|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১.মুক্তিছায়া কতো দূর দুর্লক্ষ্য সুদূর...
হাসান হাফিজ
নিশি পাওয়া মানুষের আমোদ আহ্লাদ সাধ বলতে কিছু নাই।
আছে শুধু ঘোরলাগা সম্মোহন, প্রবল বাহির-টান, তাতাপোড়া জান।
নিশি পাওয়া মানুষের বোধবুদ্ধি কোথাও হারিয়ে যায়, কেউ খুঁজে পায়?
খুঁজতে খুঁজতে একজীবন পরমায়ু নিভে আসে উদাসীনা লিলুয়া বাতাসে
দীর্ঘশ্বাসই সত্য হয়, শুধু আন্ধা পরাজয়, লোকসানি পোড়া ছাই ক্ষয়
নৈতিকতা বনবাসে যেই দেশে, তার কোনো উদ্ধারের সম্ভাবনা নাই
শুধু আছে বিপর্যয়, ভাঙন নৈরাশা ধস, আছে লুপ্তি নিশা অবসান।
যেই দেশে নারীর সম্মান নেই, যেই দেশে খঞ্জ আর বামনের দাপট প্রতাপ
প্রত্যাশিত মুক্তিছায়া বড়োই দুর্লক্ষ্য জানি, ফুটে ওঠে তারই চিহ্ন ছাপ...
২. পানশালার সম্পর্ক
হাসান মাহমুদ
ও ভাদ্র ও শরৎ
পানশালার সাথে
পকেটের কী গভীর
সরল-সৌহার্দ্র!
নন্দন শিল্পকলা
মিলে একাকার
জীবন আর অভ্যাস
প্রশান্তি নিয়ে হাঁটে
কুশাশার পাড়...
ঘামের শরীর জুড়ে
স্বপ্ন গভীর
অহেতুক সংলাপ
এখানে বধির..
৩. নির্জন নারী
আসাদ উল্লাহ
শাওয়ারে দাঁড়িয়ে ভিজে ভিজে একটি গোলাপ
খুলে দেয় সব ভাঁজ সৌন্দর্যের কী সুন্দর নগ্নতা!
হেলে-দুলে দেখে আর কী কী আছে গোপনে
নিউইয়র্কের টমকিন্স স্কয়ার পার্কে কিছুই থাকে না গোপন,
যার যেমন ইচ্ছে উন্মোচিত হয়, হতে পারে,
শাওয়ারের নিচে গোলাপ বানায় স্বাধীন স্কয়ার পার্ক।
রৌদ্রালোকে যাকে আমরা অসভ্যতা বলি
নির্জনতায় তা হয়ে যায় সভ্যতার শিল্প-
নানান রঙের সৌধ, উজ্জ্বল কার্নিভাল।
৪. কবি ও কবিতা
হাইকেল হাশমী
প্লেটো তার প্রজাতন্ত্র থেকে কবিদের নির্বাসিত করতে চেয়েছিলেন
কারণ- কবিরা মিথ্যা এমনভাবে বলে যেটা মনে হয় সত্য।
তাই তো, প্লেটো সঠিক, কবিরা মিথ্যা বলে। কবিরা আঁধারে আলোর
প্রত্যাশা করে, তারা বলে দুঃখ করো না সুখের ছায়া নামবে
তারা ঝরে পড়া ফুলের মধ্যে বসন্তের বার্তা দেখে, তারা জলের একটি
বিন্দুতে সাগর-মহাসাগর দেখে। তারা তো মিথ্যা বলে।
শেলী মনে করত কবিরা এই পৃথিবীর অস্বীকৃত আইনপ্রণেতা।
তাও মেনে নিতে হয়। কবিরা ভালোবাসার কথা বলে, ঘৃণাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে,
অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলে। স্বাধীনতার কথা বলে,
স্বাধীনগামী জনগণের আকাক্সক্ষার কথা বলে, তাদের আশা-নিরাশার কথা বলে।
তারা কৃষকের কথা বলে, মেহনতি মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কথা বলে।
এই কথারমালা দিয়েই তো এক সময় প্রণিত হয় আইন।
আউডিন বলত- কবিতা কিছুই করতে পারে না, কবিতা কিছুই করাতে পারে না।
এই কথা তো মানতে পারি না। কবিতার সুরে প্রেমিকদের হৃদয় একত্রে স্পন্দিত হয়।
কবিতাই তাদের মনের বলা না বলা কথার প্রকাশ, কবিতা তো দুই ভিন্ন মানব হৃদয়ের সেতুবন্ধন।
কবিতা বিপ্লবীদের পথ চলার পথপ্রদর্শন। বিপ্লব আর বিপ্লবীচিন্তা প্রসারের মাধ্যম।
যত বিপ্লবীচিন্তার আবির্ভাব তা তো কাব্য-
হোক না ধর্মগ্রন্থ, হোক না যে কোনো প্রচার, লোকগীতি, উপদেশ, সবই তো কাব্য।
কবিরা যা করতে পারে, পারে না সেটা করতে কোনো শাসক, যোদ্ধা, বিজেতা। ভালোবাসার একমাত্র মাধ্যম, একমাত্র ভাষা কবিতা। আর তার বাহক হল- বিনীয়, নম্র, গর্বিত, অভিমানী
নিজেকে যে নিজেই চিনে না- সেই সত্তা, আমাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা কবিসত্তা।
৫. মরীচিকা
মারুফুল ইসলাম
সক্রেটিসের নমুনা আপেলে কোনো গন্ধ ছিল না
তবু প্রথমে একজন
তারপর একজন ছাড়া অন্যরা
সবশেষে সকলেই গন্ধ পেয়েছিল
এভাবেই হয়ত মিথ্যেটাই হয়ে ওঠে সত্যি
এবং রচিত হয় জীবনসত্য
এই মিথ্যেময় সত্যের পেছনে আমরা ছুটে বেড়াই জীবনভর
কালে কালান্তরে
দেশে দেশান্তরে
বিশ্বসংসারে তুলি তোলপাড়
ছারখার করি রাজ্যপাট
উচ্ছন্নে যায় জনপদ
জীবন এবং সত্য বস্তুত মরীচিকা
৬. তোমাদের প্রতীক্ষায়
আদ্যনাথ ঘোষ
খেলার সাথীদের কলকোলাহল
গল্পের বারান্দায় খই খই হাসি
আকাশে রক্তিম বর্ণের চলাফেরা
সোহাগী আল্পনায় মাখা ঝুল বারান্দাটা
আকাশের সমস্ত নীল ঢেলে দিয়ে
সুনীলদার কবিতার সারাটা পাঁজর জুড়িয়া
জোছনারাঙা খুশি খুশি দিগন্তে
এখনও পৃথিবীর সারাটা উঠোন জুড়ে
নতুন দিনের সূর্যের ঢেউ, হৃদয় জুড়ে ভরা যৌবন,
দখিনা জানালায় স্বপ্নের জোয়ার আর
উজালা আদর মাখিয়া সোনালি দিনগুলো
বাগানের ফুলের সাথে ফুটে আছে একসাথে
তোমাদের প্রতীক্ষায়।
৭. পুঁথি পাঠ
তাহমিনা কোরাইশী
কে আর শোনে আজকাল পুঁথিপাঠ সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি
নানা বর্ণে আনন্দে ঝড়-ঝঞ্চায় আবর্তিত জীবনের খুনশুটি
আঁচলে বাঁধা ছিল কিছু কথামালা-ফুল, শোনাবো তোমায়
রূপময়তায় আমার জমানো যত শ্লোক ঐ পুঁথিখানা
কখনও শুনেছো আনন্দ সৈকতে লোনা জলে হুমড়ি খেয়ে
কখনও দিয়েছ উপদেশ শাসনের স্বরে-উপসংহারে
একান্তই আমার সত্ত্বার গভীরে তোমার উষ্ণ শ্বাস
কত শত ছলে কৌশলে স্পর্শে দেহ স্পন্দন যায় বেড়ে
তুমি তো ছিলে তখনও পাশেই।
নিজের মাঝে নিজেই আবর্তিত আজ
সুনামী সাইক্লোন দুমড়ে যাওয়া একাকী এ জীবন
মরীচিকা জল তপ্তদাহে ঐ প্রান্তরের হাতছানি
থিতিয়ে যাওয়া পরিপাটি গুচ্ছ কবিতা আমার এই পুঁথি
শিলাখন্ডে জমাটবদ্ধ পাঁজরের ভাঁজে ভাঁজে
যদি উষ্ণ বাতাসের খামে উড়িয়ে দেয়া যেত,
আমার এই পুঁথির শ্লোক...
তোমার এখন বিলাসী সময় অফুরান
পড়বে চিঠিটি আমার আকাশের গায়ে গায়ে
আমার কেবল এই সাশ্রয়ী সময়
শেষ হয়েও আজকাল, হয় কি বলো তা শেষ!
৮. কদমের গন্ধ নেই
শফিক আলম মেহেদী
এখন এখানে কেউ
কারো জন্য অপেক্ষা করে না
চারিত্র্য বদলে গেছে সবকিছুর
মানুষ ও প্রকৃতির;
এখন বর্ষায়
কদমের গন্ধ নেই
পুড়ে খাক ভরা-নদী গভীর-সবুজ
মেঘেরা ফেরারী বলে
বৃষ্টি শোনায় না অভিসারী গান
নষ্টের দখলে গিয়ে সব সুন্দর
বিষম অসহ্য ঠেকে পারিজাত এ জীবন!
