বড় বাজেটের মধ্যে সরকার খরচ করে ৩২ দশমিক ২ শতাংশ। আর বাংলাদেশ সরকার ব্যয় করে ১৫ বা ১৬ শতাংশ। ২০২২ সালে ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ জিডিপি করার কথা থাকলেও হয়েছে ১৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। সিপিডির এই বিশেষ ফেলো বলেন, ২০১৪ সালে কর আহরণের যে গতি ছিল, পরবর্তীকালে তা কমেছে। একইভাবে ২০১৮ সালে নির্বাচনের পর আবারও একইভাবে কমে গেছে। গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ঘাটতি হলে সরকারের কর আহরণ ও উন্নয়ন ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশে কর আহরণের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ কর হলো পরোক্ষ কর। এখানে নিুবিত্তরা যা কর দেয়, উচ্চবিত্তরাও একই হারে কর দেয়। তাহলে প্রত্যক্ষ কর কতটুবু বাড়ল? ভ্যাটের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বাংলাদেশে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ভ্যাট দিচ্ছেন। এটি কোনোভাবেই আয়করের তুলনায় কম নয়। আমরা এটিকে মৌলিক বৈষম্যের একটি বড় অংশ হিসাবে দেখছি। তিনি বলেন, এখনো উন্নয়ন কাজের ৪০ শতাংশ বিদেশি সাহায্যে হয়। একদিকে বলা হচ্ছে, বিদেশি সাহায্য দরকার নেই, অন্যদিকে আমরা দেখি অনেক উচ্চমূল্যে আমরা বৈদেশিক ঋণ নিচ্ছি। সিপিডির এই বিশেষ ফেলো বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিবিএস এক ধরনের কথা বলছে, অর্থ মন্ত্রণালয় আরেক পরিসংখ্যান দিচ্ছে। তাহলে কি ডান হাত-বাম হাত একসঙ্গে কাজ করছে না? এ রকম হলে কিন্তু বাজার উলটাপালটা আচরণ করবে। তিনি আরও বলেন, গত বছর রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ শতাংশ। কিন্তু অর্জন মাত্র ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ১২ শতাংশ। কিন্তু ডলারের দাম ধরা হলো ১০৪ টাকা। অথচ এখনই বাজারে এটি ১০৮ টাকা হয়ে গেছে।

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের যে সম্পদ আছে, সেটি বণ্টনে নায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, এনবিআর কত টাকা আয় কত করতে পারল, তা নিয়ে কথা বলি। একইভাবে কত টাকা সাশ্রয় করা যায়, তাও গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। আমাদের ১ হাজার ২৫০টির মতো প্রকল্প আছে। যার মধ্যে ২০২৪ সালেই ৮৭৮টি শেষ করতে হবে। এর অধিকাংশই আগের প্রকল্প। এগুলোর কারণেই সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু বাজেট প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অনেক বৈসাদৃশ্য রয়ে গেছে। এগুলো এখন প্রতীয়মান হচ্ছে।

সমীর রঞ্জন নাথ বলেন, শিক্ষার বাজেট বলতে আমরা যেটা বুঝি, তার মধ্যে এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যোগ করে একটি বড় অঙ্ক দেখানো হয়েছে। এর আগে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাজেট যখন শিক্ষার ক্ষেত্রে জুড়ে দেওয়া হয়, তা কিন্তু একটা বড় অঙ্কে দাঁড়িয়েছিল। ২২-২৩ অর্থবছরে ১০০ টাকার মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমিয়ে বলা হচ্ছে, বাকিটা পরে দেখা যাবে।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অন্য সব মন্ত্রণালয়ের মতো জ্বালানি ও জলবায়ু নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের সঙ্গে বাস্তবায়নের ফারাক থেকে যায়। আমরা বাজেট বিশ্লেষণের সময় বলেছি, বাজেট এমন এক সময়ে দেওয়া হয়েছে, যখন আমরা আইএমএফ’র ঋণের আওতায় রয়েছি। সেই শর্ত অনুযায়ী, ১১টি খাতে সংস্কার করতে হবে। এরমধ্যে জলবায়ু খাতে সংস্কারের একটি শর্তও রয়েছে। কিন্তু, বাজেটে আমরা সেটির প্রতিফলন দেখতে পাইনি।

নির্বাচন জনকল্যাণমূলক বাজেট

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .