সিজিএস ও সিআইপিই সংস্থার জরিপ
সরকারি সেবা পেতে ৫২ ভাগ উদ্যোক্তাকে ঘুস দিতে হয়
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা পেতে ৫২ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে (এসএমই) ঘুষ দিতে হয়। এদের মধ্যে বড় একটি অংশ বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়েছেন। বাকিরা ঘুস দিলে দ্রুত ও ঝামেলা ছাড়া সেবা পাওয়া যায়-এমন ধারণা থেকে দিয়েছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কাছে যারা অভিযোগ করেছেন তাদের ৭০ শতাংশ কোনো প্রতিকার পাননি। ৭১ শতাংশ উদ্যোক্তার মতে দুর্নীতির ফলে বাজারে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারি সেবা পেতে ব্যাপক হারে দুর্নীতি ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের নিয়ে করা এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। যৌথভাবে জরিপটি করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ও বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ (সিআইপিই)। ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে জরিপটি পরিচালিত হয়। এতে দেশের এসএমই খাতের সঙ্গে জড়িত ৮০০ উদ্যোক্তা অংশ নেন। এদের মধ্যে ৪০০ উদ্যোক্তাই উৎপাদন খাতের এবং বাকি ৪০০ সেবা খাতের সঙ্গে যুক্ত।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯০ শতাংশ উদ্যোক্তা মনে করেন দুর্নীতি একটি সংক্রামক ব্যাধি। ৬১ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, তারা সরকারি বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানে ঘুস দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি নিয়ম-কানুন এড়িয়ে গেছেন। ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন করা জরুরি বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। এদের ৭৮ শতাংশ মনে করেন দুর্নীতি রোধে বেসরকারি উদ্যোগে একটি প্ল্যাটফরম করা উচিত।
জরিপের সময় উদ্যোক্তারা জানান, সরকারি বিভিন্ন সেবা পেতে তাদের ঘুস দিতে হয়েছে। জরিপ অনুসারে, কোনো কোম্পানির নতুন নিবন্ধন নেওয়া ও নবায়নের ক্ষেত্রে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উদ্যোক্তাকে ঘুস দিতে হয়। এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের মতে, দুর্নীতির অন্য বড় জায়গাগুলো হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নিবন্ধনসংক্রান্ত অফিস, রাজস্ব দপ্তর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, ভূমি নিবন্ধন কার্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।
উদ্যোক্তারা বলেন, তারা বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন, সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘুস দিলে সময় বাঁচে, দ্রুত কাজ হয়। এ কারণে প্রায় ৬১ শতাংশ এসএমই উদ্যোক্তা কোনো না কোনো সময়ে সেবা নিতে গিয়ে অনৈতিক পথ বেছে নিয়েছেন। তবে অত্যধিক দুর্নীতির কারণে বাজার আরও অসম হয়ে ওঠে বলে মনে করেন ৭১ শতাংশ উদ্যোক্তা। পাশাপাশি সরকারি কঠোর ও জটিল নিয়মকানুনও অনেক সময় দুর্নীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে বলে মত তাদের। নতুন ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া ও পুরনো ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে ঘুসের প্রবণতা বেশি। নতুন লাইসেন্স নিতে সাড়ে ৩৬ শতাংশ এবং আগের লাইসেন্স নবায়নে ৩২ শতাংশ উদ্যোক্তাকে ঘুস দিতে হয়েছে। উদ্যোক্তারা বলেন, সরাসরি ঘুস, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি ও মাত্রাহীন পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এসব দুর্নীতি হয়। এর মধ্যে সরাসরি ঘুস ৭৮ শতাংশ, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ৬০ শতাংশ, চাঁদাবাজি করে ৪৬ শতাংশ, স্বজনপ্রীতি ৪৪ শতাংশ, মাত্রাহীন পৃষ্ঠপোষকতা ৪৩ শতাংশ।
উদ্যোক্তারা মনে করেন, দুর্নীতি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্নীতির চেয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দুর্নীতি এসএমই খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবে দুর্নীতির অভিযোগকারীর সংখ্যার তুলনায় সরকারি সংস্থায় লিখিত অভিযোগ প্রদানের হার অনেক কম। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ে অভিযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই অভিযোগের প্রতিকার পাননি। জরিপে দুর্নীতি বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করছে বলে প্রচার করছে। এ ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের মতামত চাওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের ৪৬ শতাংশই বলেছেন, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে দুর্নীতির কলেবর বেড়েছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি সংস্থার দুর্নীতি রোধে অভিযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ করার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের অভিযোগ আমলে ঘটনার তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতেও সুপারিশ করা হয়।
