নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি: পেঁয়াজের এই দামের কোনোই কারণ নেই

  ড. আর এম দেবনাথ ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পেঁয়াজ
পেঁয়াজ।ফাইল ছবি

অক্টোবর মাসে মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে। প্রায় সব কাগজের এটাই সংবাদের শিরোনাম। এ খবরে আমি কিছুটা অবাক হই। এটা কী করে সম্ভব? কাঁচাবাজার, মাছবাজার, ফলের বাজার তো এ কথা বলে না।

বিশেষ করে পেঁয়াজের বাজার। ভারত পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধ করলে হুহু করে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। ১৬০-১৮০ টাকা পর্যন্ত কেজিতে ওঠে। আমি নিজে কিনেছি যখন, তখন ছিল ১১০ টাকা কেজি। বৃহস্পতিবার কলোনি বাজারে এর দাম দেখলাম ১২০-১৪০ টাকা কেজি। শুধু পেঁয়াজ নয়, শাকসবজি, তরিতরকারি, মাছ-মাংস, ফলমূল সবকিছুরই মূল্য ঊর্ধ্বমুখী।

অথচ এটা শীতকাল। সুখের মাস, আরামের মাস হওয়ার কথা অন্তত খানাপিনার দিক থেকে। এ সময়ে নতুন ধান ওঠে, শাকসবজি টাটকা পাওয়া যায়। সবই নতুন। এর স্বাদই আলাদা। কিন্তু যেমন পেঁয়াজের দাম, তেমনি দাম অন্যান্য সবজির। বেগুনের কেজি ৫০ টাকা। পটোল, ঝিঙা, চিচিঙা, লাউ, মুলা, ঢ্যাঁড়স ইত্যাদির দাম কেজি প্রতি ৫০-৬০ টাকা। গাজর ৭০ টাকা কেজি, শিম ৮০ টাকা কেজি, করলা ৮০ টাকা কেজি, কাঁচা মরিচ ৮০-১০০ টাকা কেজি। বাঁধাকপি ও ফুলকপি ৩০-৩৫ টাকা করে। গোল আলু ২৮-৩০ টাকা।

মাছের কেজি ৪০০-১২০০ টাকা কেজি। গরিবের মাছের দামও আকাশছোঁয়া। এই যে মূল্য তালিকা দিলাম তা ‘কলোনি’ বাজারের বৃহস্পতিবারের বাজার দর। হতে পারে অন্যত্র কম-বেশি। বলাই বাহুল্য শীতকালে এসবের দাম কমার কথা ছিল। না, তা হয়নি। কোনো বছরই হয় না। এর কিঞ্চিৎ প্রমাণ পেলাম ‘মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে’ খবরের শিরোনামের ভেতরের খবরে।

ভেতরে বলা হয়েছে মূল্যস্ফীতি অক্টোবরে কমেছে ঠিকই; কিন্তু এটা পূর্ণ সত্য নয়। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৪৯-এ। বিপরীতে খাদ্য নয় এমন পণ্যের মূল্য কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। মুশকিল হচ্ছে গরিব ও মধ্যবিত্তের জন্য খাদ্যমূল্যের গুরুত্বটা বেশি।

এ ছাড়া এসব সূচকের ভিত্তি, হিসাব সব বড় গোলমেলে। এখানে যেসব দ্রব্যাদির মূল্যের গড় করা হয় তাতে সমভাবে সব শ্রেণির মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে তা খাপ খায় না। এই আলোচনা ভিন্ন আলোচনা। আমরা শাকসবজি, মাছ-মাংস, ফলমূল নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এর মধ্যে জ্বলন্ত ইস্যু অবশ্যই পেঁয়াজ। পেঁয়াজের মূল্য কিছুতেই কমছে না।

ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ার পর ব্যবসায়ীরা মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেছেন। আবার খবর আছে ভারতও পেঁয়াজ রফতানির ওপর তাদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। এরপর পেঁয়াজের দাম কমার কথা; কিন্তু বাজার এখনও গরম। খবরে দেখলাম চট্টগ্রামে পেঁয়াজের ব্যবসায়ীদের মধ্যে কাউকে কাউকে শাস্তি দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ তারা পেঁয়াজের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়াচ্ছে। যে দামে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, এর সঙ্গে পরিবহন খরচ, গুদাম খরচ, ওজনপ্রতি এর ব্যবসায়িক লাভ- এসব ধরেও পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি হওয়ার কথা ৫০-৬০ টাকা। অথচ তা বিক্রির জন্য ব্যবসায়ীরা ৯৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে।

ফল হচ্ছে এই- একশ্রেণির পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। কতজনের ‘সিন্ডিকেট’? বড়জোর ১০-১৫ জনের। প্রশাসন তাদের সাবধান করে দিয়েছে। দু-একজনকে জেলে পাঠিয়েছে।

এদিকে ঢাকায় দেখা যাচ্ছে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রির কার্যক্রম। শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ট্রাক সেল হচ্ছে। খবরে দেখলাম প্রথমে জনপ্রতি দেয়া হতো দুই কেজি পেঁয়াজ, এখন দেয়া হচ্ছে মাত্র এক কেজি।

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) শহরের ৩৫টি স্থানে ৬৫টি ট্রাকে ৩৫ হাজার কেজি পেঁয়াজ দৈনিক বিক্রি করছে। ট্রাকপ্রতি ১ হাজার কেজি। এর ফলাফল ভালো হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু দুই কেজি থেকে এক কেজি মাথাপিছু করায় মানুষ ধরে নেয় সরকারের হাতে পেঁয়াজ মজুদ নেই। অতএব চতুর ব্যবসায়ীরা পুনরায় মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা করে। এতে বাজারে যে তেজিভাব ছিল তাই এখন অব্যাহত।

উল্লেখ্য, সুযোগ বুঝে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা এবারের পেঁয়াজেই প্রথম নয়। আমাদের দেশের একশ্রেণির ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, আড়তদার, কমিশন এজেন্ট, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা কখনও সাধারণ ক্রেতাদের শান্তিতে থাকতে দেয় না। পবিত্র রোজার মাস, কোরবানির ঈদের সময়েও একশ্রেণির ব্যবসায়ী নিয়মিতভাবে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ায়।

চিনি, সয়াবিন, লবণ, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, খেজুর, ডাল, দুধ থেকে শুরু করে কোনো পণ্যই বাদ যায় না। নিয়ম করে প্রতিবছর এসব জিনিসের দাম বাড়িয়ে মূল্যের ওই স্তরকেই ‘নতুন স্তর’ হিসেবে বাজারে চালু করেন। একই ঘটনা ঘটে প্রতিবছর বাজেটের সময়। বাজেটের সময় সরকার কোনো কোনো জিনিসের ওপর থেকে কর তুলে নেয়, আবার কোনো কোনো জিনিসের ওপর নতুনভাবে কর বসায়।

ব্যবসায়ীরা একেও একটি সুযোগ হিসেবে নেয়। তারা এই বাজেট উপলক্ষে পণ্যের দাম বাড়াবেই। সরকার কর তুলুক বা কমাক- তাতে কিছু আসে-যায় না। সুযোগ তারা ছাড়ে না। সব মৌসুমে একশ্রেণির ব্যবসায়ী এ অনৈতিক কাজটি করে। শুধু তাই নয়- বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, সরবরাহে বিঘ্ন ইত্যাদির অজুহাতেও তারা পণ্যের দাম যথেষ্টভাবে বাড়ায়। ফলে সাধারণ ক্রেতা-ভোক্তারা এসব কর্মকাণ্ডে অসহায়ত্ব বোধ করেন। যারা পারেন না, তারা ভোগ হ্রাস করেন। ভোগেন অপুষ্টিতে। শিশুরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই যে অনাচার, তাতে অংশগ্রহণ করে বহু স্তরের বহু লোক। কিন্তু প্রিন্সিপাল অপারেটর হচ্ছে বড় বড় আমদানিকারক, পাইকারি বিক্রেতা, কমিশন এজেন্ট ইত্যাদি শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। এদের বিরাট একটা অংশ চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসা-আমদানি ব্যবসা করেন। এরা সরকারের অনেক সুযোগ-সুবিধা পান। যেমন পবিত্র ঈদের সময় খেজুর, গুড়, চিনি, ছোলা, সয়াবিন, ভোজ্যতেল ইত্যাদির চাহিদা বাড়ে।

বড় ব্যবসায়ীরা বিশাল পরিমাণের পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করেন। হাজার হাজার কোটি টাকার ‘এলসি’ (ঋণপত্র) খুলতে হয়। সরকার তাদের ‘শূন্য’ মার্জিনে আমদানির সুযোগ দেয়। ট্রাস্ট রিসিটের সুযোগ দেয় যাতে পণ্য বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করতে পারে আমদানিকারকরা। উদারভাবে বড় আমদানিকারকদের ব্যাংক ঋণ দেয়া হয়। পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়, শুল্ক হ্রাস করা হয়।

উদ্দেশ্য একটাই- যাতে ক্রেতারা মূল্যে একটু স্বস্তি পান। না, তা হওয়ার নয়। দুষ্টু ব্যবসায়ী একটা চক্র ‘সিন্ডিকেট’ করে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন এ মুহূর্তের পেঁয়াজের খবরে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের ১০-১৫ জন ব্যবসায়ী পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। এটা প্রশাসন খুঁজে বের করেছে। এ খবর নতুন নয়। ঢাকার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর আগে কোন পণ্যে কতজন ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে তার একটা বর্ণনা দেয়। এ সিন্ডিকেটটি পণ্যভিত্তিক। বস্তুত একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্যই রয়েছে আলাদা আলাদা ‘সিন্ডিকেট’।

এরা ‘ঘাড়ে-গর্দানে’ দিনে দিনে বিশাল আকার ধারণ করেছে। অল্প অল্প আমদানি করত তারা প্রথম প্রথম। এখন তারা জাহাজ চার্টার করে ভোগ্যপণ্য আমদানি করে। চট্টগ্রামের, এমনকি ঢাকার ব্যবসায়ীরাও জানে কোন পণ্যের সরবরাহ কার দখলে। দু-তিন-চারজন মিলে সিন্ডিকেট। পেঁয়াজ, রসুন, সয়াবিন, চিনি, খেজুর, ডাল ইত্যাদি প্রতিটির পণ্যভিত্তিক সিন্ডিকেট রয়েছে।

এরা এখন ভীষণ প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। বস্তুত তাদের অনেকেই ভোগ্যপণ্যের আমদানি ব্যবসা করে উপরে উঠেছে। নীতি ও নৈতিকতার স্থান এখানে কম। আবার আমাদের দেশে এমন ব্যবসায়ীও আছেন যারা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ভোগ্যপণ্য আমদানির ব্যবসায় জড়িত নন। তারা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ঘটাননি। নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশের শিল্পায়ন করছেন।

মুশকিল হচ্ছে, এসব ‘সিন্ডিকেট’ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রক হয়ে পড়ছে। তারা পণ্যভিত্তিক ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলে আমদানি ব্যবসাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে কোন পণ্যের চাহিদা কত, কত আমদানি করতে হবে তার হিসাব কষতে গেলে বিপদ। যেমন পেঁয়াজ। বর্তমান সংকট কেন হবে? ভারত থেকে আমরা বেশিরভাগ পেঁয়াজ আমদানি করি। সত্য তারা পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধ করেছে তাদেরই অভাব বলে। তাই বলে কি আমাদের পেঁয়াজ সংকট হবে? হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আগস্ট মাসের ২৭ তারিখে প্রকাশিত একটি দৈনিকের খবরে দেখা যাচ্ছে, ২০১৩-১৪ সালে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল ৪ লাখ টনের মতো। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি হয় প্রায় ১১ লাখ টন। একই বছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ টন। তার মানে গেল বছর উৎপাদন ও আমদানি মিলে পেঁয়াজের বাজারে মোট সরবরাহ ছিল ৩৫ লাখ টন।

অথচ পেঁয়াজের চাহিদা, বলা হচ্ছে, মাত্র ২৪ লাখ টন। প্রশ্ন, তাহলে এত পেঁয়াজ যায় কোথায়? এর উত্তর অনেক কিছু হতে পারে। হয় উৎপাদনের তথ্য ঠিক নেই, নয়তো আমদানির তথ্য ঠিক নেই। অথবা চাহিদার তথ্যের কোনো ঠিক নেই। আবার হতে পারে আমদানি দেখানো হয়েছে, টাকা গেছে বিদেশে। কিন্তু মাল দেশে আসেনি। যদি উল্লিখিত তথ্য যা সংশ্লিষ্ট দফতর দিয়েছে তা ঠিক হয়, তাহলে বর্তমান সংকটের কারণ কী?

এই প্রসঙ্গেই বলা যায়, দেশে ভোগ্যপণ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোর উৎপাদন ও আমদানির তথ্য ঠিক নেই। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বার্ষিক চাহিদা কত তার হিসাবই আমাদের কাছে নেই। এই সুযোগটা ব্যবসায়ীদের একটি দুষ্টচক্র নিচ্ছে। তারা টাকা বানাচ্ছে, অনেকের সন্দেহ সিন্ডিকেটের সদস্যরা আমদানির নামে টাকা বিদেশে পাচার করছে।

এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে দেখা দরকার। বলে রাখা ভালো, প্রশাসনিক ব্যবস্থা দিয়ে অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জেল-জরিমানা হতে পারে; কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার ‘খোলা বাজারি কার্যক্রম’। যখনই কোনো পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে তখনই সরকারি প্রতিষ্ঠান ওই পণ্য নিয়ে বাজার সয়লাব করে দেবে। তা হলেই ‘সিন্ডিকেট’ কিছু করতে পারবে না।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×