Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সহজে ব্যবসা সূচক : আসুন শিখি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের কাছে

Advertisement

Icon

ডা. জাহেদ উর রহমান

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সহজে ব্যবসা সূচক : আসুন শিখি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের কাছে

Advertisement

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা দূর করতে দীর্ঘ সময় লাগবে- বাংলাদেশের যে কোনো সংকট নিয়ে এ ধরনের একটা আপ্তবাক্য খুব শোনা যায়।

ধরা যাক, বাংলাদেশের দুর্নীতি নিয়ে কথা হচ্ছে, যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা বলবে দুর্নীতি সমস্যাটি ধীরে ধীরে বছরের পর বছর যুগের পর যুগ ধরে তৈরি হয়েছে, তাই এটির সমাধান খুব দ্রুত হবে না। সমাধান করতে অনেক দীর্ঘ সময় লাগবে। ক্রমাগত শুনতে শুনতে আমরাও এসব কথা মেনে নিয়েছি অনেকটা।

গত কিছুদিন ধরে বেশ হাঁকডাক শোনা যাচ্ছিল বাংলাদেশ এবার সহজে ব্যবসা করার সূচকে উন্নতি করার জন্য অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সেটাও আমাদের জানানো হয়েছিল। এরপর কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংক যখন আমাদের জানাল এবার সর্বোচ্চ উন্নতি করা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ আছে, তখনও সেটা নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছিল। সরকার সেটার কৃতিত্ব দাবি করেছিল। এই সূচক যখন অবশেষে প্রকাশিত হল তখন কি সেটা আসলেই অর্জনের বিষয়, আনন্দের বিষয় হয়ে থাকল?

এ বছরে সূচক নিয়ে কথা বলার আগে এই সূচকে আমাদের অতীত অবস্থান নিয়ে খুব কৌতূহলোদ্দীপক কিছু ব্যাপার আছে, সেগুলো নিয়ে কয়েকটা কথা বলা যাক। এই সূচকের পদ্ধতিগত পরিবর্তন করা হয়েছে ২০১৩ সালের পর। তাই ২০১৪ থেকে পরবর্তী সূচকের অবস্থানের সঙ্গে আগের অবস্থান ঠিক সেই অর্থে তুলনীয় নয়। কিন্তু আমরা আগের অবস্থানগুলো যদি দেখি সেটা অবশ্যই তুলনীয় এবং সেখানে খুবই অবাক হওয়ার মতো বিষয় আছে। বিএনপি জোট সরকারের শেষ বছর এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮১, এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম বছর এটা ছিল ৮৮, পরের বছর এটা বেশ কিছুটা অবনতি হয়ে ১০৭-এ যায়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০০৯ থেকে এটা বাড়তে বাড়তে ২০১২ সালে সর্বোচ্চ ১৩২ পর্যন্ত পৌঁছে, এরপর তেরো সালে এটা দুই ধাপ এগিয়ে ১৩০-এ এসে ঠেকে। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আমরা অভিযুক্ত করেছি ব্যবসা-বিরোধী সরকার হিসাবে, এমনকি সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পরবর্তী সরকারের চেয়ে বাংলাদেশ এই সূচকে ভালো অবস্থায় ছিল। আর বিএনপি তো এই পুরো সময়ের চেয়ে ভালো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ থাকার কৃতিত্ব দাবি করতেই পারে।

২০১৪ থেকে ২০১৮ সালে প্রকাশিত রিপোর্টগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যথাক্রমে ১৭২, ১৭৮, ১৭৬, ১৭৭, ১৭৬। তাই এ বছর প্রকাশিত রিপোর্টে যখন দেখা গেল বাংলাদেশ আট ধাপ এগিয়ে ১৬৮ তে আছে, তখন সেটাকে কারও কারও চোখে একটা সিগনিফিক্যান্ট উন্নতি বলে মনে হতে পারে। ঘোষণা দিয়ে যথেষ্ট উন্নতি করার চেষ্টা করার পরও এই উন্নতিটা আসলে যথেষ্ট নয়, সেটা আমরা বুঝব যখন আমরা জানব এই উন্নতির পরও আমাদের অবস্থান এই দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু আফগানিস্তানের (১৭৩) চেয়ে ভালো। আরও কিছু তথ্য যুক্ত করলে সেটা আমাদের ভীষণভাবে হতাশ করবে।

এই সূচকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেশে তো বটেই, বিদেশে বিনিয়োগকারীদের?ও কোনো দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে এই সূচক আস্থা বা ভীতি তৈরি করে। বিশেষত যে দেশগুলো সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ চায়, তারা এই সূচকগুলোতে যথেষ্ট উন্নতি না করতে পারলে তাদের পক্ষে সেটা খুব কঠিন হয়ে যায়। দশটি বিষয়ের ওপরে আলাদাভাবে পয়েন্ট দিয়ে এই র‌্যাংকিং করা হয়। বিষয়গুলো হল- নতুন ব্যবসা শুরু করা, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি পাওয়া, বিদ্যুৎ সুবিধা, সম্পত্তির নিবন্ধন, ঋণ ?পাওয়ার সুযোগ, সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তি বাস্তবায়ন ও দেউলিয়া হওয়া ব্যবসার উন্নয়ন। এরমধ্যে ৬টি সূচকে বাংলাদেশ উন্নতি করেছে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ঋণ প্রাপ্তি সহজ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সহজে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ফি কমানো হয়েছে এবং ডিজিটাল সনদে মাশুল উঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

গতবারের চেয়ে ১৪ ধাপ এগিয়ে এবার ভারতের অবস্থান ৬৩। বাংলাদেশ যখন প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় নিয়ে ভারতের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে, কখনও কখনও শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে, তখন ভারতের অবস্থানটা অবশ্যই বিবেচনায় নেয়া উচিত। এটা আমাদের হতাশা বাড়াবেই। কিংবা আমরা যখন দেখব নানা ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ নেপাল এবার ১৬ ধাপ এগিয়ে ৯৪তম স্থানে আছে, তখন আমাদের তথাকথিত উন্নতিটাকে কেমন দেখাবে?

নানা কারণে পাকিস্তান এ দেশে একটা ঘৃণিত দেশ। এই দেশটি আমাদের আলোচনায় এলে আমাদের মনের ভেতরে কোথাও জেগে ওঠে এটা একটা প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্র। আমরা অনেকেই খেয়াল করি না গত কয়েক বছর ধরে নানা দিক থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন একটা প্রসঙ্গের একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ছিল ঠিক একই অবস্থানে, ১৩৯-এ। আর সর্বশেষ সেই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯ আর পাকিস্তানের ১১৭। কিছুদিন আগে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা যখন প্রকাশিত হল তখন দেখা গেল ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নেই কোনো বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়। সেই তালিকায় এক হাজারের মধ্যে পাকিস্তানের আছে সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়।

একটা দেশ সত্যিকারভাবে যদি চায় কোনো কাজ করবে সেটা আসলে হয়, সহজে ব্যবসার সূচকে পাকিস্তানের অবিশ্বাস্য উন্নতি এটাকে প্রমাণ করে। যে সূচকটা নিয়ে এখন কথা বলছি, তার আগের বছরের সূচকটিতেও পাকিস্তান অবিশ্বাস্য উন্নতি করেছিল। সেবার তারা আগেরবারের চেয়ে ২৫ ধাপ এগিয়ে ১৩৬ এসেছিল। এবার ২৮ ধাপে এগিয়ে তাদের অবস্থান ১০৮। মানে দুই বছরে সর্বমোট ৫৩ ধাপ এগিয়ে দেশটি ১৬১ থেকে ১০৮ এ এসেছে। এই তথ্য মাথায় রাখলে সহজে ব্যবসার সূচকে আমাদের তথাকথিত অর্জনকে আসলেই আর কিছুই মনে হবে না।

ইমরান খান ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যবসা সহজীকরণের জন্য পদক্ষেপ নিতে বিভিন্ন জায়গায় নির্দেশ দিয়েছেন। এবং সেই অনুযায়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সংস্থাগুলো এবং সফল হয়েছে। শুরুতে যে আপ্তবাক্যের কথা বলছিলাম, দায় এড়ানোর জন্য আমাদের দেশের সরকারগুলো যখন বলে দীর্ঘকালের পুঞ্জীভূত সমস্যা দূর করার জন্য দীর্ঘকাল প্রয়োজন হবে, তখন সেই আপ্তবাক্যকে এক তুড়িতে নাকচ করতে পাকিস্তানের এই অর্জন। শুধু শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করলেই একটা দেশ দীর্ঘকালের পুঞ্জীভূত সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে পারে। আমরা যদি কোনো ক্ষেত্রে সেটা করতে না পারি সেটির দায় সমস্যার পুঞ্জীভবনের সময়কাল নয়, সেটার দায় আমাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারার ব্যর্থতা।

পাকিস্তান এই সূচকে উন্নতি করার জন্য কীভাবে সব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার বিস্তারিত বিভিন্ন রিপোর্ট, উপসম্পাদকীয় পাকিস্তানের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখছি না আর। আমাদের দেশে এই ক্ষেত্রে যারা কাজ করছেন তারা যদি চান সেগুলো দেখে নিতে পারেন। চাইলে তারা পাকিস্তানে গিয়েও দেখে আসতে পারেন। পুকুর খনন, খাল কাটা কিংবা পানি বিশুদ্ধকরণ দেখতে উগান্ডায় যাওয়ার মতো বিদেশ ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে ছেলেখেলা করার চেয়ে এই বিদেশ ভ্রমণ সত্যিকারার্থেই তাদের জন্য কার্যকর হতে পারে, যদি তারা আন্তরিকভাবে বিষয়গুলো বুঝতে যান।

নানা ক্ষেত্রে দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে আমরা তাচ্ছিল্য করি। কেউ পাকিস্তানকে নিয়ে তাচ্ছিল্য না করে কোনো সিরিয়াস আলোচনা করে প্রশংসা করাটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তার কপালে খুব বাজে তকমা জুটে পাড়তে পারে; সামাজিক মাধ্যমে এমন মানুষকে পাকিস্তান চলে যাওয়ার ব্যবস্থাপত্র দেয়া এখন খুব নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু আমাদের বোঝা উচিত সফলতার গল্প আসলেই সফলতার গল্প, সেটা যে দেশেরই হোক না কেন। যুক্তরাষ্ট্রে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের পর যখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখার কথা বলা হয়, এতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান নষ্ট হয় না।

নানা ক্ষেত্রে সমালোচিত একটা রাষ্ট্র যখন কোনো সফলতার গল্প তৈরি করে সেই গল্পটা বরং আরও বেশি মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত, বোঝা উচিত। সেটা করলে কোনো ক্ষেত্রে আমাদের যদি সামান্য অর্জন থেকেও থাকে সেটা নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে আমাদের বরং লজ্জিত হওয়া উচিত। আমাদের এটা নিশ্চিত করা উচিত কোনো রাষ্ট্রের চেয়ে আমরা অনেক ভালো আছি কিনা সেটা প্রমাণ করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নানা সূচকে আমাদের অবস্থানের উন্নতি করেই সেটা প্রমাণ করতে হবে। বাগাড়ম্বর করে মিথ্যে আত্মতুষ্টি লাভ করা যেতে পারে, সত্যিকারের ভালো কিছু হয় না। শেষ করছি রবীন্দ্রনাথের লেখা আমাদের চরিত্র নিয়ে বলা সেই অসাধারণ কথাগুলো দিয়ে, যা এখন আরও অনেক অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক -

‘আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না; ভূরি পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহঙ্কার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতালাভের চেষ্টা করি না; আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস্?, এবং নিজের বাক্চাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।’

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

Advertisement

ব্যবসা সূচক

Advertisement

আরও পড়ুন

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

খেলাপি ঋণ : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

নিউইয়র্কের চিঠি বদলে যাচ্ছে ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ

বদলে যাচ্ছে ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহু

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহু

সাক্ষাৎকার প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাৎপর্যপূর্ণ: এম হুমায়ুন কবীর

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তাৎপর্যপূর্ণ: এম হুমায়ুন কবীর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম